রাশিয়ায় হামলায় প্রথমবার ব্রিটিশ ড্রোন ব্যবহার করল ইউক্রেন
- তেল শোধনাগার থেকে সামরিক স্থাপনা: দূরপাল্লার হামলায় ব্রিটেনে তৈরি অস্ত্র মস্কোর পাল্টা সাইবার ও গুপ্ত হামলার আশঙ্কাও বাড়ছে

ছবি: রয়টার্স
রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডের গভীরে দূরপাল্লার হামলায় প্রথমবারের মতো ব্রিটেনে তৈরি ড্রোন ব্যবহার করছে ইউক্রেন। গত ছয় মাস ধরে চালানো এসব অভিযানে লক্ষ্যবস্তু হয়েছে দক্ষিণ-পশ্চিম রাশিয়ার ভলগোগ্রাদ, মস্কোর উত্তর-পূর্বের ইয়ারোস্লাভল এবং মস্কোর কাছাকাছি কয়েকটি তেল শোধনাগার। ইউক্রেনীয় সামরিক কর্মকর্তারা ব্রিটিশ ড্রোন ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
ব্রিটিশ ড্রোন ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট প্রতিটি অভিযানের তারিখ নিরাপত্তার কারণে প্রকাশ করা হয়নি। তবে ইউক্রেনীয় সামরিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসের দূরপাল্লার হামলাগুলোতে এসব ড্রোন ব্যবহার শুরু হয়। লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল রাশিয়ার তেল শোধনাগার ও যুদ্ধের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিল্প অবকাঠামো। ব্রিটেনে তৈরি ‘নিয়ান’ নামের জেটচালিত একমুখী আক্রমণ ড্রোনও এই অভিযানে ব্যবহৃত হয়েছে। রাশিয়ার সীমান্তবর্তী বেলগোরোদ শহরেও নিয়ান ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে।
সাম্প্রতিক হামলাগুলোর মধ্যে ৬ আগস্ট ইয়ারোস্লাভলের স্লাভনেফট-ইয়ানোস তেল শোধনাগারে বড় ধরনের ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার পর আগুন ধরে যায়। মস্কো থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত এই স্থাপনার বছরে প্রায় দেড় কোটি টন অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা রয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ওই শোধনাগারে হামলার কথা নিশ্চিত করেছিলেন। তবে ওই দিনের হামলায় ব্যবহৃত প্রতিটি ড্রোনের মডেল প্রকাশ্যে জানানো হয়নি।
একইভাবে ৩১ জুলাই ভলগোগ্রাদ অঞ্চলে ড্রোন হামলায় একটি জ্বালানি স্থাপনা ও কয়েকটি গুদামে আগুন লাগে। পাঁচজন আহত হন। এই অঞ্চলেই রাশিয়ার অন্যতম বড় তেল শোধনাগার রয়েছে। ব্রিটিশ ড্রোন দিয়ে হামলা করা নিশ্চিত লক্ষ্যগুলোর তালিকাতেও ভলগোগ্রাদের তেল শোধনাগার রয়েছে, যদিও কোন দিনের নির্দিষ্ট হামলায় কোন ব্রিটিশ ড্রোন ব্যবহার হয়েছে, সেই তথ্য সামরিক কর্তৃপক্ষ প্রকাশ করেনি।
কী এই ‘নিয়ান’
‘নিয়ান’ একটি জেটচালিত একমুখী আক্রমণ ড্রোন। এটি তৈরি করেছে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান বিএই সিস্টেমসের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ক্যালেন-লেনজ। ব্রিটিশ রয়্যাল নেভিও ড্রোনটির পরীক্ষা চালিয়েছে। দ্রুত উৎপাদন এবং একসঙ্গে বহু ড্রোন পাঠানোর উপযোগী করে এটি তৈরি করা হয়েছে।
আরও একটি ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানের তৈরি দূরপাল্লার ড্রোন ইউক্রেন ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে। তবে নিরাপত্তার কারণে প্রতিষ্ঠানটির পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। ইউক্রেনের বেশির ভাগ দূরপাল্লার হামলা এখনও দেশটির নিজস্ব ড্রোন দিয়ে চালানো হলেও ব্রিটিশ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ‘উল্লেখযোগ্য সাফল্য’ পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন এক জ্যেষ্ঠ ইউক্রেনীয় সামরিক কর্মকর্তা।
এ ধরনের দূরপাল্লার ড্রোনের কিছু মডেল প্রায় ১ হাজার ১০০ মাইল পর্যন্ত উড়তে পারে। প্রতিটির খরচ আনুমানিক ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ পাউন্ড। তুলনায় ব্রিটিশ-ফরাসি স্টর্ম শ্যাডো ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা প্রায় ১৫০ মাইল এবং একটি নতুন ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহে সাড়ে সাত লাখ পাউন্ডের বেশি ব্যয় হতে পারে। কম খরচ এবং দ্রুত উৎপাদনের কারণে ড্রোনগুলোকে ঝাঁকে ঝাঁকে পাঠিয়ে রাশিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষাকে চাপে ফেলার সুযোগ পাচ্ছে ইউক্রেন।
ইউক্রেন সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাশিয়ার তেল শোধনাগার, সামরিক স্থাপনা, নৌঘাঁটি, রসদকেন্দ্র ও পরিবহণ অবকাঠামোয় দূরপাল্লার হামলা বাড়িয়েছে। কিয়েভের যুক্তি, এসব স্থাপনা রাশিয়ার যুদ্ধ পরিচালনা ও অর্থায়নে সহায়তা করছে। আগস্টেই ইয়ারোস্লাভল, ওরস্ক, নিজনেকামস্কসহ রাশিয়ার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনায় হামলা হয়েছে।
লন্ডনও ইউক্রেনকে ড্রোন সহায়তা বাড়াচ্ছে। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় গত ১৮ জুন ঘোষণা করেছে, চলতি বছরের শেষ নাগাদ ইউক্রেনকে ১ লাখ ৫০ হাজার ড্রোন সরবরাহ করা হবে। এর মধ্যে দূরপাল্লার আক্রমণ ড্রোনও রয়েছে। এর আগে এপ্রিলে যুক্তরাজ্য অন্তত ১ লাখ ২০ হাজার ড্রোন দেওয়ার পরিকল্পনা জানিয়েছিল।
পশ্চিমা অস্ত্র দিয়ে রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডে হামলা একসময় অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় ছিল। সরাসরি রাশিয়া-ন্যাটো সংঘাতের আশঙ্কায় এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহারে বিধিনিষেধ ছিল। সেই অবস্থান ধীরে ধীরে বদলেছে। এবার ব্রিটিশ ড্রোন রাশিয়ার গভীরে পৌঁছে যাওয়ায় যুদ্ধের সেই পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হলো।
সামনের সারিতে স্থলযুদ্ধ যখন দীর্ঘায়িত, তখন যুদ্ধের খরচ রাশিয়ার নিজ ভূখণ্ডে পৌঁছে দিতে তেল, সামরিক শিল্প ও রসদব্যবস্থাকে লক্ষ্য করছে কিয়েভ। সেই দূরপাল্লার অভিযানে ব্রিটিশ ড্রোনের প্রবেশ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আকাশপথের লড়াইয়ে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।






