সন্তানদের খোঁজে সেউতা সীমান্তে স্বজনদের দীর্ঘ অপেক্ষা
- মরক্কো থেকে সেউতায় ঢুকেছিলেন প্রায় ৭২ হাজার মানুষ
- প্রাণ গেছে অন্তত ৯৯ জনের
- এখনও নিখোঁজ বহুজন

ছবি: রয়টার্স
কারও হাতে ছেলের ছবি, কারও মোবাইল ফোনে মেয়ের শেষ বার্তা। স্পেনের সেউতা থেকে মরক্কোয় ফিরে আসা প্রত্যেককে ঘিরেই এক প্রশ্ন—‘আমার সন্তানকে দেখেছেন?’
মরক্কোর উত্তরাঞ্চলীয় ফনিদেক শহরে সেউতা সীমান্তের কাছে এখন এমনই উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন শত শত পরিবার। কয়েক দিন আগে প্রায় ৭২ হাজার মানুষ মরক্কো থেকে স্পেননিয়ন্ত্রিত সেউতায় প্রবেশের চেষ্টা করার পর থেকেই তাঁদের অনেকের কোনো খোঁজ মিলছে না।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টায় সেউতায় অন্তত ৮৮ জন এবং মরক্কোয় আরও ১১ জন নিহত হয়েছেন। এখনও বহু মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। সব মরদেহ উদ্ধার হয়েছে কি না, সেটিও নিশ্চিত নয়।
‘আমার একটাই ছেলে’
তানজিয়ার থেকে সীমান্তে ছুটে এসেছেন খাদিজা নামের এক মা। শনিবার থেকে ফিরে আসা মানুষের ভিড়ে ২৩ বছর বয়সী ছেলেকে খুঁজছেন তিনি। বেকার ওই তরুণ যে সেউতায় যাওয়ার চেষ্টা করবে, তা পরিবারকে জানায়নি। এরপর থেকেই তার মোবাইল ফোন বন্ধ।
খাদিজা বলেছেন, পরিবারের একমাত্র ছেলের কোনো খোঁজ না পেয়ে এখন অপেক্ষা করা ছাড়া তাঁদের আর কোনো উপায় নেই।
আরেক মা পাঁচ দিন ধরে ছেলে রায়ানকে খুঁজছেন। বন্ধুদের সঙ্গে সীমান্ত পার হওয়ার পর একবার ফোন করলেও এরপর আর কোনো যোগাযোগ করেনি সে। অন্যদিকে ১২ বছরের এক শিশুকে খুঁজতে প্রতিদিন সীমান্তে আসছেন আরেক নারী। বড় ভাই ফিরে এলেও ছোট ছেলেটির এখনও কোনো খোঁজ মেলেনি।
গুজবেই সীমান্তে মানুষের ঢল
টিকটক, ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপে ছড়িয়ে পড়ে, মরক্কো নাকি সীমান্ত পারাপারে বাধা দিচ্ছে না। সেই খবর ছড়িয়ে পড়তেই হেঁটে, বাসে ও ব্যক্তিগত গাড়িতে হাজার হাজার মানুষ ফনিদেকে জড়ো হন। কেউ সাঁতরে, আবার কেউ সীমান্তের বেড়া টপকে সেউতায় ঢোকার চেষ্টা করেন।
এ সময় স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায় নিয়েও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে দাবি করা হয়, সমুদ্রপথে পৌঁছানো অভিবাসীদের তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠানো যাবে না। মরক্কোর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই নজিরবিহীন জনসমাগমের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর তথ্যকেই দায়ী করেছে।
তবে সেউতার আঞ্চলিক সরকারের প্রধান হুয়ান হেসুস ভিভাস অভিযোগ করেছেন, মরক্কো এই যাত্রা সরাসরি আয়োজন না করলেও অন্তত তা ঠেকানোর চেষ্টা করেনি। যদিও মরক্কোর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, বিপুল মানুষের চাপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষে সম্ভব হয়নি।
ফিরেছেন ৭০ হাজার, রয়ে গেছেন দুই হাজার
স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সেউতায় প্রবেশ করা প্রায় ৭২ হাজার মানুষের মধ্যে আনুমানিক ৭০ হাজারকে মরক্কোয় ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কেউ স্বেচ্ছায় ফিরেছেন, আবার কাউকে পুলিশ সীমান্ত পর্যন্ত নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
১৯ বছর বয়সী আবদেসলাম কয়েক দিন না খেয়ে ও আতঙ্কে কাটানোর পর নিজেই দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার ভাষ্য, সেখানে সবার জন্য কাজের সুযোগ নেই। অন্যদিকে ২১ বছরের সিমো দাবি করেছেন, পুলিশ তাঁদের ঘিরে সীমান্তের দিকে নিয়ে যাওয়ায় ফেরার সিদ্ধান্তে তাঁদের কোনো স্বাধীনতা ছিল না।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, আন্তর্জাতিক সুরক্ষার আবেদন করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কিছু মানুষকে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই ফেরত পাঠানো হয়েছে। তবে এ বিষয়ে স্পেন সরকার বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।
সেউতায় এখনও শত শত শিশু
স্পেন সরকারের তথ্য অনুযায়ী, এখনও প্রায় দুই হাজার মানুষ সেউতায় অবস্থান করছেন। তাঁদের মধ্যে অভিভাবক ছাড়া সীমান্ত পার হওয়া অন্তত ৮৬২ শিশুর নিবন্ধন হয়েছে। স্পেনে ইউনিসেফ সতর্ক করেছে, আরও অনেক শিশু শহরের বিভিন্ন স্থানে সুরক্ষাহীন অবস্থায় থাকতে পারে।
মঙ্গলবার প্রকাশিত একটি ভিডিওতে ১২ বছর বয়সী এক শিশুকে মরক্কোয় ফেরত না পাঠানোর জন্য কাঁদতে দেখা যায়। স্পেনের আইনে অভিভাবকহীন শিশুকে এভাবে ফেরত পাঠানো যায় না। উপস্থিত লোকজন বাধা দিলে তাকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াও বন্ধ হয়ে যায়।
নিখোঁজদের অভিযোগ গ্রহণের জন্য সেউতায় পৃথক একটি দপ্তর খুলেছে স্প্যানিশ পুলিশ। একসময় যে ফেসবুক গ্রুপগুলোতে সীমান্ত পার হওয়ার কৌশল ও সীমান্তরক্ষীদের অবস্থান জানানো হতো, এখন সেখানে নিখোঁজ ব্যক্তিদের ছবি প্রকাশ করছেন স্বজনেরা।
স্বপ্নের শেষে অনিশ্চয়তা
বিশ্লেষকদের মতে, মরক্কোয় বেকারত্ব, দারিদ্র্য ও বৈষম্যের কারণে বহু তরুণের কাছে ইউরোপ এখনও উন্নত জীবনের প্রতীক। সেই আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব মিলেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সৃষ্টি হয়েছিল নজিরবিহীন জনস্রোত।
এখন একই সীমান্তে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন দৃশ্য। কেউ ফিরে এসে পরিবারের সঙ্গে মিলিত হচ্ছেন, আবার অনেক পরিবার এখনও প্রিয়জনের অপেক্ষায় দিন গুনছে। তাঁদের হাতে শুধু একটি ছবি, আর প্রতিটি ফিরে আসা মানুষের কাছে একই প্রশ্ন—‘আমার সন্তানকে কোথাও দেখেছিলেন?’




