কেন জাপানের তরুণরা চীনের চেয়ে ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্রকে বেশি ভয় পাচ্ছে?

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স
বিশ্বশান্তির জন্য চীনের চেয়েও যুক্তরাষ্ট্রকে বড় হুমকি হিসেবে দেখছেন জাপানের অনেক তরুণ। তাদের উদ্বেগের কেন্দ্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার খামখেয়ালি আচরণ, যুদ্ধনীতি ও অনিশ্চিত সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা হারাচ্ছেন জাপানিরা।
স্থানীয় সময় গত শনিবার প্রকাশিত জাপান প্রেস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এক নতুন জরিপে এ চিত্র উঠে এসেছে। তবে সামগ্রিকভাবে বিশ্বশান্তির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে চীনকেই মনে করছেন সবচেয়ে বেশি জাপানি।
সংস্থাটির বার্ষিক জরিপে অংশ নেওয়া ২৬ দশমিক ৮ শতাংশ উত্তরদাতা বিশ্বশান্তির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ করেছেন। গত বছরের তুলনায় এ হার বেড়েছে ৯ দশমিক ৩ শতাংশ পয়েন্ট। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রকে সবচেয়ে বড় হুমকি মনে করেছিলেন মাত্র ৬ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতা।
এবারের জরিপে শীর্ষে আছে চীন। ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা দেশটিকে বিশ্বশান্তির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। গত বছরের তুলনায় এ হার বেড়েছে ৮ দশমিক ২ শতাংশ পয়েন্ট।
অন্যদিকে ২০২৫ সালে তালিকার শীর্ষে থাকা রাশিয়া এবার ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থানে নেমে এসেছে। জুলাই ও আগস্ট মাসে ৫ হাজার মানুষের অংশগ্রহণে জরিপটি পরিচালিত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে জাপানিদের মনোভাবের এ পরিবর্তনের পেছনে বড় ভূমিকায় আছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
টোকিওর ইন্টারন্যাশনাল ক্রিশ্চিয়ান ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক স্টিফেন নাগি বলেছেন, ‘এখানে সবকিছুই ট্রাম্পকে ঘিরে, ট্রাম্প, ট্রাম্প আর ট্রাম্প।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘গত দুই বছর ধরে জাপানিরা ট্রাম্পের খামখেয়ালি আচরণ, জ্ঞানের ঘাটতি এবং বিভিন্ন বিষয়ে তার অনাগ্রহ দেখে ক্রমেই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন।’
নাগির মতে, জরিপের ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী কিংবা দেশটির সাধারণ মানুষের প্রতি জাপানিদের মনোভাবের যথাযথ প্রতিফলন নয়। বরং এটি মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রতি তাদের অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ।
তিনি বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রয়োজন ছিল না। এ যুদ্ধ ভালোভাবেও এগোচ্ছে না, বিষয়টি স্পষ্ট। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের প্রতি ট্রাম্পের তোষামোদ এবং চীনের প্রেসিডেন্ট সি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাম্প্রতিক বৈঠক থেকে ইতিবাচক ফল না পাওয়ায় উদ্বিগ্ন জাপানিরা। এসব ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তিতে বড় ধরনের আঘাত হেনেছে।
সাম্প্রতিক জরিপে বিশ্বশান্তির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকির তালিকায় প্রথম পাঁচটি দেশের মধ্যে আছে উত্তর কোরিয়া ও ইরানও। এ ছাড়া উত্তরদাতাদের মতামত নেওয়া হয়েছে ইসরায়েল, ইউক্রেন ও জাপান সম্পর্কেও।
বিশ্বের সাম্প্রতিক সমস্যাগুলোর জন্য প্রধানত ট্রাম্পকে দায়ী করেছেন জরিপে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা। প্রতি ১০ জনের আটজনের বেশি মনে করেন, বিশ্বে ট্রাম্পের প্রভাব নেতিবাচক। বিপরীতে, মাত্র ১৩ দশমিক ২ শতাংশ উত্তরদাতা তাকে ইতিবাচক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে নারীদের মধ্যে উদ্বেগ অনেকটা বেশি। সব বয়সী নারীর ৩২ দশমিক ১ শতাংশ বিশ্বশান্তির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে চিহ্নিত করেছেন। বিপরীতে, ২৬ দশমিক ৭ শতাংশ নারী চীনকে সবচেয়ে বড় হুমকি মনে করেন। ২০ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারী ও পুরুষ উভয় গোষ্ঠীর কাছেই চীনের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্র বড় হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। তবে ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে চীনকে বেশি হুমকি মনে করার প্রবণতা দেখা গেছে।
নাগির ধারণা, বয়স্ক জাপানিদের একাংশের মনে শীতল যুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিজয়ের স্মৃতি এখনো ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
অন্যদিকে তরুণরা ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলা, ইরাক যুদ্ধ, আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং ইউক্রেন নিয়ে ট্রাম্পের পরস্পরবিরোধী অবস্থানের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের সামগ্রিক আচরণও তাদের কাছে অস্বস্তিকর বলে মনে করেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থার সংকট
জাপানের ইয়ামানাশি গাকুইন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক এবং লিঙ্গবৈষম্য বিষয়ক বইয়ের লেখক সুমি কাওয়াকামি বলেছেন, জাপানিরা সামগ্রিকভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ওপর আস্থা হারিয়েছেন।
ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদে বাণিজ্যযুদ্ধ ও সামরিক সংঘাত শুরু করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) এবং এর প্রেসিডেন্ট, জাপানি বিচারক তোমোকো আকানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে এক শীর্ষ সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট সি জিনপিংকে আতিথ্য দেওয়ার সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে চীনকে জাপানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন ট্রাম্প।
কাওয়াকামি বলেছেন, ‘তিনি কখন কোন অবস্থান থেকে সরে এসে উল্টো সিদ্ধান্ত নেবেন, তা কেউ জানেন না।’ ট্রাম্পের এমন অনিশ্চিত আচরণ জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচিকে কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলেছে বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে আইসিসিকে সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তাকাইচি। কাওয়াকামির মতে, এ অবস্থানের প্রতি জাপানের সাধারণ মানুষেরও সমর্থন আছে। তবে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা প্রয়োজন হওয়ায় ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটানোর মতো অবস্থানে যেতে পারছেন না জাপানের প্রধানমন্ত্রী।
কাওয়াকামির ভাষ্য, ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে জাপানের আগের প্রধানমন্ত্রীরাও বাস্তববাদী অবস্থান নিয়েছেন। তবে পূর্বসূরিদের তুলনায় তাকাইচির জন্য এ ভারসাম্য রক্ষা করা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
টোকিওর রক্ষণশীলপন্থী ব্যবসায়ী এবং একসময় ট্রাম্পের কট্টর সমর্থক কেন কাতোও এখন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন। তবে তার মতে, চীন এখনো জাপানের জন্য অনেক বড় ও তাৎক্ষণিক হুমকি।
কাতো বলেছেন, সি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্পের আরও কঠোর অবস্থান নেওয়া উচিত ছিল। ওয়াশিংটনে চীনের প্রেসিডেন্টকে লালগালিচা সংবর্ধনা দিয়ে ট্রাম্প চীনকে ভুল বার্তা দিয়েছেন বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
তবে স্টিফেন নাগির ধারণা, ট্রাম্প হোয়াইট হাউজ ছাড়ার পর নতুন কোনো প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব নিলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি জাপানিদের ইতিবাচক মনোভাব আবারও ফিরে আসতে পারে। তখন দুই দেশের সম্পর্কও স্থিতিশীল হবে বলে তিনি আশা করছেন।
নাগির মতে, জাপান সরকারসহ পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশের সরকারও এমন পরিস্থিতি চায়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। তাদের প্রত্যাশা, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের আচরণ হবে আরও অনুমানযোগ্য ও স্থিতিশীল।
সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট




