সহায়তা, শর্ত আর বিতর্ক
জার্মানির শরণার্থী একীভূতকরণ আইনের এক দশক
- ভাষা শেখা ও চাকরিতে বড় অগ্রগতি, কিন্তু বসবাসের বাধ্যবাধকতা ও নীতির জটিলতা নিয়ে এখনও প্রশ্ন

ছবি: রয়টার্স
২০১৫ সালে সিরিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুল সংখ্যক শরণার্থী জার্মানিতে পৌঁছানোর পর দেশটির রাজনীতি ও সমাজে তীব্র বিভাজন তৈরি হয়েছিল। সেই উত্তেজনার মধ্যেই অ্যাঞ্জেলা মারকেলের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন সরকার ২০১৬ সালের আগস্টে চালু করে ‘ইন্টিগ্রেশন আইন’, যার মূল কথা ছিল, শরণার্থীদের একীভূত হতে রাষ্ট্র সাহায্য করবে, কিন্তু একই সঙ্গে ভাষা শেখা, প্রশিক্ষণ নেওয়া ও সমাজে অংশগ্রহণের দায়ও তাঁদের নিতে হবে। আইনটি কার্যকর হওয়ার দশ বছর পূর্তিতে শনিবার এর সাফল্য ও সীমাবদ্ধতার হিসাব তুলে ধরেছে ডয়চে ভেলে।
আইনের মাধ্যমে ভাষা ও একীভূতকরণ কোর্স ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয় এবং শরণার্থীদের শ্রমবাজারে ঢোকার পথও সহজ করা হয়। যাদের আশ্রয় আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলেও নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব ছিল না, তাঁদের তিন বছরের কারিগরি প্রশিক্ষণ শেষ করে আরও দুই বছর সংশ্লিষ্ট পেশায় কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে ভাষা ও একীভূতকরণ কোর্সে অংশ নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়; অস্বীকার করলে সামাজিক সহায়তা কমানোর ব্যবস্থাও ছিল।
এই দশ বছরে চাকরির হার প্রায় জাতীয় গড়ের কাছাকাছি৷ শ্রমবাজারের হিসাবে ফলাফলকে মোটের উপর ইতিবাচক বলছেন গবেষকেরা। জার্মানির ইনস্টিটিউট ফর এমপ্লয়মেন্ট রিসার্চের হিসাবে, ২০১৫ সালে আসা শরণার্থীদের চাকরির হার ২০২৪ সালে ৬৪ শতাংশে পৌঁছেছে। ডয়চে ভেলের প্রতিবেদনে গবেষক হারবার্ট ব্র্যুকার বলেছেন, দশ বছর পর কর্মসংস্থানের হার ৬৫ থেকে ৬৭ শতাংশের মধ্যে, যা জাতীয় গড়ের মাত্র কয়েক শতাংশ নিচে। ইউরোপের তুলনায়ও জার্মানির অবস্থান বেশ শক্তিশালী।
ভাষা শেখার ক্ষেত্রেও অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য। জার্মানির অভিবাসন ও শরণার্থীবিষয়ক ফেডারেল দপ্তরের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৫ ও ২০১৬ সালে আসা শরণার্থীদের মধ্যে জরিপে অংশ নেওয়া ৯০ শতাংশের বেশি এখন নিজেদের জার্মান ভাষাজ্ঞানকে মাঝারি, ভালো বা খুব ভালো বলে জানিয়েছেন।
তবে আইনের সব ব্যবস্থা সমান কার্যকর হয়নি। সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয়েছে নির্দিষ্ট এলাকায় বসবাসের বাধ্যবাধকতা। শরণার্থীদের বড় শহরে অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত হওয়া ঠেকাতে তাদের বিভিন্ন অঞ্চলে ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু গবেষকদের মতে, অনেককে এমন এলাকায় পাঠানো হয় যেখানে চাকরির সুযোগ কম ও বেকারত্ব বেশি। এতে শ্রমবাজারে একীভূত হওয়া বরং কঠিন হয়েছে।
অন্যদিকে কারিগরি প্রশিক্ষণ শেষ করার সুযোগকে সফল উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের যুক্তি, যাদের সামনে দীর্ঘমেয়াদে থাকার বাস্তব সম্ভাবনা থাকে, তাঁরা ভাষা শেখা ও চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে বেশি বিনিয়োগ করেন এবং পরে কর ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় অবদান রাখেন।
দশ বছর পরে জার্মানির রাজনৈতিক পরিবেশ অবশ্য ২০১৬ সালের মতো নেই। অভিবাসন ও আশ্রয়নীতিতে এখন অনেক বেশি কড়াকড়ি। ২০২৬ সালের জুনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন অভিন্ন আশ্রয়ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে, যেখানে বহির্সীমান্তে দ্রুত যাচাই ও কিছু দেশের আবেদনকারীর জন্য দ্রুততর সীমান্ত প্রক্রিয়া চালু হয়েছে।
একই সময়ে একীভূতকরণ কোর্সের অর্থায়ন ও কারা বিনা খরচে অংশ নিতে পারবেন, তা নিয়েও বিতর্ক হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে সরকার বাজেট সংকোচনের কারণে কিছু শ্রেণির অভিবাসীর প্রবেশাধিকার সীমিত করেছিল; পরে জুন থেকে ইউক্রেনীয় ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিকদের আবারও কোর্সে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞ কাউন্সিল অন ইন্টিগ্রেশন অ্যান্ড মাইগ্রেশনের হোলগার কোলবের মতে, ২০১৬ সালের আইনটির নাম যত বিস্তৃত, বাস্তবে তার পরিধি ততটা নয়। এটি মূলত শরণার্থী হিসেবে আসা মানুষদের জন্য তৈরি; জার্মানিতে আগে থেকেই বসবাসকারী সব অভিবাসীর একীভূতকরণকে সামগ্রিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করে না। তার মতে, নিয়ম আরও সরল এবং কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের মধ্যে সমন্বয় আরও শক্ত হওয়া দরকার।
দশ বছরের হিসাব তাই একেবারে সাদা-কালো নয়। একদিকে ভাষা শেখা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও চাকরির সুযোগ বাড়িয়ে বহু শরণার্থীকে শ্রমবাজারে টেনে আনতে পেরেছে জার্মানি। অন্যদিকে ভুল জায়গায় বসবাসের বাধ্যবাধকতা, ধীর আশ্রয়প্রক্রিয়া এবং জটিল প্রশাসনিক নিয়ম এখনও একীভূতকরণের পথে বাধা।
২০১৬ সালে প্রশ্ন ছিল, জার্মানি এত মানুষকে সামলাতে পারবে কি না। দশ বছর পরে প্রশ্নটা বদলেছে: যারা থেকে গেছেন, তাদের কত দ্রুত এবং কত কার্যকরভাবে সমাজের পূর্ণ অংশ করে তোলা যাবে।




