যুক্তরাজ্যে রিফর্ম ইউকের উত্থানে ‘ঐতিহাসিক পরিবর্তন’ দেখছেন নাইজেল ফারাজ

সংগৃহীত ছবি
যুক্তরাজ্যের স্থানীয় নির্বাচনে রিফর্ম ইউকের ব্যাপক সাফল্যকে ব্রিটিশ রাজনীতিতে ‘ঐতিহাসিক পরিবর্তন’ বলে বর্ণনা করেছেন দলটির নেতা নাইজেল ফারাজ। লেবার ও কনজারভেটিভ দুই প্রধান দলের ঘাঁটিতেই বড় অগ্রগতি পেয়েছে ডানপন্থী জনতুষ্টিবাদী দলটি৷
লেবার ও কনজারভেটিভদের ঐতিহ্যগত শক্ত ঘাঁটিগুলোতে অগ্রগতি করেছে রিফর্ম। দলটি এসেক্স কাউন্টি কাউন্সিল, হ্যাভারিং— যা লন্ডনে তাদের প্রথম স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এবং সান্ডারল্যান্ড সিটি কাউন্সিলের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। ফল আসা অব্যাহত থাকার মধ্যে ইংল্যান্ডে দলটি ১ হাজার ৩৫০টির বেশি কাউন্সিল আসন এবং ১৩টি কাউন্সিল জিতেছে।
নাইজেল ফারাজ এদিন উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলেছেন, ‘এটি বড় খুব বড় দিন, শুধু আমাদের দলের জন্য নয় বরং ব্রিটিশ রাজনীতিকে সব দিক থেকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে গড়ে তোলার জন্য।’
তিনি বলেছেন, ‘আগামী সাধারণ নির্বাচনের আগে পরিকল্পনা ও তহবিল সংগ্রহের ক্ষেত্রে রিফর্ম এখন তাদের লক্ষ্যপথের ‘দুই-তৃতীয়াংশ’ এগিয়ে গেছে। তার ভাষ্য, কনজারভেটিভ দলত্যাগীদের জন্য দরজা এখন বন্ধ। তবে ‘দেশপ্রেমিক পুরনো লেবার’ এমপিদের সঙ্গে আলোচনার ‘সময় এখন’।
রিফর্মের প্রথম বড় জয় ছিল এসেক্সে। এটি ছিল দলটির প্রধান লক্ষ্যগুলোর একটি। ২০০১ সাল থেকে কনজারভেটিভরা সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছিল। রিফর্ম ৫৩টি আসন জিতে নেয়। বিরোধী শিবিরে ২৪ জন কাউন্সিলর, তাদের মধ্যে ১৩ জন কনজারভেটিভ।
রিফর্মের স্বরাষ্ট্রবিষয়ক মুখপাত্র জিয়া ইউসুফ বলেছেন, ‘এই ধরনের ফল যদি সাধারণ নির্বাচনে পুনরাবৃত্তি হয়, তাহলে কনজারভেটিভ নেত্রী কেমি ব্যাডেনক নিজের আসন হারাবেন।’ তিনি ব্যাডেনকের নর্থ ওয়েস্ট এসেক্স আসনের কথা উল্লেখ করেন।
সাফোক কাউন্টি কাউন্সিলও রিফর্মের হাতে গেছে। দলটি সেখানে ৪১টি আসন জিতেছে, যার বেশিরভাগই কনজারভেটিভদের দখলে ছিল। ১৯৭৩ সাল থেকে লেবারের নিয়ন্ত্রণে থাকা সান্ডারল্যান্ডে রিফর্মের জয়কে বড় রাজনৈতিক ভূমিকম্প হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটে শক্তিশালী ‘লিভ’ ভোটের কারণে শহরটি আলোচনায় এসেছিল। এবার সেখানে রিফর্ম ৪৩টি আসন জিতেছে।
ফারাজ বলেছেন, ‘লেবার তাদের সবচেয়ে ঐতিহ্যগত অনেক এলাকাতেই মুছে যাচ্ছে।’
অর্থনৈতিকভাবে বঞ্চিত এলাকাগুলোতেও রিফর্মের ভোট বেড়েছে। ৬৯১টি ওয়ার্ডের প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে কম বঞ্চিত এলাকায় দলটির ভোটের হার গড়ে ২০ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত এলাকায় বেড়েছে ৩০ শতাংশ পয়েন্ট।
তবে ফলাফল রিফর্মের উত্থানের সীমাও দেখিয়েছে। সাধারণ নির্বাচনের পূর্বাভাস হিসেবে পরিচিত এসেক্সের হারলোতে ১১টি জেলা কাউন্সিল আসনের সবকটিই জিতেছে কনজারভেটিভরা। লন্ডনের লক্ষ্য এলাকাগুলোর একটি বেক্সলি কাউন্সিলের নিয়ন্ত্রণও নিতে পারেনি রিফর্ম।
ওয়েলসে সেনেড নির্বাচনে রিফর্ম বড় সাফল্য পেয়েছে। ৩৪টি আসন নিয়ে তারা দ্বিতীয় হয়েছে। প্লেইড কামরি সেখানে সর্বোচ্চ আসন পেয়েছে ৷ লেবার মাত্র ৯টি আসন পেয়ে তৃতীয় হয়েছে।
নির্বাচনবিশেষজ্ঞ পিটার কেলনার বলেছেন, ‘সামগ্রিকভাবে রিফর্ম ১ হাজারের বেশি আসন পেতে পারে। তবে দলটির উত্থানে কিছু সতর্কবার্তাও আছে। রিফর্ম হয়তো যেকোনো দলের যেকোনো নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন লাভের রেকর্ডের পথে আছে, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এটি বিস্ময়কর হতো। কিন্তু এক বছর আগের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, আসন ও ভোটের হিসাবে তারা ততটা ভালো করছে না।’
কেলনার বলেছেন, ‘গত বছরের স্থানীয় নির্বাচনে ইংল্যান্ডে রিফর্ম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা আসনের ৪১ শতাংশ জিতেছিল। এবার শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত হিসাব ছিল প্রায় ৩৫ শতাংশ। তার ভাষ্য, ‘সাম্প্রতিক জরিপ ও নির্বাচনের তথ্য আমাদের হাতে আছে এবং এতে স্পষ্ট যে রিফর্ম শীর্ষে পৌঁছে গেছে।’
বড় শহর বা মহানগর এলাকায় জয় না পেলে রিফর্ম সরকার গঠন করতে পারবে না— এমন ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছেন ফারাজ। এলবিসি রেডিওতে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছেন, ‘ওহ, হ্যাঁ প্রত্যেক দলেরই কিছু এলাকা দুর্বল, কিছু এলাকা শক্তিশালী।’
শুক্রবার রাতের এক সমাবেশে এসেক্সে নবনির্বাচিত রিফর্ম কাউন্সিলরদের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ বন্ধ দরজার আড়ালে রাখতে বলেছেন ফারাজ। তিনি বলেছেন, আমার পরামর্শ শুনুন। কখনো কখনো জিহ্বা কামড়ে ধরা ভালো, একটি ডেস্কের পেছনে গিয়ে দরজা বন্ধ করে তর্ক মিটিয়ে নেওয়া ভালো। কিন্তু গত কনজারভেটিভ সরকারের সাড়ে চার বছরের সাইকোড্রামার পর, আর লেবার যখন নিজেদের ভেতর ছিঁড়ে ফেলতে যাচ্ছে, ভোটাররা শেষ যে জিনিসটি দেখতে চান, সেটি হলো একই ধরনের বিশৃঙ্খলা। তাই দয়া করে, বিষয়টি মাথায় রাখুন।
এই ফল স্টারমারের লেবার সরকারের প্রতি কঠোর জনরায় হিসেবে এসেছে। ২০২৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে সরকার নানা সংকটে পড়েছে। ইংল্যান্ডে লেবার ৩৫টি কাউন্সিলের নিয়ন্ত্রণ এবং ১ হাজার ৩০০টির বেশি আসন হারিয়েছে। স্থানীয় নির্বাচনে স্পষ্ট বিজয়ী হয়েছে রিফর্ম।
এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেমস মিচেল বলেছেন, রিফর্মকে এখন স্থানীয় সরকারে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করতে হবে।
তিনি বলেছেন, ‘তারা (রিফর্ম) নির্বাচনী প্রচারের ফল উদ্যাপন করবে, সেটাই স্বাভাবিক। তবে এখন তাদের নজর দিতে হবে শাসনের কঠিন কাজে।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘স্থানীয় সরকারে ভিত্তি তৈরি করা পরবর্তী নির্বাচনে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে এর সঙ্গে সমস্যা মোকাবিলা ও সমাধানের দায়িত্বও আসে। অনেক কিছু নির্ভর করবে স্থানীয় সরকারে রিফর্ম কীভাবে কাজ করে তার ওপর।’
গ্রিন ও লিবারেল ডেমোক্র্যাটরাও অগ্রগতি করেছে। জ্যাক পোলানস্কির নেতৃত্বে গ্রিন পার্টি কিছু এলাকায় এগিয়েছে এবং এই ফলকে জাতীয় পর্যায়ে অগ্রগতির ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে।
নিউক্যাসলের গ্রিন কাউন্সিলর নিক হার্টলি বলেছেন, ‘গ্রিন রাজনীতি হলো তৃণমূলের, কমিউনিটির রাজনীতি। গত দুই বছরে নিউক্যাসলে আমরা দেখেছি, অন্যায়কে চ্যালেঞ্জ করতে এবং স্থানীয় উদ্যোগ গড়ে তুলতে মানুষ এক হলে কত শক্তি তৈরি হয়। রিফর্ম ইউকে, ধনকুবেরদের সমর্থনে এবং মঞ্চ থেকে বক্তৃতা দিয়ে, ওপরের লোকদের হাতে ক্ষমতা নেওয়ার রাজনীতি করে। তাদের হৃদয়ে আমাদের কমিউনিটি নেই।’
ইয়র্কশায়ারের এক গ্রিন সমর্থক রিফর্মের বার্তাকে বিভাজনমূলক বলে বর্ণনা করেছেন। বলেছেন, ‘তাদের কৌশল পুরোপুরি উসকানিমূলক ও বিভাজনমূলক। তারা যা বিশ্বাস করে, তা আমার কোনো বিশ্বাসের সঙ্গে মেলে না। আর আমার মনে হয়, এত গরম হাওয়া ছাড়লেও তাদের প্রকৃত নীতি নেই।’
কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের রাজনীতির অধ্যাপক টিম বেল জানান, এই ফল কয়েক মাসের জরিপের বার্তাকেই নিশ্চিত করছে।
‘ফলাফল দেখে মনে হচ্ছে, কয়েক মাস ধরে জনমত জরিপে যে বার্তা পাওয়া যাচ্ছিল, সেটি একেবারে সঠিক। ক্রমবর্ধমান বহুদলীয় ব্যবস্থায় রিফর্ম এখন দৌড়ে সবার সামনে এবং একই সঙ্গে ব্রিটিশ রাজনীতির ডানপন্থায় প্রধান শক্তি, কারণ তারা কনজারভেটিভের পাশাপাশি লেবারের আসনগুলোতেও বিপুল জয় পেয়েছে।




