হৃদয় নিংড়ানো শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় খামেনির শেষযাত্রা

সর্বোচ্চ নেতার বিদায়ে গতকাল তেহরানে ইরানিদের আহাজারি। ছবি: রয়টার্স
শোক নেমেছিল সেদিনই। ২৮ ফেব্রুয়ারির ‘কাল সকাল’। ইরানের ইতিহাসের আরেক কালো দিন। মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলায় প্রাণ হারান ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি (৮৬)। এতিম হয়ে যায় পুরো জাতি। মুহূর্তেই নিথর হয়ে যায় পুরো ইরান। সেদিনের যে স্তব্ধতার সূচনা হয়েছিল পুরো জনপদে; চার মাস পর সেটিই রূপ নিয়েছে বাঁধভাঙা কান্নায়। এতদিন যুদ্ধ আর বোমার আতঙ্কে প্রিয় নেতাকে শেষ বিদায় জানানোর সুযোগ পাননি ইরানিরা। গতকাল শুক্রবার থেকে শুরু হয়েছে সে বিদায়যাত্রা। চলবে টানা ছয় দিন। আগামী বৃহস্পতিবার চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন জাতির প্রাণ। ইরানের গত ৩৭ বছরের কাণ্ডারি।
১৯৮৯ সালেও একবার কেঁদেছিল ইরান সর্বোচ্চ নেতা ইমাম খোমেনির বিদায়ে। গতকাল খামেনির শেষযাত্রায় সেই কান্নার নদী যেন মহাসমুদ্রে রূপ নিয়েছে ইরানে। জুলাইয়ের তপ্ত ধুলো আর তীব্র গরমের মধ্যে কালো চাদরে আবৃত মা-বোনদের আহাজারি, পুরুষদের চোখের পানি আর ‘বিদায় প্রিয় নেতা’ ধ্বনিতে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ। প্রিয় নেতাকে শেষবার একটু ছুঁয়ে দেখার ব্যাকুলতায় কফিনের দিকে ছুটে যাচ্ছে লাখ লাখ মানুষ; যা সামাল দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন নিরাপত্তাকর্মীরাও।
এ শুধু শেষ বিদায় নয়; বিশ্বরাজনীতি ও ইরানের ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলনের এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ের মহাপ্রস্থানের সূচনা। খামেনি এবং তার পরিবারের চার সদস্যের শেষ বিদায়ের দীর্ঘ ও অশ্রুসিক্ত আনুষ্ঠানিকতা। গতকাল ভোরে শহীদ নেতার মরদেহ আনা হয় তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লার জুমার নামাজ মিলনায়তনে। মুহূর্তে শোকাচ্ছন্ন হয়ে ওঠে চারপাশ। রাজধানী তেহরানের প্রবেশপথগুলো থেকে শুরু করে প্রধান প্রধান চত্বর— সর্বত্রই তখন লাখ লাখ মানুষের কালো সমুদ্র। ধারণা করা হচ্ছে, দুই কোটিরও বেশি মানুষের জমায়েত হবে এ শোকযাত্রায়। ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম ও দীর্ঘতম এই বিদায় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ইরান জুড়ে একদিকে যেমন গভীর শোক ও রাজনৈতিক উত্তাপ, অন্যদিকে পুরো দেশকে ঢেকে দেওয়া হয়েছে কড়া সামরিক সতর্কতায়। শুধু ইরানে নয়, বুধবার ইরাকের নাজাফ আর কারবালায়ও জানাজা হবে খামেনির।
বিদেশি প্রতিনিধিদলের শ্রদ্ধা: গতকাল দিনটি মূলত নির্ধারিত ছিল বিদেশি কূটনীতিক, ধর্মীয় নেতা ও বিভিন্ন দেশের সরকারি-বেসরকারি প্রতিনিধিদলের শ্রদ্ধার জন্য। আজ থেকে শুরু হতে যাওয়া কোটি জনতার মূল ও অবরুদ্ধ শোক অনুষ্ঠানের আগে আমন্ত্রিত বিদেশি অতিথিদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থেই এক দিন আগে এ বিশেষ শ্রদ্ধার আয়োজন।
সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়া, আফগানিস্তান, রাশিয়া, ভারত, চীন, তুরস্ক, ইরাক, ওমান, লেবানন, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, হাঙ্গেরি, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের আলেম, ধর্মীয় চিন্তাবিদ এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিদল শহীদ নেতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। এর পাশাপাশি ইরানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের (খ্রিস্টান ও ইহুদি) প্রতিনিধিরাও এই অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
বিকালে ইরানের তিন বিভাগের প্রধান— প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম-হোসেন মোহসেনি-এজেয়ি যৌথভাবে মোসাল্লায় এসে শ্রদ্ধা জানান। তাদের সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কমান্ডার এবং প্রবীণ রাজনীতিক গোলাম আলি হাদ্দাদ আদেলসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, এ বিশেষ আয়োজনে বিশ্বের প্রায় ১০০টি দেশের সরকারি প্রতিনিধিদল, আটজন রাষ্ট্রপ্রধান এবং বাংলাদেশের হাফিজ উদ্দিন আহমদসহ বিভিন্ন দেশের ১২ জন পার্লামেন্ট স্পিকার ছুটে গেছেন সর্বোচ্চ নেতাকে শ্রদ্ধা জানাতে। বিকালের নির্ধারিত সময়ে সর্বোচ্চ নেতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। নিরাপত্তা ও কৌশলগত কারণে বাবা ও সহধর্মিণীর এ বিদায়ে উপস্থিত থাকতে পারছেন না মোজতবা খামেনি।
নজিরবিহীন নিরাপত্তা: রাজধানী তেহরানকে এক অভেদ্য সামরিক দুর্গে পরিণত করা হয়েছে। শহরের ১৪টি প্রধান প্রবেশপথে ব্যবস্থা করা হয়েছে বিশাল পার্কিং লটের। মূল জানাজার রুট নির্ধারণ করা হয়েছে দামাভান্দ, ইনকিলাব, আজাদি এবং শহীদ লাশগারি সড়ক। নিরাপত্তার স্বার্থে মোসাল্লার চারপাশের ১ দশমিক ৫ কিলোমিটারের মধ্যে সাধারণ মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ি প্রবেশ নিষিদ্ধ। নিরাপত্তার মূল দায়িত্বে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি), বিশেষ নিরাপত্তা স্কোয়াড ‘ওয়ালি আমর’ এবং বাসিজ স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী। আকাশপথে ড্রোন ও বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সার্বক্ষণিক সক্রিয় রাখা হয়েছে। তা ছাড়া দূরবর্তী প্রদেশগুলো থেকে আসা লাখ লাখ মানুষের আশ্রয়ের জন্য মিলনায়তনগুলো উন্মুক্ত করে দিয়েছে তেহরানের স্কুল, কলেজগুলো।
আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণে স্বতঃস্ফূর্ত কাফেল: রাষ্ট্রীয় জানাজা ও বিদায় পর্বে অংশ নেওয়ার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের শীর্ষ নেতারা তেহরানে এসে পৌঁছেছেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও দেশটির সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির তেহরানে উপস্থিত হন। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যস্থতায়, বিশেষ করে এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি এবং ১৮ জুনের সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নে ইসলামাবাদের একটি বিশেষ কূটনৈতিক ভূমিকা ছিল।
এ ছাড়া তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমোমালি রহমান, আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান এবং জর্জিয়ার প্রেসিডেন্ট মিখাইল কাভেলাশভিলি সরাসরি এ শোকানুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন। রাশিয়া ও চীনের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন যথাক্রমে রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধান ও সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ এবং চীনের জাতীয় গণকংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান হে ওয়েই।
জনমানসের অবস্থা— অশ্রু ও ক্ষোভের মেলবন্ধন: এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে আয়াতুল্লাহ খামেনি যেখানে (কার্যালয় ও বাসভবন) শহীদ হয়েছিলেন, ঠিক সেই স্থানের কাছের বিরাট ময়দানে আবেগঘন বিদায় অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। ইরানের হাজার হাজার শহীদ পরিবারের উপস্থিতিতে ইমাম হোসাইন (আ.)-এর পবিত্র মাজারের লাল পতাকায় আচ্ছাদিত নেতার কফিনের সামনে দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন উপস্থিত জাইরিনরা (শোক পালনকারী)।
নিরাপত্তা ও নজিরবিহীন প্রশাসনিক ব্যবস্থা: আগামী দিনগুলোতে ১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ২ কোটি মানুষের সম্ভাব্য সমাগম বিবেচনায় রেখে রাজধানী তেহরানকে এক অভেদ্য সামরিক দুর্গে পরিণত করা হয়েছে। শহরের ১৪টি প্রধান প্রবেশপথে বিশাল পার্কিং লটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা জিলহজ ও জাইরেলদের সুবিধার্থে তেহরানের অভ্যন্তরীণ সব মেট্রোরেল এবং বিশেষ রুটের বাস সার্ভিস সম্পূর্ণ ফ্রি (বিনামূল্যে) করা হয়েছে এবং নির্দেশ দেওয়া হয়েছে মেট্রো পরিষেবা ২৪ ঘণ্টা সচল রাখার।
মূল জানাজার রুট হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে দামাভান্দ, ইনকিলাব, আজাদি এবং শহীদ লাশগারি সড়ক। নিরাপত্তার স্বার্থে মোসাল্লার চারপাশের দেড় কিলোমিটারের মধ্যে সাধারণ মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ি প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নিরাপত্তার মূল দায়িত্বে রয়েছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি), বিশেষ নিরাপত্তা স্কোয়াড ‘ওয়ালি আমর’ এবং বাসিজ স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী। আকাশপথে ড্রোন ও বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সার্বক্ষণিক সক্রিয় রাখা হয়েছে। তা ছাড়া দূরবর্তী প্রদেশগুলো থেকে আসা লাখ লাখ মানুষের আশ্রয়ের জন্য মিলনায়তনগুলো উন্মুক্ত করে দিয়েছে তেহরানের স্কুল, কলেজগুলো। মোসাল্লা প্রাঙ্গণে অপারেশন থিয়েটারসহ একটি পূর্ণাঙ্গ অস্থায়ী বিশেষায়িত হাসপাতালসহ চালু করা হয়েছে ওয়াটার কুলিং সিস্টেমও।
লেখক: ইরানের জাতীয় সম্প্রচার সংস্থা আইআইআরবির বাংলা বিভাগের সাংবাদিক




