আয়ারল্যান্ডে উচ্চশিক্ষায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সম্ভাবনা

সংগৃহীত ছবি
গত এক দশকে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশমুখী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকায় নতুন করে জায়গা করে নিয়েছে আয়ারল্যান্ড। একসময় যেখানে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াই ছিল প্রধান গন্তব্য, সেখানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপের এই ইংরেজিভাষী দেশটি বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে ক্রমেই আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। তবে সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশ থেকে আয়ারল্যান্ডে শিক্ষার্থী যাওয়ার হার বাড়লেও ভারত, পাকিস্তান, নেপাল কিংবা শ্রীলঙ্কার তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান এখনও অনেক পিছিয়ে।
আয়ারল্যান্ডের হায়ার এডুকেশন কতৃপক্ষের (এইচইএ) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে দেশটির সরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৪ হাজার ৫০০ জনে। এর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের (নন ইইউ) শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৩২ হাজার ৯৪০। আয়ারল্যান্ডে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় উৎস হচ্ছে ভারত, এরপর রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে শীর্ষ দশ দেশের তালিকাতেও নেই। যা থেকে বোঝা যায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে এখনও সীমিত।
তবে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এডুকেশন ইন আয়ারল্যান্ড, আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিশ্লেষক সংস্থা অ্যাপ্লাই বোর্ড এবং আইসিইএফ মনিটরের পর্যবেক্ষণ বলছে, ২০২২ সালের পর থেকে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশ থেকে আয়ারল্যান্ডে আবেদন ও ভর্তি, দুই ক্ষেত্রেই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে কানাডা, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার কঠোর ভিসানীতি কার্যকর হওয়ার পর অনেক শিক্ষার্থী বিকল্প গন্তব্য হিসেবে আয়ারল্যান্ডকে বেছে নিচ্ছেন।
সর্বশেষ ১০ বছরের চিত্র
সরকারি পর্যায়ে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর কতজন শিক্ষার্থী আয়ারল্যান্ডে গেছেন এমন পূর্ণাঙ্গ দেশভিত্তিক তথ্য প্রকাশ করা হয় না। ফলে গত ১০ বছরের মোট বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর নির্ভুল সংখ্যা সরকারি উৎস থেকে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তবে আন্তর্জাতিক শিক্ষা বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৫ সালের তুলনায় বর্তমানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়েছে। বিশেষ করে ২০২১ সালের পর এই বৃদ্ধি আরও দৃশ্যমান হয়েছে।
সর্বশেষ দুই বছরের প্রবণতা
২০২৩-২৪ এবং ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে আয়ারল্যান্ডে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তিতে টানা প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এইচইএ-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে ভারতীয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তারাই এখন আয়ারল্যান্ডের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী গোষ্ঠী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর পৃথক সংখ্যা প্রকাশিত না হলেও শিক্ষা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, বাংলাদেশ থেকেও আবেদন ও ভর্তি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় কোথায় বাংলাদেশ?
পরিসংখ্যান বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আয়ারল্যান্ডে শিক্ষার্থী পাঠানোর ক্ষেত্রে ভারত অনেক এগিয়ে। ভারতীয় শিক্ষার্থীরা একাই দেশটির আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি প্রতিনিধিত্ব করছে। পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা থেকেও বাংলাদেশের তুলনায় বেশি শিক্ষার্থী আয়ারল্যান্ডে যায় বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শিক্ষা বাজার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। মালদ্বীপের জনসংখ্যা কম হওয়ায় তাদের মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা কম হলেও জনসংখ্যার অনুপাতে বিদেশে উচ্চশিক্ষার হার উল্লেখযোগ্য পরিলক্ষিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার প্রধান কারণ হলো সীমিত তথ্যপ্রবাহ, তুলনামূলক কম শিক্ষা-পরামর্শ অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক মানের ইংরেজির ক্ষেত্রে দক্ষতার ঘাটতি এবং বিদেশে উচ্চশিক্ষার অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা।
কেন আয়ারল্যান্ডে আগ্রহ বাড়ছে?
বিশ্লেষকদের মতে, কয়েকটি কারণে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে আয়ারল্যান্ড দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
প্রথমত, দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ডিগ্রি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং গবেষণার মান উচ্চ। দ্বিতীয়ত, স্নাতকোত্তর শেষে দুই বছর পর্যন্ত পোষ্ট স্টাডি ওয়ার্ক পারমিট পাওয়ার সুযোগ। যা কিনা শিক্ষার্থীদের কর্মজীবনে বড় সুবিধা দেয়। তৃতীয়ত, গুগল, মেটা, অ্যাপল, মাইক্রোসফট, অ্যামাজন, ইন্টেল, ফাইজারসহ অসংখ্য বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ইউরোপীয় সদর দপ্তর আয়ারল্যান্ডে হওয়ায় চাকরির সম্ভাবনাও তুলনামূলক বেশি। এছাড়া যুক্তরাজ্যের তুলনায় কিছু ক্ষেত্রে টিউশন ফি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ও তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত।
কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী?
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর পৃথক সংখ্যা প্রকাশ না করলেও শিক্ষা–সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বাংলাদেশিদের সবচেয়ে বেশি আগ্রহ রয়েছে ইউনিভার্সিটি কলেজ ডাবলিন (ইউসিডি), ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিন, ডাবলিন সিটি ইউনিভার্সিটি (ডিসিইউ), ইউনিভার্সিটি অফ গালওয়ে, ইউনিভার্সিটি কলেজ কর্ক, ইউনিভার্সিটি অফ লিমেরিক, মেনুথ ইউনিভার্সিটি এবং টেকনলজিক্যাল ইউনিভার্সিটি ডাবলিন এর ক্ষেত্রে। বিশেষ করে কম্পিউটার সায়েন্স, ডেটা অ্যানালিটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্স, বিজনেস অ্যানালিটিক্স, ফাইন্যান্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের চাহিদা অনেক বেশি। তবে, সবকিছু ছাপিয়ে মেডিকেল নার্সিং বিষয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা আগ্রহ এবং পছন্দের শীর্ষ তালিকায় রয়েছে।
নতুন গন্তব্য হিসেবে আয়ারল্যান্ড
আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ায় সাম্প্রতিক ভিসা নীতির পরিবর্তনের ফলে বহু আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী নতুন গন্তব্য খুঁজছেন। সেই সুযোগে আয়ারল্যান্ড ধারাবাহিকভাবে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী আকর্ষণ করছে। দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও দক্ষিণ এশিয়ায় শিক্ষার্থী নিয়োগ কার্যক্রম বাড়িয়েছে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশ থেকে আয়ারল্যান্ডমুখী শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরও বাড়বে। তবে এ প্রবৃদ্ধিকে টেকসই করতে ইংরেজি ভাষার দক্ষতা বৃদ্ধি, সঠিক তথ্যপ্রাপ্তি, স্বচ্ছ শিক্ষা-পরামর্শ এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে আয়ারল্যান্ড যদি বাংলাদেশকে অগ্রাধিকারভিত্তিতে শিক্ষা সহযোগিতার আওতায় আনে, তাহলে দুই দেশের উচ্চশিক্ষা সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে।




