‘চীনা বাধায়’ আফ্রিকা সফর বাতিল তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের

তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে। ছবি: রয়টার্স
চীনের বাধার মুখে একটি আফ্রিকান মিত্র দেশের সফর বাতিল করতে বাধ্য হলেন তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে। আফ্রিকান দেশ ইসোয়াতিনিতে (আগের নাম সোয়াজিল্যান্ড) পূর্বনির্ধারিত সফর ছিল তার।
অন্তত তিনটি দেশ তাদের আকাশপথে লাই চিং-তের বিমানটি প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। যার কারণে তার সফরটি পুরোপুরি বাতিল হয়ে যায়। বুধবার দেশগুলোর প্রশংসা করেছে বেইজিং। এক প্রতিবেদনে এমনটা জানিয়েছে ইনডিপেনডেন্ট।
তাইওয়ানের একমাত্র আফ্রিকান মিত্র ইসোয়াতিনি। যাত্রাপথে মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট লাইয়ের বিমানটির সেশেলস, মরিশাস ও মাদাগাস্কারের আকাশপথ ব্যবহার করার কথা ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এই তিনটি দেশই তাদের ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে তাইওয়ানিজ বিমান ওড়ার অনুমতি প্রত্যাহার করে নেয়। তাইওয়ানের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো রাষ্ট্রপ্রধান এ ধরনের চাপের মুখে তার বিদেশ সফর বাতিল করলেন।
চীনের তাইওয়ানবিষয়ক দপ্তরের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, ‘এক চীন নীতি’ বজায় রাখায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অবস্থান ও পদক্ষেপের প্রশংসা করছে বেইজিং। মুখপাত্র ঝাং হান অবশ্য সেশেলস, মরিশাস ও মাদাগাস্কারের ওপর কোনো ধরনের অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
তবে তাইওয়ান সরকারের দাবি, এর নেপথ্যে বেইজিংয়ের হাত রয়েছে। একজন সরকারি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আসল কারণ ছিল চীনা কর্তৃপক্ষের তীব্র চাপ এবং অর্থনৈতিক জবরদস্তি।
আফ্রিকা জুড়ে শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব আছে চীনের। তারা গণতান্ত্রিকভাবে শাসিত তাইওয়ানকে নিজেদের একটি প্রদেশ মনে করে। তাই দ্বীপটিকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই ইস্যুটিকে সবসময়ই তাদের ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা হিসেবেই বিবেচনা করে বেইজিং।
ইসোয়াতিনি কয়েকটি দেশের মধ্যে একটি, যার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক আছে তাইওয়ানের। মাদাগাস্কারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তার বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, ‘মাদাগাস্কার শুধু একটি চীনকেই চেনে। আমাদের আকাশপথের সার্বভৌমত্বের প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
সেশেলসেরও একই দাবি। তাইওয়ানকে স্বীকৃতি দেয় না বলেই এ সিদ্ধান্ত তাদের।
চীনের এমন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছেন প্রেসিডেন্ট লাই। একে ‘দমনমূলক’ এবং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে অভিহিত করেছেন তিনি। ‘কোনো হুমকি বা দমন-পীড়ন তাইওয়ানকে বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত হওয়া থেকে আটকাতে পারবে না।’
উল্লেখ্য, ইসোয়াতিনির রাজা তৃতীয় মাসওয়াতির সিংহাসন আরোহণের ৪০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা ছিল তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, এই তিন দেশের প্রত্যাখ্যান স্পষ্ট করেছে পৃথিবীতে তথাকথিত ‘রিপাবলিক অব চায়নার’ (তাইওয়ান) প্রেসিডেন্ট বলে কেউ নেই।
ঘটনাটিকে দুর্ভাগ্যজনক বলেছে ইসোয়াতিনি। তবে দেশটি জোর দিয়েছে, এতে তাইওয়ানের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে কোনো পরিবর্তন আসবে না।
সম্প্রতি তাইওয়ানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছু নমনীয় পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে বেইজিং। এরই মধ্যে এমন একটি ঘটনা ঘটল। বেইজিংয়ে সম্প্রতি শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তাইওয়ানের প্রধান বিরোধী দল কুওমিনতাংয়ের নেত্রী চেং লি-উনের বৈঠক হয়। এরপর তাইওয়ান থেকে কিছু খাদ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়।
এর আগে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে তাইওয়ানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে চীনকে স্বীকৃতি দেয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ রাষ্ট্র নাউরু। বেইজিংয়ের কট্টর সমালোচক লাই চিং-তে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জেতার পরপরই এমন সিদ্ধান্ত নেয় নাউরু।
তবে সম্প্রতি হন্ডুরাস, নিকারাগুয়া, কিরিবাতি এবং সলোমন দ্বীপপুঞ্জও তাইওয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। এর জন্য ‘চীনা চাপ’ দায়ী বলে মত বিশ্লেষকদের।
১৯৭৯ সাল থেকে ‘এক চীন নীতি’ মেনে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। তাইওয়ানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা কমিয়ে বেইজিংয়ের সঙ্গে বাড়িয়েছিলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার। কোনো তাইওয়ানিজ নেতার সঙ্গে কথা বলা সর্বশেষ মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার। এরপর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বেইজিংকেই একমাত্র বৈধ চীনা সরকার হিসেবে গ্রহণ করে আসছে ওয়াশিংটন।
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাইওয়ানের একটি কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। দ্বীপটিতে কিছুসংখ্যক মার্কিন সেনাও মোতায়েন আছে। ২০২২ সালে মার্কিন স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির বিতর্কিত তাইওয়ান সফর নিয়েও বেইজিংয়ের সঙ্গে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল ওয়াশিংটনের।



