সাইবার হামলায় চার দিন অচল ব্রিটিশ বিদ্যুৎকেন্দ্র, নেপথ্যে ইরান-ঘনিষ্ঠ হ্যাকার

বোমা নয়, ক্ষেপণাস্ত্রও নয়। কম্পিউটারের সামনে বসেই ব্রিটেনের একটি বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র চার দিন বন্ধ করে দিল হ্যাকাররা! গত জুলাইয়ে ঘটে যাওয়া সেই ঘটনা এত দিন প্রকাশ্যে আসেনি। এ বার জানা গেল, হামলাকারীদের সঙ্গে ইরানের যোগ রয়েছে বলে সন্দেহ করছেন নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরা। কেন্দ্রটি ছোট হওয়ায় দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহে কোনও প্রভাব পড়লেও ব্রিটেনের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নাম বা অবস্থান প্রকাশ করেনি ব্রিটিশ সরকার। জানা গিয়েছে, হামলার পর কেন্দ্রটির নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় সমস্যা তৈরি হয়। কর্মীরা সেটিকে ফের চালু করতে চার দিন ধরে চেষ্টা চালান। তার পর স্বাভাবিক উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হয়। তবে এটি ব্রিটেনের বড় কোনও বিদ্যুৎকেন্দ্র ছিল না। সরকারি সূত্রের ভাষায়, জাতীয় গ্রিডের মোট উৎপাদনক্ষমতার তুলনায় কেন্দ্রটি এতটাই ছোট যে বন্ধ থাকার প্রভাব কার্যত হিসাবেই পড়েনি।
ব্রিটিশ সরকারের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, দেশের জ্বালানি ব্যবস্থা অত্যন্ত স্থিতিস্থাপক এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষায় সরকার জ্বালানি সংস্থাগুলির সঙ্গে নিয়মিত কাজ করছে। তার বক্তব্য, ঘটনাটি একটি ছোট আকারের বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রে সীমাবদ্ধ ছিল এবং কোনও সময়েই বৃহত্তর বিদ্যুৎব্যবস্থা ঝুঁকিতে পড়েনি।
ঘটনার পর অবশ্য বিষয়টিকে হালকা ভাবে নেয়নি লন্ডন। বড় বিদ্যুৎ সংস্থাগুলির প্রধান নির্বাহীদের পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করা হয়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে কী ভাবে সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে, সে বিষয়ে নির্দেশনা ও পরবর্তী পদক্ষেপও পাঠায় সরকার। বিষয়টি জানানো হয় ব্রিটেনের গোয়েন্দা সংস্থা জিসিএইচকিউয়ের অধীন ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি সেন্টারে (এনসিএসসি)। নির্দিষ্ট এই হামলা নিয়ে সংস্থাটি অবশ্য প্রকাশ্যে বিস্তারিত মন্তব্য করেনি।
আর এখানেই ঘটনাটির গুরুত্ব। সরকারি ভাবে এখনও হামলাকারী গোষ্ঠীর নাম ঘোষণা করা হয়নি এবং ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ প্রকাশ্যে চূড়ান্ত প্রযুক্তিগত দায়ও নির্ধারণ করেনি। তবে বিভিন্ন নিরাপত্তা সূত্রের মূল্যায়ন, হামলার সঙ্গে ইরান-ঘনিষ্ঠ হ্যাকারদের যোগ রয়েছে। এমনও ধারণা রয়েছে, সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে ব্যাপক ক্ষতি করাই হয়তো মূল উদ্দেশ্য ছিল না। বরং ব্রিটেনের জ্বালানি অবকাঠামোর ভিতরে ঢুকে একটি স্থাপনা বন্ধ করে দেওয়ার সক্ষমতা দেখানোই হামলাকারীদের লক্ষ্য হয়ে থাকতে পারে।
এই আশঙ্কাকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে হামলার সময়কাল। ব্রিটেনে ঘটনাটি ঘটে জুলাইয়ে, প্রায় একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক অঙ্গরাজ্যে পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থায় সমন্বিত সাইবার হামলা চলছিল। অন্তত ১২টি অঙ্গরাজ্যের বিভিন্ন পানির অবকাঠামো আক্রান্ত হয়। শুধু মিনেসোটাতেই ৩০টির বেশি স্থানীয় পানি ব্যবস্থায় অননুমোদিত প্রবেশের ঘটনা শনাক্ত করা হয়েছিল। কোথাও পানির চাপ কমে যায়, কোথাও ব্যবস্থাপনায় বিঘ্ন ঘটে। এফবিআই তদন্তে যুক্ত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ওই হামলাগুলির ক্ষেত্রেও ইরান-ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলির দিকে সন্দেহের তির যায়। পানি খাতের একটি ফাঁস হওয়া গোয়েন্দা স্মারকে তেহরানের সঙ্গে যোগসূত্রের কথা বলা হয়েছিল। তবে মার্কিন কর্তৃপক্ষ সব ঘটনার দায় আনুষ্ঠানিক ভাবে ইরানের উপর চাপায়নি। ফলে ব্রিটেন ও আমেরিকার ঘটনাগুলি একই অভিযানের অংশ ছিল কি না, সেটিও এখনও নিশ্চিত নয়।
আগেই সতর্ক করেছিল ব্রিটেন
ইরানকে ঘিরে সাইবার ঝুঁকির সতর্কতা অবশ্য নতুন নয়। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর ২ মার্চ এনসিএসসি ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানগুলিকে নিজেদের সাইবার প্রতিরক্ষা পর্যালোচনা করার নির্দেশ দেয়। তখন সংস্থাটি জানিয়েছিল, ইরানের সরাসরি সাইবার হুমকি তাৎক্ষণিক ভাবে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেড়েছে এমন প্রমাণ না থাকলেও পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে পারে। ইরানি রাষ্ট্রীয় ও ইরান-ঘনিষ্ঠ সাইবার গোষ্ঠীগুলির হামলা চালানোর সক্ষমতা রয়েছে বলেও সতর্ক করা হয়েছিল। বিশেষ করে বিদ্যুৎ, পানি এবং শিল্প নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার মতো ক্ষেত্রকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়।
দু’মাসের মধ্যেই আরও উদ্বেগজনক হিসাব দেয় এনসিএসসি। জুনে সংস্থাটির প্রধান রিচার্ড হর্ন জানান, ২০২৫ সালের জুন থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত ব্রিটেনের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামো ও সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থায় ২০০টির বেশি সাইবার ঘটনা সামলেছে তাঁর সংস্থা। তার প্রায় ৭৫ শতাংশের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীর যোগ রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। রাশিয়া, চীন ও ইরান–তিন দেশের সাইবার তৎপরতার কথাই তখন বিশেষ ভাবে উল্লেখ করেন তিনি।
হর্নের সতর্কতা ছিল আরও স্পষ্ট, আজ কোনও প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিব্যবস্থায় যে দুর্বলতা অবহেলা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতের সংঘাতে শত্রুপক্ষ সেটিকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। তাঁর মতে, বিভিন্ন দেশের হ্যাকাররা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর প্রযুক্তিতে আগে থেকেই ঢোকার পথ তৈরি করে রাখছে, যাতে প্রয়োজনের সময় দ্রুত বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটানো যায়।
ইরানের সঙ্গে ব্রিটেনের সম্পর্কও ইতিমধ্যে আরও উত্তপ্ত। ১৭ জুলাই ব্রিটিশ সরকার ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস—আইআরজিসিকে নতুন রাষ্ট্রীয় হুমকি আইনের আওতায় জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে আনুষ্ঠানিক ভাবে মনোনীত করেছে। আইআরজিসির পক্ষে সহায়তা বা নির্দিষ্ট ধরনের সমর্থন এখন ব্রিটেনে ফৌজদারি অপরাধ হতে পারে। ব্রিটিশ সরকারের অভিযোগ, আইআরজিসি ও তাদের ঘনিষ্ঠ নেটওয়ার্ক ইউরোপ ও ব্রিটেনে হুমকি, নজরদারি এবং হামলাসংশ্লিষ্ট তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত।
তবে জুলাইয়ের বিদ্যুৎকেন্দ্র হামলার সঙ্গে আইআরজিসির সরাসরি সম্পৃক্ততার কোনও সরকারি প্রমাণ এখনও প্রকাশ করা হয়নি। ফলে ‘ইরান-ঘনিষ্ঠ’ এবং ‘ইরানি সরকারের নির্দেশে’–এই দুই বিষয়কে এক করে দেখা যাবে না।
ব্রিটেনজুড়ে এমন বহু ছোট গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, যেগুলি সব সময় চলে না; প্রয়োজনের সময়ে জাতীয় গ্রিডকে সহায়তা করে। আক্রান্ত কেন্দ্রটিও সেই ছোট উৎপাদকগুলির একটি বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর এই কারণেই চার দিন বন্ধ থাকার পরও সাধারণ মানুষ তা টের পাননি।
কিন্তু বিদ্যুৎ না গেলেও সতর্কবার্তাটি বেশ স্পষ্ট। একটি ছোট কেন্দ্র চার দিন বন্ধ করা গেছে, পরের লক্ষ্য যদি হয় আরও বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র, পানির ব্যবস্থা বা পরিবহণ নেটওয়ার্ক? ব্রিটেনের সামনে এখন উদ্বেগ সেই প্রশ্নেই। যুদ্ধের নতুন ফ্রন্ট যে শুধু সীমান্ত কিংবা আকাশে নয়, বিদ্যুৎকেন্দ্রের কম্পিউটার ব্যবস্থার ভিতরেও খুলে যেতে পারে, জুলাইয়ের চার দিনের অচলাবস্থা সেটিই আরও এক বার মনে করিয়ে দিল।






