বিদেশি শিক্ষার্থী কমায় ফি-ছাড়ের প্রতিযোগিতা ব্রিটেনের বিশ্ববিদ্যালয়ে
- আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কমে যাওয়ায় আয়েও বড় ধাক্কা
- বৃত্তির বদলে সরাসরি টিউশন ফি কমাচ্ছে একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয়

ইংল্যান্ডের ২৪টি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান আগামী ১২ মাসে আর্থিকভাবে টিকে থাকতে না পারার ঝুঁকিতে রয়েছে।
বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় আর্থিক চাপে পড়েছে যুক্তরাজ্যের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষার্থী টানতে তাই টিউশন ফিতে বড় অঙ্কের ছাড় দিচ্ছে একের পর এক প্রতিষ্ঠান। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৮ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত ছাড় পাচ্ছেন। এ পরিস্থিতিকে উচ্চশিক্ষা খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে এক ধরনের ‘দরযুদ্ধ’ হিসেবে দেখছেন।
শিক্ষা খাতবিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এস স্কোয়ার্ড ইনসাইটস যুক্তরাজ্যের ৯০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃত্তি ও ফি পর্যালোচনা করেছে। এর মধ্যে অন্তত ২২টি বিশ্ববিদ্যালয় পাঠদানভিত্তিক স্নাতকোত্তর কোর্সে ভর্তি হওয়া বিদেশি শিক্ষার্থীদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে টিউশন ফি ছাড় দিচ্ছে। অর্থাৎ, অনেক ক্ষেত্রে আলাদা করে বৃত্তির আবেদন বা মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার প্রয়োজন হচ্ছে না।
ইউনিভার্সিটি অব নটিংহাম ২০২৬ সালে পাঠদানভিত্তিক মাস্টার্স কোর্সে ভর্তি হওয়া বিদেশি শিক্ষার্থীদের প্রত্যেককে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৩ হাজার পাউন্ড ছাড় দিচ্ছে। আগে সেখানে ‘পোস্টগ্র্যাজুয়েট এক্সিলেন্স’ বৃত্তি মূলত মেধার ভিত্তিতে দেওয়া হতো। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে এক বছরের মাস্টার্স কোর্সের ফি বিষয়ভেদে প্রায় ৯ হাজার ৭০০ থেকে ৩৯ হাজার ৬০০ পাউন্ড।
আরও বড় ছাড় দিচ্ছে ইউনিভার্সিটি অব অ্যাবারডিন। আন্তর্জাতিক স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি থেকে সরাসরি ৮ হাজার পাউন্ড কমিয়ে দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। একই সময়ে প্রায় এক কোটি পাউন্ড ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা করছে বিশ্ববিদ্যালয়টি; এতে প্রায় ১০০টি চাকরি ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
ইউনিভার্সিটি অব কেন্ট চলতি সেপ্টেম্বরে মাস্টার্সে ভর্তি হওয়া ১৪টি দেশের সফল আবেদনকারীদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৫ হাজার পাউন্ড ছাড় দিচ্ছে। দেশগুলোর বেশির ভাগই এশিয়ার। বিশ্ববিদ্যালয়টি জানিয়েছে, ২০২৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে সব বিদেশি আবেদনকারীর জন্য এই সুবিধা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
কেন এই ছাড়
বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়াই এর মূল কারণ। ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয়ের বড় একটি অংশ আসে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে, বিশেষ করে এক বছরের পাঠদানভিত্তিক মাস্টার্স ও অন্যান্য স্নাতকোত্তর কোর্স থেকে।
২০২২-২৩ থেকে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের মধ্যে এই ধরনের কোর্সে বিদেশি শিক্ষার্থীর ভর্তি প্রায় ১৭ শতাংশ কমেছে। ২০২৪ সাল থেকে অধিকাংশ মাস্টার্স শিক্ষার্থীর পরিবারের সদস্যদের যুক্তরাজ্যে সঙ্গে নেওয়ার সুযোগ বন্ধ হওয়া এবং পরবর্তী ভিসা-কড়াকড়িকে এই পতনের বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ১২ মাসে মূল আবেদনকারীদের স্পনসরড স্টাডি ভিসার আবেদন হয়েছে ৩ লাখ ৮১ হাজার ৫০০টি, যা আগের বছরের তুলনায় ১১ শতাংশ কম।
এর প্রভাব পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়েও। ইংল্যান্ডে পাঠদানভিত্তিক স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয় ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের প্রায় ৫৫০ কোটি পাউন্ড থেকে ২০২৪-২৫ সালে ৫০০ কোটি পাউন্ডে নেমেছে।
এস স্কোয়ার্ড ইনসাইটসের পরিচালক জুলিয়ান ওয়েস্টউডের আশঙ্কা, সমস্যা শুধু শিক্ষার্থী কমে যাওয়ায় নয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন বেশি শিক্ষার্থী আকর্ষণের জন্য বড় অংশকে ছাড় দিচ্ছে। ফলে একদিকে শিক্ষার্থী কমছে, অন্যদিকে প্রত্যেক বিদেশি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে পাওয়া গড় আয়ও কমছে।
উচ্চশিক্ষা খাতের ব্র্যান্ডিং বিশেষজ্ঞ জিনাত ফায়াজ সতর্ক করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতিযোগিতা যদি শিক্ষার মান, গবেষণা কিংবা চাকরির সুযোগের বদলে ‘কার ডিগ্রি কত সস্তা’এই প্রশ্নে নেমে আসে, তাহলে তা দীর্ঘ মেয়াদে ব্রিটিশ উচ্চশিক্ষার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
আর্থিক চাপ আরও বাড়তে পারে নতুন সরকারি নীতিতে। ২০২৮ সালের ১ আগস্ট থেকে ইংল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রতি বিদেশি শিক্ষার্থীর জন্য বছরে ৯২৫ পাউন্ড লেভি বা কর দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকার বলেছে, এই অর্থ উচ্চশিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে পুনর্বিনিয়োগ করা হবে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বলছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন কর তাদের উপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে।
ব্রিটিশ পার্লামেন্টের শিক্ষা কমিটিও উচ্চশিক্ষা খাতের পরিস্থিতিকে ‘আর্থিক সংকট’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তাদের হিসাবে, ইংল্যান্ডের ২৪টি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান আগামী ১২ মাসে আর্থিকভাবে টিকে থাকতে না পারার ঝুঁকিতে রয়েছে।
ফলে বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বর্তমান পরিস্থিতি একদিকে সুযোগ–হাজার হাজার পাউন্ড কম খরচে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য এটি বড় সতর্কবার্তা। যে বিদেশি শিক্ষার্থীদের উচ্চ টিউশন ফি এত দিন ব্রিটিশ উচ্চশিক্ষার আর্থিক ভরসা ছিল, তাঁদেরই এখন ছাড় দিয়ে টানতে হচ্ছে।






