কেন মিনি-রিটায়ারমেন্টে ঝুঁকছেন তরুণরা

৩৩ বছর বয়সী আলি রোসলি একজন অন্তর্বর্তীকালীন অর্থ বিভাগের প্রধান
সাধারণত কর্মজীবনের শেষ অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অবসর। কিন্তু সেই ধারণা বদলে দিচ্ছেন নতুন প্রজন্মের অনেকেই। দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষে অবসরের অপেক্ষায় না থেকে মাঝেমধ্যেই কাজ থেকে কয়েক মাসের বিরতি নিচ্ছেন তারা। করছেন ভ্রমণ, অর্জন করছেন নতুন দক্ষতা কিংবা গুছিয়ে নিচ্ছেন ক্যারিয়ারকে। আত্মউন্নয়ন বা নতুন পরিকল্পনায় সময় দেওয়ার এই প্রবণতা মিনি-রিটায়ারমেন্ট নামে পরিচিত। আর এই মিনি-রিটায়ারমেন্ট ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বিশ্বের তরুণ পেশাজীবীদের মধ্যে।
বেশিরভাগ মানুষের মতোই অবসরের জন্য সঞ্চয় করছেন আলি রোসলি। তবে অবসরের সুবিধা পেতে কয়েক দশক অপেক্ষা করতে চাননি তিনি।
গত সাত বছরে দুবার মিনি-রিটায়ারমেন্ট নিয়েছেন ৩৩ বছর বয়সী ওই যুবক। প্রথমবার ২০১৯ সালে দুই মাসের জন্য এবং দ্বিতীয়বার ২০২৫ সালের নভেম্বরে চার মাসের জন্য। প্রথমবার মালয়েশিয়ায় সহকারী নিরীক্ষা ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত অবস্থায় এই ছুটি নেন তিনি। সেখানে সপ্তাহে ৮০ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হতো তাকে। রোসলির ভাষ্য, অতিরিক্ত কাজের চাপ তাকে মানসিক ও শারীরিকভাবে ক্লান্ত করে তুলেছিল।
তিনি বলেছেন, ‘বিশ্রাম নেওয়া এবং নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবার সময় মনে হলো, দুই মাসের দীর্ঘ ভ্রমণে বের হলে কেমন হয়?’
সে সময় রোসলির বার্ষিক আয় ছিল প্রায় ১৪ হাজার পাউন্ড বা প্রায় ১৮ হাজার ৮১৫ ডলার। আয়ের ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত সঞ্চয় ও বিনিয়োগ করতেন তিনি। সেই সঞ্চয়ের অর্থ দিয়ে বেইজিং থেকে রাশিয়া হয়ে ইউরোপ পর্যন্ত ভ্রমণ করেন স্থলপথে। যাকে জীবনের অন্যতম স্মরণীয় সফর হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।
নতুন উদ্যম নিয়ে কাজে ফিরে এসে রোসলি শেষ পর্যন্ত যোগ দেন লন্ডনের একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সিনিয়র ম্যানেজারের পদে। এতে তার বেতন প্রায় ছয় গুণ বেড়ে বছরে ৮৫ হাজার পাউন্ডে বা প্রায় ১ লাখ ১৪ হাজার ২৩৪ ডলার পৌঁছে যায়।
পরে নতুন পেশায় যাওয়ার কয়েকটি চেষ্টা ব্যর্থ হলে আবার বিরতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন রোসলি। এবার স্ত্রীকে নিয়ে চার মাসের জন্য মালয়েশিয়ায় ফিরে যান তিনি। সেখানে অবস্থানকালে পরিচিতদের মাধ্যমে দূরবর্তী ভিত্তিতে আর্থিক প্রকল্পের কাজ পান। পরে লন্ডনে ফিরে ঠিকাদার হিসেবে কাজ শুরু করেন। পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমে ক্যারিয়ার ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিষয়ক কনটেন্ট তৈরি করেন।
রোসলির দাবি, পরিকল্পিত এই বিরতিগুলো তার ক্যারিয়ারকে পিছিয়ে দেয়নি, বরং এগিয়ে নিয়েছে আরও।
তার ভাষ্য, ‘আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায়, এটি ক্যারিয়ারকে ধীর করে না, বরং নতুন গতি দেয়।’
ভবিষ্যতেও প্রতি চার বা পাঁচ বছর পরপর এমন মিনি-রিটায়ারমেন্ট নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তার। এটিকে অবসরের জীবনের একটি আগাম অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখেন তিনি।
বাড়ছে মিনি-রিটায়ারমেন্ট প্রবণতা
২০২৫ সালে প্রকাশিত এইচএসবিসির কোয়ালিটি অব লাইফ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জেনারেশন জেড ও মিলেনিয়াল প্রজন্মের সচ্ছল বিনিয়োগকারীরা অবসরকে আর কর্মজীবনের একেবারে শেষ ধাপ হিসেবে দেখছেন না। অন্তত এক লাখ ডলারের সম্পদের মালিকদের মধ্যে অনেকেই অবসরকে কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে নেওয়া পরিকল্পিত বিরতির ধারাবাহিকতা হিসেবে বিবেচনা করছেন।
লাইফ স্ট্র্যাটেজিজ ফিন্যান্সিয়াল পার্টনার্সের আর্থিক পরিকল্পনাবিদ কেলি রেনারের মতে, পর্যাপ্ত সঞ্চয়, ব্যয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং নমনীয় চাকরি থাকলে এভাবে জীবনযাপনে কোনো সমস্যা নেই।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রয়োজনীয় আর্থিক প্রস্তুতি ছাড়া দীর্ঘ বিরতি নেওয়া বড় ধরনের আর্থিক সংকট ডেকে আনতে পারে। পাশাপাশি কর্মজীবনে দীর্ঘ সময়ের বিরতির সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না থাকলে তা জীবনবৃত্তান্ত বা পেশাগত মূল্যায়নেও ফেলতে পারে নেতিবাচক প্রভাব।
তবে ক্যারিয়ার থেকে সাময়িক বিরতি পিছিয়ে দেওয়া নয়, খুলে দিতে পারে নতুন সম্ভাবনার পথও।
আলি রোসলির ক্ষেত্রে দুটি মিনি-রিটায়ারমেন্টই ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে তার কর্মজীবনে। প্রথম বিরতি মালয়েশিয়া ছেড়ে লন্ডনে নতুন ক্যারিয়ার গড়ার সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে তাকে। দ্বিতীয় বিরতি নিজের ব্যবসা পরিচালনার পথে এগিয়ে দেয় তাকে।
আর্থিক প্রস্তুতিই স্বাধীনভাবে বিরতি নেওয়ার মূল ভিত্তি।
আর্থিক পরিকল্পনাবিদ কেলি রেনারের মতে, যারা নিয়মিত সঞ্চয় করেন, আয়-ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখেন, অবসরভাতার জন্য অর্থ জমা করেন এবং কয়েক মাস কর্মহীন থাকলেও চলার মতো সঞ্চয় গড়ে তুলেছেন, তাদের জন্য কর্মজীবন থেকে সাময়িক বিরতি নেওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক কম।
ব্যয় কমাতে পারলে মিনি-রিটায়ারমেন্ট আরও বাস্তবসম্মত হয়।
দ্বিতীয় বিরতির সময় রোসলি ও তার স্ত্রী লন্ডনের ভাড়া বাসা ছেড়ে দেন এবং নিজেদের জিনিসপত্র সংরক্ষণাগারে রেখে মালয়েশিয়ায় ফিরে যান। সেখানে জীবনযাত্রার খরচ তুলনামূলক কম হওয়ায় দীর্ঘ সময়ের এই বিরতি তাদের জন্য আরও টেকসই ও সাশ্রয়ী হয়ে ওঠে।
সূত্র: রয়টার্স







