বর্ণবিদ্বেষী মন্তব্যে তোলপাড় ব্রিটেন
মুসলিম হলে ব্রিটিশ হওয়া যায় না’: বিতর্কিত মন্তব্যে রিফর্ম ইউকের নেতা বরখাস্ত
- দলের মুসলিম নেতা স্বরাষ্ট্রবিষয়ক মুখপাত্র জিয়া ইউসুফও নিশানায়
- আশ্রয়প্রার্থীদের ‘নির্যাতনমূলক বন্দিশিবিরে’ পাঠানোর প্রস্তাব, দুই কাউন্সিলরের বিরুদ্ধেও তদন্ত

একজন মুসলিম নাকি ব্রিটিশ হতে পারেন না। একই দলের মুসলিম নেতার পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন। আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য ‘নির্যাতনমূলক বন্দিশিবির’ তৈরির প্রস্তাব। গোপন ক্যামেরায় ধরা পড়া এসব মন্তব্য ঘিরে সংকটে ব্রিটেনের অভিবাসনবিরোধী দল রিফর্ম ইউকে। দলের এক কর্মীর সদস্যপদ স্থগিত হয়েছে। তদন্ত চলছে দুই নির্বাচিত কাউন্সিলরের বিরুদ্ধেও। প্রশ্ন উঠছে, প্রার্থী বাছাইয়ে এত আপত্তিকর বক্তব্য কীভাবে নজর এড়াল?
শনিবার (১৭ অক্টোবর) প্রকাশিত আইটিভির অনুসন্ধানে উঠে আসে এসব তথ্য। বছরব্যাপী গোপন অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে এক সাংবাদিক রিফর্মের দলীয় কার্যালয় ও কর্মীদের অনুষ্ঠানে অংশ নেন। পরে বিবিসি ও দ্য টেলিগ্রাফও ঘটনাগুলো নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। অভিযুক্ত কর্মীর নাম জেসন পাওয়েল। তিনি রিফর্মের প্রার্থী হয়ে পার্লামেন্ট নির্বাচনে দাঁড়াতে আগ্রহী ছিলেন।
আইটিভির ধারণ করা কথোপকথনে পাওয়েল বলেছেন, ‘আপনি একই সঙ্গে মুসলিম এবং ব্রিটিশ হতে পারেন না। ব্যাপারটা তেল আর জলের মতো।’ ধর্মত্যাগ করলে মুসলিমদের বিষয়ে তাঁর আপত্তি থাকবে না বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। উদাহরণ হিসেবে নিজের দলের স্বরাষ্ট্রবিষয়ক মুখপাত্র জিয়া ইউসুফের কথা তোলেন। ইউসুফ নিজেকে ‘ব্রিটিশ মুসলিম দেশপ্রেমিক’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন।
শুধু ধর্মীয় পরিচয় নয়, অভিবাসীদের জন্য কঠোর ব্যবস্থার কথাও বলেছেন পাওয়েল। ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে ছোট নৌকায় আসা মানুষদের ‘নির্যাতনমূলক বন্দিশিবিরে’ আটকে রাখার প্রস্তাব দেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পরিচয় না জানালে তাঁদের অনির্দিষ্টকাল সেখানে রাখা হবে। এমন প্রস্তাব ব্রিটিশ সরকারের ঘোষিত নীতি নয়।
বিবিসি জানিয়েছে, অভিযোগ প্রকাশের পর পাওয়েলের দলীয় সদস্যপদ সাময়িক স্থগিত করেছে রিফর্ম। দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। একই সঙ্গে গোপনে তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি নিয়ে আইটিভি ও সংশ্লিষ্ট প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে দলটি।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে পশ্চিম লন্ডনের হাউনসলো এলাকার দুই রিফর্ম কাউন্সিলর অ্যাডাম পারকিন্স ও ডেভিড কেরের বক্তব্যও। পারকিন্স বলেছেন, ক্ষমতা পেলে যৌন নিপীড়নকারী চক্রের সদস্যদের প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের বাগানে গুলি করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে চান। কেরও বহু অভিযুক্তকে একসঙ্গে গুলি করার পক্ষে মন্তব্য করেছেন। দুই কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে দলীয় তদন্ত চলছে।
পারকিন্স পরে বলেছেন, পাকিস্তানিদের সবাইকে নিয়ে সাধারণীকরণ করেননি তিনি। তাঁর বক্তব্য ছিল শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনকারী চক্র সম্পর্কে। তাঁর মতে, আইন অনুযায়ী কঠোরতম শাস্তি হওয়া উচিত। কের আইটিভির মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেননি।
এর আগের অনুসন্ধানে কৃষ্ণাঙ্গ শিশুদের ‘পশু’ বলা এবং এশীয় পরিবারগুলো সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্যও প্রকাশ পায়। তিন কাউন্সিলর পদত্যাগ করেছেন বলে আইটিভিকে জানিয়েছে রিফর্ম। দলটির বক্তব্য, বর্ণবাদের কোনো স্থান নেই। প্রার্থী যাচাই জোরদার হয়েছে, তবে কারও ভবিষ্যৎ মন্তব্য আগাম জানা সম্ভব নয়। নেতা নাইজেল ফারাজও একই যুক্তি দিয়েছেন।
রিফর্মের জ্যেষ্ঠ নেতা গাওয়েন টাউলার গোপন কথোপকথনে নিজের স্কুলজীবনের বর্ণবাদী আচরণের কথা স্বীকার করেছেন। পরে তিনি জানিয়েছেন, সেই অতীত নিয়ে তিনি অনুতপ্ত৷ অন্যদিকে দলীয় প্রার্থীদের প্রশিক্ষণেও অতীতের বিতর্কিত বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে পৃথক ঘটনায় ওয়েলসের পার্লামেন্টে রিফর্মের সদস্য জেসন ও’কনেল বক্তৃতার সময় বিশেষ চশমায় লেখা পড়ে আলোচনায় এসেছেন। বিবিসিকে তিনি জানিয়েছেন, এতে আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। তাঁর চশমায় ক্যামেরা নেই। তবু প্রযুক্তিটির ব্যবহার নিয়ে নিয়ম পর্যালোচনা করছে পার্লামেন্ট কর্তৃপক্ষ। এই ঘটনা গোপন অনুসন্ধানের অভিযোগগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।
লেবার পার্টির সভাপতি ব্রিজেট ফিলিপসন রিফর্মের নেতৃত্বের জবাবদিহি চেয়েছেন। কিন্তু রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে রয়ে গেছে আরও মৌলিক প্রশ্ন। কোনো দলের কর্মী যখন সহনাগরিকের ধর্মীয় পরিচয়কেই জাতীয় পরিচয়ের বিপরীতে দাঁড় করান, তখন শুধু তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করলেই কি জনআস্থার সংকট কাটে?



