হাঙ্গেরিতে ভোট শুরু
হারের শঙ্কায় ট্রাম্প-পুতিনের ‘বন্ধু’ ওরবান

ওরবানের প্রতিদ্বন্দ্বী পিটার ম্যাগিয়ারের মুখোশ মাথায় দুজন সমর্থক। ছবি : এপি
টানা ১৬ বছর ক্ষমতায় আছেন হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবান। দেড় দশকের মধ্যে এবারই প্রথম বড় প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন তিনি।
আজ রোববার স্থানীয় সময় সকাল ৯টা থেকে শুরু হয়েছে ভোট। চলবে পাঁচটা পর্যন্ত।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ওরবানের ফিদেজ পার্টির সঙ্গে বিরোধী নেতা পিটার ম্যাগিয়ারের দল তিসার লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি। ১ কোটি মানুষের দেশে ভোটার ৮০ লাখের কাছাকাছি।
একইসঙ্গে মস্কো ও যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু ওরবানের ক্ষমতা নড়বড়ে হয়ে গেছে বলে মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে, মধ্য-ডান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নপন্থি (ইইউ) প্রতিদ্বন্দ্বী পিটার ম্যাগিয়ার আদায় করেছেন বিপুল জনসমর্থন।
ওরবানের স্থিতিশীলতার বদলে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে পরিবর্তনের পক্ষে। সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে, ফিদেজ পার্টির চেয়ে বেশ খানিকটা এগিয়ে আছে তিসা। বড় সম্ভাবনা রয়েছে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার।
যদিও ওরবানের পক্ষে জোরালো সমর্থন দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার সমর্থনে এ সপ্তাহে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সফর করেছেন বুদাপেস্ট।
কিন্তু অনুমান করা হচ্ছে, এতেও জনসমর্থন বাড়েনি ফিদেজ পার্টির। বরং, ইরান যুদ্ধের কারণে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় হতাশ হাঙ্গেরিয়ানরা। হোয়াইট হাউসের এ সমর্থন হয়তো আরও কমিয়ে দিতে পারে আরবানের ভোট।
ভ্যান্সের এ সফর প্রমাণ করে বুদাপেস্টের নির্বাচনের দিকে কড়া নজর রাখছে ওয়াশিংটন। রক্ষণশীল ও নিপীড়নের বিতর্কে জর্জরিত ওরবানের শাসনকে নিজ স্বার্থে আদর্শ হিসেবে দেখে হোয়াইট হাউস।
ওরবানকে বন্ধু হিসেবে দেখে রাশিয়াও। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের চরম আপত্তি সত্ত্বেও ইউক্রেন যুদ্ধের তহবিল আটকে দিতে নিয়মিতভাবে ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করেছেন তিনি।
ফিদেজ পার্টির অন্যতম শক্ত ঘাঁটি সেকেসফেহেরভারে শুক্রবার শেষ জনসভায় ভাষণ দিয়েছেন ওরবান। হয় আমি, নয়তো জেলেনস্কি; এই দুইয়ের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হবে—এই বলে প্রচার শেষ করেন তিনি।
হাঙ্গেরি ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে বলে বেশ কয়েক বছর জোর দাবি করে আসছেন ওরবান। কিন্তু মার্তা বোগনারের মতো ফিদেজের দীর্ঘদিনের সমর্থকদের কাছে অন্তঃসারশূন্য বলে মনে হতে শুরু করেছে এসব বক্তব্য।
পরিবর্তনের পালে হাওয়া
বছরের পর বছর ধরে ওরবানকে ভোট দিয়েছেন বোগনার। এবার তার নিজ শহর সুমেগেতে প্রতিপক্ষের জন্য প্রচার চালাচ্ছেন তিনি। এটি ফিদেজের অন্যতম শক্ত ঘাঁটি।
বোগনার দাবি করেছেন, স্বাস্থ্যসেবার অবস্থা ভালো নয়, ওষুধ কিনতেও হিমশিম খাচ্ছেন।
তার ভাষ্য, দেশের পরিবর্তন দরকার। যদি পরিবর্তন না আসে, গৃহযুদ্ধও হতে পারে।
বোগনার হতাশার সুরে জানিয়েছেন, এই সরকারের ওপর সবাই ভীষণ ক্ষুব্ধ। রাশিয়া বা আমেরিকার সঙ্গে আমাদের জোট বাঁধার কোনো প্রয়োজন নেই, আমাদের স্থান ইউরোপীয় ইউনিয়নে।
ওরবানের বন্ধু ইভা কাটোনা-কোভাচের ব্যাপক দুর্নীতিকে সমর্থকদের দল ছাড়ার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।
একসময় ওরবানের একনিষ্ঠ সমর্থক ও কর্মী ছিলেন ৪৫ বছর বয়সী আইনজীবী পিটার ম্যাগিয়ার।
২০২৪ সালে দেশের বিচার ব্যবস্থা সংক্রান্ত একটি কেলেঙ্কারি এবং শিশু নির্যাতনের একটি মামলায় রাষ্ট্রপতির বিতর্কিত ক্ষমা ঘোষণার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেন তিনি। এ আন্দোলনের মাধ্যমে জনপ্রিয়তার শীর্ষ আসেন ম্যাগিয়ার।
রাজধানী ছাড়াও ছোট বড় সব শহরেই সমাবেশ করেছেন ম্যাগিয়ার। ছোট শহর সুমেগের সমাবেশ থেকে মাগিয়ার চিৎকার করেন, আর কয়েক দিনের মধ্যেই সব শেষ হয়ে যাবে এই দুর্নীতিগ্রস্ত মাফিয়া সরকারের।
ওরবানের অভিবাসনবিরোধী অভিযানকে সমর্থন করেন মাগিয়ার। তবে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন এবং ব্রাসেলসের আটকে রাখা ১৮ বিলিয়ন ডলার ফেরত আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
বুদাপেস্টের স্বেচ্ছাচারী শাসন ও দুর্নীতির জন্য এ তহবিল আটকে রেখেছে আঞ্চলিক সংস্থাটি।
জটিল নির্বাচনী ব্যবস্থা
হাঙ্গেরির নির্বাচনি ব্যবস্থা বেশ জটিল। ১৯৯টি আসনের মধ্যে ১০৬টি নির্বাচনী এলাকা এবং ৯৩টি দলীয় ফল থেকে নির্ধারিত হয় জয়-পরাজয়।
ভোটের আগে আরবান ১০৬টি আসনের সীমানাতেই পরিবর্তন এনেছেন। তার কারণে রবিবারের ফলাফল অনুমান করা বেশ কঠিন।
২০২৪ সালে বিরোধী দলের শক্ত ঘাঁটি বুদাপেস্টের আসন সংখ্যা ১৮ থেকে কমিয়ে ১৬ করা হয়। এসব কারণে ফল ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে যাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
বুদাপেস্ট থেকে পশ্চিমে অবস্থিত তাপোলকায় ওরবানের সমর্থকরা নিশ্চিত তিনিই আবার জিতবেন।
সেখানে হওয়া এক সমাবেশে উপস্থিত এক সমর্থক ফ্লোরিয়ান ফুস্তোসের দাবি, তরুণ পরিবারগুলো সন্তান নিতে পছন্দ করে এবং ওরবান সেটা সমর্থন করেন। এটি বার্ধক্যগ্রস্ত সমাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তার বিশ্বাস, ওরবান হারতে পারেন না। বিরোধীরা যতটা বলছে, প্রতিযোগিতা ততটা কঠিন নয়।
রবিবার মধ্যরাতের মধ্যে বুদাপেস্টের শাসনে পরিবর্তন হচ্ছে, নাকি ওরবানের হাতেই থাকছে— জানা যাবে স্পষ্ট।
সূত্র : আলজাজিরা

