দূষণে হাঁসফাঁস পৃথিবীকে বাঁচাচ্ছে ভুটান

হিমালয়ের কোলে একটি ছোট্ট দেশ যেন অন্য এক গল্প লিখছে- রয়টার্স
‘যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো, তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই প্রশ্ন যেন একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবীর দিকেই ছুড়ে দেওয়া। শিল্পায়ন, কয়লা, তেল, গ্যাস আর সীমাহীন ভোগের নেশায় মানুষ প্রতিদিন আরও একটু করে বিষিয়ে তুলছে পৃথিবীর বাতাস। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে কোথাও দাবানল, কোথাও খরা, কোথাও আবার ভয়াবহ বন্যা। পৃথিবী আজ এমন এক অদ্ভুত সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে যেখানে শিল্পায়ন, নগরায়ন এবং জীবাশ্ম জ্বালানির লাগামহীন ব্যবহারে বায়ুমণ্ডলে ক্রমশ বাড়ছে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধির গতি যদি এভাবেই চলতে থাকে, তাহলে আগামী দশকগুলিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আরও ভয়াবহ আকার নেবে।
আর সমগ্র বিশ্ব যখন দূষণের ভারে হাঁসফাঁস করছে, তখন হিমালয়ের কোলে একটি ছোট্ট দেশ যেন অন্য এক গল্প লিখছে। সেই দেশের নাম ভুটান। এমন এক দেশ, যা শুধু নিজের কার্বন নিঃসরণ কমায়নি, বরং বায়ুমণ্ডল থেকে আরও বেশি কার্বন শোষণ করে পৃথিবীকে কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করছে।
দক্ষিণ এশিয়ার এই রাজতান্ত্রিক দেশটিকে বিশ্বের অন্যতম “কার্বন-নেগেটিভ” দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অর্থাৎ দেশটি যতটা কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত করে, তার চেয়ে বেশি কার্বন প্রকৃতির মাধ্যমে শোষণ করে নেয়। জলবায়ু সংকটের যুগে এই তথ্য শুধু বিস্ময়কর নয়, অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণও। ভুটানের সাফল্যের সবচেয়ে বড় কারণ তার বনভূমি। দেশটির সংবিধানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে দেশের অন্তত ৬০ শতাংশ এলাকা বনভূমি হিসেবে সংরক্ষিত রাখতে হবে। বাস্তবে সেই সীমাকেও ছাড়িয়ে গেছে ভুটান। বর্তমানে দেশটির ৭০ শতাংশেরও বেশি এলাকা বনাচ্ছাদিত। এই বিশাল বনভূমি প্রতিনিয়ত বায়ুমণ্ডল থেকে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখছে।
ভুটানের পাহাড়ি অরণ্যে শুধু গাছ নয়, রয়েছে এক সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য। বিরল প্রজাতির তুষারচিতাবাঘ, লাল পান্ডা, কালো-গলার সারস সহ অসংখ্য প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল এই বনাঞ্চল। ফলে পরিবেশ রক্ষা এখানে শুধু কার্বন কমানোর প্রশ্ন নয়, বরং একটি সম্পূর্ণ বাস্তুতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখার প্রচেষ্টা।
তবে শুধুমাত্র বনভূমি থাকলেই কোনও দেশ কার্বন-নেগেটিভ হতে পারে না। প্রয়োজন কম দূষণকারী অর্থনীতি। এই জায়গাতেও ভুটান অন্যদের থেকে আলাদা। দেশটির অধিকাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে। পাহাড়ি নদীর প্রবল স্রোতকে কাজে লাগিয়ে উৎপন্ন এই বিদ্যুৎ শুধু ভুটানের চাহিদা মেটায় না, প্রতিবেশী ভারতেও রপ্তানি করা হয়। ফলে কয়লা বা তেলের ওপর নির্ভরতা তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
কিন্তু ভুটানের গল্প শুধু পরিবেশনীতি বা প্রযুক্তির গল্প নয়। এটি একটি দর্শনের গল্পও। পৃথিবীর প্রায় সব দেশ যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে উন্নয়নের প্রধান সূচক হিসেবে দেখে, সেখানে ভুটান বহু দশক আগে সামনে এনেছিল ‘গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস’ বা জাতীয় সুখের ধারণা। এই দর্শন অনুযায়ী উন্নয়ন মানে শুধু অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নয়; মানুষের মানসিক সুস্থতা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, সামাজিক ভারসাম্য এবং পরিবেশ সংরক্ষণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই চিন্তাধারা ভুটানের নীতিনির্ধারণে গভীর প্রভাব ফেলেছে। ফলে সেখানে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রেও পরিবেশগত প্রভাবকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। বনভূমি ধ্বংস করে দ্রুত শিল্পায়নের পথে হাঁটার বদলে তারা টেকসই উন্নয়নের পথ বেছে নিয়েছে।
পর্যটনের ক্ষেত্রেও ভুটান একই নীতি অনুসরণ করে। বিশ্বের অনেক দেশ পর্যটকের সংখ্যা বাড়িয়ে অর্থনীতি চাঙা করার চেষ্টা করে। কিন্তু ভুটান দীর্ঘদিন ধরে ‘হাই ভ্যালু, লো ভলিউম’ নীতি মেনে চলেছে। অর্থাৎ পর্যটকের সংখ্যা সীমিত রেখে প্রকৃতি ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করার চেষ্টা করা হয়েছে। এতে আয় কিছুটা কম হতে পারে, কিন্তু পরিবেশের ওপর চাপও কম পড়ে।তবে ভুটানের গল্পের সবচেয়ে মর্মান্তিক দিক হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী দেশগুলোর মধ্যে থাকা সত্ত্বেও তারাই এর ক্ষতিকর প্রভাবের মুখোমুখি হচ্ছে। হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত গলছে। গ্লেসিয়ার লেক বা হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদগুলোতে জল বাড়ছে। ফলে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঘটনাও বাড়ছে। বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাওয়ায় কৃষিক্ষেত্রেও প্রভাব পড়ছে।
অর্থাৎ যে দেশ পৃথিবীকে দূষণের হাত থেকে বাঁচাতে নিজের সাধ্যের সবটুকু করছে, সেই দেশকেই অন্যদের তৈরি সংকটের মূল্য দিতে হচ্ছে। জলবায়ু ন্যায়বিচার নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনায় ভুটানকে তাই প্রায়ই উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ভুটান কার্বন ক্রেডিট বাজারেও আগ্রহ দেখিয়েছে। পরিবেশ রক্ষার মাধ্যমে অর্জিত কার্বন সঞ্চয়ের অর্থনৈতিক মূল্যায়ন করে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আয় করার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নকে একই সুতোয় গাঁথার চেষ্টা চলছে।
তবে ভুটানের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়তো কোনও আইন, প্রকল্প বা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নয়। সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি। এমন এক সময়ে, যখন পৃথিবীর বহু দেশ এখনও উন্নয়ন এবং পরিবেশকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে, তখন ভুটান দেখিয়েছে - দুটিকে একসঙ্গে নিয়েও এগোনো সম্ভব।
আজ পৃথিবীর বড় বড় শহর দূষণের ভারে ন্যুব্জ। গ্রীষ্মের তাপমাত্রা ভাঙছে একের পর এক রেকর্ড। জলবায়ু সম্মেলনে নেতারা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, আবার সেই প্রতিশ্রুতির অনেকটাই থেকে যাচ্ছে কাগজে-কলমে। সেই সময়ে ভুটান যেন নীরবে একটি প্রশ্ন ছুড়ে দেয় - উন্নয়নের অর্থ কি কেবল আরও বেশি উৎপাদন, আরও বেশি ভোগ, আরও বেশি দূষণ?
হিমালয়ের কোলে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট দেশটি হয়তো সেই প্রশ্নের উত্তরও দিয়েছে। তাদের অভিজ্ঞতা বলছে, প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে নয়, প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান করেই টেকসই ভবিষ্যৎ গড়া সম্ভব। জলবায়ু সংকটের এই অস্থির সময়ে তাই ভুটান শুধু একটি দেশ নয়, এক টুকরো আশা। এমন এক আশা, যা মনে করিয়ে দেয়- পৃথিবীকে বাঁচানোর লড়াই এখনও শেষ হয়ে যায়নি।




