হাঙ্গেরি
অরবানের দেড় দশকের শাসন ভেঙে তছনছ

ভূমিধস জয় পেয়েছেন পিটার মাগয়ার । ছবি : রয়টার্স
দানিয়ুব নদীর তীরে রাজকীয় পার্লামেন্ট। গত ১৬ বছর দখলে রেখেছিলেন হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান। গতকাল মধ্যরাতে ভেঙেচুরে গেল তার দেড় দশকের রাজত্ব। ভবনটিতে এখন স্বাগত জানানো হবে ৪৫ বছর বয়সী পিটার মাগয়ারকে। সদ্য অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছেন তিনি।
‘আমরা পেরেছি, সবাই মিলে পরিবর্তন করেছি হাঙ্গেরীয় শাসনব্যবস্থা। ‘রিয়া-রিয়া-হাঙ্গেরি’, আপনারা অলৌকিক কাণ্ড ঘটিয়েছেন, হাঙ্গেরি ইতিহাস সৃষ্টি করেছে’, উল্লসিত সমর্থকদের বলছিলেন মাগয়ার।
‘নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্র’ হিসেবে নিন্দিত অরবানের শাসনব্যবস্থা এখন ধ্বংসস্তূপ। তবে মাগয়ার একসময় ছিলেন তার দলেরই সদস্য।
এ জয়ের সঙ্গে ১৮৪৮ সালের হাঙ্গেরীয় বিপ্লব ও ১৯৫৬ সালে সোভিয়েত দখলদারত্বের বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থানের তুলনা করেছেন মাগয়ার। একসময় অরবান নিজেও একই বয়ান ছড়াতেন
হাঙ্গেরির নির্বাচনে এবার ভোট পড়েছে ৯৮ শতাংশের বেশি। প্রায় ১ কোটি জনসংখ্যার দেশটিতে মাগয়ারের দল তিসজা জয় পেয়েছে ১৩৮টি আসনে। অন্যদিকে অরবানের 'ফিদেজ' দল পেয়েছে মাত্র ৫৫টি। ভোটের মাঠে আরও একটি প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল ‘আওয়ার হোমল্যান্ড’। উগ্র-ডানপন্থি দলটি পেয়েছে মাত্র ৬ আসন।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বিশ্ব রাজনীতিতে অরবানের অবস্থান ছিল কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তার পেছনে সমর্থন ছিল রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্রের। তার পরাজয় প্রভাব ফেলবে বিশ্ব রাজনীতির মেরূকরণেও। তবে সোভিয়েত বিরোধিতা পুঁজি করে ক্ষমতায় আসা অরবান যেভাবে পুতিনের মিত্র হয়ে উঠেছিলেন তাতে সন্দেহ জাগতেই পারে। মাগয়ারও কি একই পথে হাঁটবেন?
ভূমিধস জয়ের কারণে মাগয়ার সুযোগ পাবেন দেশের অজনপ্রিয় নীতিগুলো পরিবর্তনের। পাশাপাশি হাঙ্গেরির সঙ্গে বিশ্বের সম্পর্ক নতুন করে ঢেলে সাজাতে।
অরবান ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। এমনকি প্রচারের শেষ সপ্তাহে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ব্যক্তিগতভাবে দাঁড়িয়েছিলেন তার পক্ষে। পাশাপাশি ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু অরবানকে দেখা হতো ইইউ এবং ইউক্রেনের জন্য এক বড় বিষফোঁড়া হিসেবে।
ভোটে জেতার জন্য মাগয়ারও নিয়েছেন পপুলিজমের আশ্রয়। তার মূল প্রতিশ্রুতিই ছিল মস্কো থেকে দূরে, ইইউ এবং ইউক্রেনের কাছে। এই আন্দোলন তিনি গ্রাম, শহর ও নগরের আনাচে-কানাচে ছড়িয়েছেন দুই বছর ধরে। হাঙ্গেরির প্রতিটি অংশে মিশে থাকা স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে মানুষকে করেছেন ঐক্যবদ্ধ।
রেকর্ড ৭৯.৫ শতাংশ ভোট পড়ার পর উচ্ছ্বসিত মাগয়ার বলছিলেন, ‘গণতান্ত্রিক হাঙ্গেরির ইতিহাসে এর আগে কখনো এত বেশি মানুষ ভোট দেয়নি। কোনো একক দল এত শক্তিশালী ম্যান্ডেটও পায়নি।’
টানা চারবার নির্বাচনে জিতে অরবানের যে বিশাল আধিপত্য গড়ে উঠেছিল, তা মুহূর্তেই যেন ধসে পড়ল। দানিয়ুব নদীর বুদা অংশে মাগয়ারের সমর্থকরা যখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন, তখন ফেসবুকে বার্তা দেন তিনি। ‘ভিক্টর অরবান এইমাত্র আমাকে ফোন করে জয়ের জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন।’
গণনা শেষ হওয়ার আগেই নিজের পরাজয় টের পেয়েছিলেন অরবান। তাই দানিয়ুবের অন্য পাড়ে দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে সমাবেশে হাজির হন। ‘নির্বাচনের ফলাফল স্পষ্ট ও বেদনাদায়ক। সামনের দিনগুলো আমাদের ক্ষত সারানোর সময়,’ প্রায় ২৫ লাখ ভোটার-সমর্থকদের ধন্যবাদ জানিয়ে বক্তৃতা দেন তিনি।
আর এই খবর মুহূর্তেই চাউর হয় মাগয়ারের সমর্থক শিবিরে। তিসজার সদর দপ্তরে কর্মীরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন খুশিতে।
মাগয়ারকে শতভাগ বিশ্বাস করতে পারবেন না
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অরবানের আমলের সংশোধন বাতিল, দুর্নীতি দমন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনা এবং ‘এনইআর’ নামের ব্যবস্থা ধ্বংস করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মাগয়ার। কারণ এই ব্যবস্থায় গত সরকারের অনুগতরা ধনী হয়েছেন। অপচয় হয়েছে রাষ্ট্রীয় সম্পদ।
এই পরিবর্তনগুলো আনার জন্য তার প্রয়োজন ছিল সংসদের ১৯৯টি আসনের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ বা ১৩৩টি আসন। চূড়ান্ত ফল না এলেও অন্তত ১৩৮টি আসন পেতে যাচ্ছে তিসজা।
মাগয়ার তার সমর্থকদের বলেছিলেন সরকার পরিবর্তনের প্রস্তুতি নিতে। তাই জয় আসতেই শুরু হয় শ্যাম্পেনের ফোয়ারা ও উৎসব। বুদাপেস্টে গাড়ির হর্ন আর খোলা সান-রুফ দিয়ে হাঙ্গেরির পতাকা ওড়ানো নারীদের উল্লাসে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ।
মাগয়ারের সমর্থকদের সবাই তার অন্ধ ভক্ত নন। বছরের পর বছর অরবানকে সমর্থন করে এখন তাকেই করলেন ক্ষমতাচ্যুত। তাই কেউ কেউ তার ওপর পূর্ণ আস্থা রাখা নিয়ে সন্দিহান। যেমনটা জানিয়েছেন আগ্নেস নামে এক আইনজীবী।
তার ভাষ্য, ‘তিনি এমন একজন যাকে আপনি শতভাগ বিশ্বাস করতে পারবেন না। তবে আমরা এমন পর্যায়ে আছি যেখানে ভালো কিছুর আশ্বাস প্রয়োজন। তিনি তাই দিচ্ছেন।’
প্রথম সফর পোল্যান্ডে
মাগয়ারের পরবর্তী লক্ষ্য অরবানের অনুগত রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। এমওয়ান টিভি চ্যানেল এবং এক সময়ের স্বাধীন ওয়েবসাইটগুলো অরবানের দখলে যাওয়ার পর থেকেই শুধু প্রচারিত হয়েছে দলের গুণকীর্তন। তবে জয়ের পর দিশেহারা এমওয়ান চ্যানেল মাগয়ারের ভাষণটিই প্রচার করেছে। যে ভাষণ তিনি দিয়েছিলেন দানিয়ুবের তীরে। কিন্তু ততক্ষণে ভাষণটি হয়ে গেছে পুরোনো।
এ জয়ের সঙ্গে ১৮৪৮ সালের হাঙ্গেরীয় বিপ্লব ও ১৯৫৬ সালে সোভিয়েত দখলদারত্বের বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থানের তুলনা করেছেন মাগয়ার। একসময় অরবান নিজেও একই বয়ান ছড়াতেন। সস্তা রুশ তেল ও পেট্রলের পক্ষ নেওয়ায় ইইউতে তার জনপ্রিয়তা ব্যাপক কমে যায়। তার বাধায় আটকে যায় ইউক্রেনের জন্য ৯০ বিলিয়ন ইউরোর ঋণ সহায়তাও।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মাগয়ারের প্রথম বিদেশ সফর ওয়ারশতে। পোল্যান্ডের সঙ্গে হাঙ্গেরির হাজার বছরের বন্ধুত্ব আরও সুদৃঢ় করাই লক্ষ্য। এ ছাড়া ব্রাসেলস সফরের প্রতিশ্রুতিও আছে তার। প্রতিদিন সাতটি ভাষণ দিয়ে দেশকে জাগিয়ে তোলা এক ম্যারাথন প্রচারের পর মাগয়ারের আত্মবিশ্বাস এখন তুঙ্গে। বিপরীতে অরবানকে দেখাচ্ছে ক্লান্ত। যেন তিনি আগেই জানতেন এমন পরাজয়ের কথা।
৬২ বছর বয়সী অরবান এখনো দলীয় প্রধানের পদ ছাড়েননি। তবে তাকে ছাড়া ফিদেজ দলের ভবিষ্যৎ কল্পনা করাও কঠিন। আপাতত তিনি ও তার দল নিজেদের ক্ষত সারাতে হাঙ্গেরির অন্তর্বর্তী নেতৃত্বের দায়িত্বে থাকবেন।




















