ড্রোনে বিশ্বজয়, তবুও নিজ আকাশেই কঠোর নিয়ন্ত্রণ চীনের

মে মাস থেকে সব ড্রোন নিবন্ধন করতে হবে এবং এগুলো অফিশিয়াল আইডি বা সেলফোন নম্বরের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। ছবি: রয়টার্স
বিশ্বের ড্রোন শিল্পে শীর্ষস্থান দখল করে থাকা চীনে এখন ড্রোন উড়ানোই দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। নতুন বিধিনিষেধের মাধ্যমে বিনোদনমূলক ও বেসামরিক ড্রোন উড়ানোর নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে।
জানুয়ারি থেকে অননুমোদিত ড্রোন উড়ানোর জন্য জেলসহ কঠোর শাস্তির বিধান চালু করেছে কর্তৃপক্ষ। আগামী মে থেকে সব ড্রোন মালিকের আসল নামে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ ড্রোনের সঙ্গে তাদের সরকারি পরিচয় বা মোবাইল নম্বর যুক্ত করতে হবে।
নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ড্রোন উড়াতে হলে অন্তত এক দিন আগে অনুমতি নিতে হবে। কিছু উন্মুক্ত এলাকায় ৪০০ ফুটের নিচে উড়ানো ছোট ড্রোনের জন্য ছাড় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেই এলাকা অত্যন্ত সীমিত।
এ ছাড়া ড্রোনের উড্ডয়ন তথ্য সরাসরি সরকারের কাছে পাঠানো হবে।
মার্চ মাসে বেইজিং শহর প্রশাসন আরও এক ধাপ এগিয়ে রাজধানীর ভেতরে প্রায় সম্পূর্ণ ড্রোন নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, মে মাস থেকে ড্রোন বা এর গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ বিক্রি, ভাড়া দেওয়া বা বেইজিংয়ে প্রবেশ করানো যাবে না। অন্য প্রদেশ থেকে রাজধানীতে প্রবেশকারীদের ব্যাগ তল্লাশি করা হবে।
তবে ৩০ এপ্রিলের মধ্যে পুলিশে নিবন্ধন করলে বিদ্যমান ড্রোন মালিকরা কিছুটা ছাড় পাবেন। যদিও একই ঠিকানায় তিনটির বেশি ড্রোন রাখা যাবে না। সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম বা গবেষণার মতো বিশেষ কাজে ড্রোন ব্যবহারে ছাড় দেওয়া হতে পারে।
২০২৪ সাল থেকেই চীন ড্রোন নিবন্ধন বাধ্যতামূলক এবং নির্দিষ্ট এলাকায় উড্ডয়ন সীমিত করেছে। তবে সাম্প্রতিক কড়াকড়ির ফলে অনেক ব্যবহারকারী অভিযোগ করছেন, অতিরিক্ত কঠোর প্রয়োগের কারণে বৈধ ব্যবহারও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ড্রোন ব্যবহারকারীদের জিজ্ঞাসাবাদ, জরিমানা, আটক এবং ড্রোন জব্দের অসংখ্য ঘটনা ছড়িয়ে পড়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে চীনে নিবন্ধিত ড্রোনের সংখ্যা ৩০ লাখ ছাড়িয়েছে। যা ২০২৪ সালের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি।
জননিরাপত্তা মন্ত্রণালয় বলছে, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই কঠোর নিয়ম প্রয়োজন। ড্রোনের তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা হ্যাক হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। পাশাপাশি উচ্চতায় উড়ে বেসামরিক বিমান চলাচলের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে।
মন্ত্রণালয় এক ঘটনা উল্লেখ করে জানায়, একটি ড্রোন বেসামরিক বিমানের ৮০০ মিটারের মধ্যে উড়েছিল। আরেক ঘটনায়, একটি ড্রোন বিমানবন্দরের নো-ফ্লাই জোনে ঢুকে বিমানের অবতরণ দৃশ্য ধারণ করেছিল। গত বছর সাংহাইয়ে দুটি ড্রোন মাঝ আকাশে সংঘর্ষে শাংহাইয়ের একটি আকাশচুম্বী ভবনে আছড়ে পড়ে।
মন্ত্রণালয়ের ভাষায়, ‘আকাশও আইনের ঊর্ধ্বে নয়।’
মন্ত্রণালয় আরও বলছে, এই বিধিনিষেধ চীনের ‘লো-অল্টিটিউড ইকোনমি’ বা নিম্ন-উচ্চতার অর্থনীতির পথ সুগম করবে। খাদ্য সরবরাহ, বিদ্যুৎ লাইনের রক্ষণাবেক্ষণ এবং কৃষিকাজে ড্রোন ব্যবহারের পরিকল্পনা এই খাতে অন্তর্ভুক্ত। সরকারের সর্বশেষ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এসব উদ্যোগ গুরুত্ব পেয়েছে।
হংকং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির লো-অল্টিটিউড ইকোনমি রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক লি মো বলেছেন, অতিথি আসার আগে যেমন ঘর গোছানো হয়, তেমনি বৃহৎ পরিসরে এই খাত চালু করার আগে আকাশসীমা সুশৃঙ্খল করা প্রয়োজন। তবে এই নিষেধাজ্ঞায় অল্প কিছু দিনের জন্য বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীন সম্ভাব্য জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকিও বিবেচনা করছে। ইউক্রেন ও ইরানের যুদ্ধ দেখিয়েছে, সস্তা ড্রোনও কত বড় ক্ষতি করতে পারে।
সিঙ্গাপুরের এস রাজরত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জ্যৈষ্ঠ কর্মকর্তা ড্রু থম্পসন বলেন, ইউক্রেনে ভোক্তা ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি ও হামলার কার্যকারিতা বেইজিংয়ের জন্য নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশ্বের বৃহত্তম ভোক্তা ড্রোন নির্মাতা চীন, এসব সংঘাতে ড্রোন ও উপকরণের প্রধান সরবরাহকারী। বেইজিং বলছে, তারা সামরিক ব্যবহারযোগ্য ড্রোনের রপ্তানি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা বলছেন, চীনা কোম্পানি তাদের সরবরাহ বন্ধ করে রাশিয়াকে দিচ্ছে।
ক্র্যাকডাউন বিস্তৃত হওয়ায় নিউ ইয়র্ক টাইমসের সঙ্গে আলাপ করা এক ডজন ড্রোন ব্যবহারকারী বলেছেন, নিয়মগুলো বৈধ উড্ডয়নকেও বাধাগ্রস্ত করছে। অধিকাংশই পুলিশের হয়রানির ভয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।
শাংহাইয়ের বাসিন্দা ক্যাট ইয়াং জানান, স্কুলপড়ুয়া ছেলের জন্য ড্রোন উড়ানোর প্রাথমিক অনুমতি পেলেও উড্ডয়নের দিন চূড়ান্ত ছাড় পাননি। পুলিশ কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।
উত্তর চীনের আরেক ড্রোন মালিক জানান, তিনি ৩৬টির বেশি আবেদন করলেও মাত্র দুটি অনুমোদিত হয়েছিল। সেগুলোও ৩০ ফুটের নিচে এবং সরাসরি দৃষ্টিসীমার মধ্যে উড়ানোর জন্য। কর্তৃপক্ষ তাকে কাছের একটি সামরিক বিমানবন্দরের সম্মতি নিতে বলে। তিনি ওই বিমানবন্দরে ফোন করলেও কেউ সাড়া দেয়নি।
বেইজিংয়ের দুই বাসিন্দা জানান, নতুন নিয়ম ঘোষণার আগেই ড্রোন চালু করলেই পুলিশের ফোন আসত। আরেকজন জানান, পুলিশ তাদের বাড়িতে এসে বহুদিন ধরে উড়ানো হয়নি এমন ড্রোন সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করে।
এই নিয়ম বাজারে শীতল প্রভাব ফেলেছে। একাধিক ড্রোন বিক্রেতা চীনা গণমাধ্যমকে জানিয়েছে, সাম্প্রতিক মাসে ব্যবসা হু হু করে কমে গেছে। অন্যদিকে ব্যবহৃত ড্রোন বিক্রির অনলাইন বিজ্ঞাপন বেড়েছে।
ড্রোন শিল্পে বৈশ্বিক নেতৃত্ব থাকা সত্ত্বেও চীন আন্তর্জাতিক চাপের মুখেও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে বিদেশি তৈরি ড্রোন নিষিদ্ধ করেছে। যার ফলে নতুন ড্রোন বাজারে প্রবেশে বাধা সৃষ্টি হয়েছে। ডিজেআই ফেব্রুয়ারিতে মামলা করে এই সিদ্ধান্ত বাতিলের আবেদন জানায়।
কিছু বিশেষজ্ঞ এই নীতিতে নমনীয়তার পক্ষে মত দিয়েছেন। চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা শিয়াওপেংয়ের চেয়ারম্যান সম্প্রতি আকাশশূন্য ব্যবস্থাপনার কিছু অংশ কেন্দ্রীয় সরকারের বদলে অঞ্চলগুলোর কাছে হস্তান্তরের প্রস্তাব দেন। যাতে নিম্ন-উচ্চতা অর্থনীতি উদ্দীপ্ত হয়।
স্বতন্ত্র সামরিক ভাষ্যকার সং চুংপিং সরকারের শিথিলীকরণের পক্ষে ভিন্ন যুক্তি দেন। তিনি বলেছেন, ড্রোনের প্রসার ভবিষ্যতের যুদ্ধের জন্য ড্রোন অপারেটরের রিজার্ভ তৈরি করতে সাহায্য করবে। সাধারণ মানুষের ড্রোন ব্যবহারের সুযোগ বাড়ালে ভবিষ্যতে দক্ষ অপারেটর তৈরি করা সহজ হবে।
সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস



