নারীশিক্ষা বন্ধের মাশুল গুনছে পুরো আফগানিস্তান
- পাঁচ বছরে মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত ২৬ লাখের বেশি মেয়ে
- নিষেধাজ্ঞা না উঠলে ২০৩০ সালের মধ্যে শিক্ষক-স্বাস্থ্যকর্মী সংকট
- ২০৬৬ সাল পর্যন্ত ক্ষতি হতে পারে ৯৬০ কোটি ডলার

মেয়েদের শিক্ষা ও নারীদের কর্মসংস্থানে বিধিনিষেধের কারণে আফগানিস্তানের অর্থনীতি প্রতি বছর অন্তত ৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার উৎপাদন হারাচ্ছে।
শ্রেণিকক্ষের দরজা বন্ধ। কিন্তু তার মূল্য শুধু আফগান মেয়েরাই দিচ্ছে না, মাশুল গুনছে পুরো আফগানিস্তান। তালেবানের ক্ষমতায় ফেরার পাঁচ বছর পর জাতিসংঘের নতুন হিসাব বলছে, মেয়েদের শিক্ষা ও নারীদের কর্মসংস্থানে বিধিনিষেধের কারণে দেশটির অর্থনীতি প্রতি বছর অন্তত ৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার উৎপাদন হারাচ্ছে। আর নারীদের উচ্চশিক্ষার নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘস্থায়ী হলে ২০৬৬ সালের মধ্যে ক্ষতির পরিমাণ ৯৬০ কোটি ডলারে পৌঁছতে পারে, যা আফগানিস্তানের বর্তমান মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের সমান।
তালেবান ২০২১ সালের আগস্টে ক্ষমতায় ফেরার পর মেয়েদের ষষ্ঠ শ্রেণির পর আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় যাওয়ার পথ বন্ধ করে দেয়। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনাও নিষিদ্ধ হয়। ইউনেস্কোর হিসাবে, প্রায় ২৪ লাখ মেয়ে তখন মাধ্যমিক শিক্ষার বাইরে ছিল, এক বছরেই সংখ্যাটি বেড়েছিল দুই লাখ। নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখে পৌঁছতে পারে বলেও সতর্ক করেছিল ইউনেস্কো।
তবে এরপর আরও হালনাগাদ হিসাব দিয়েছে ইউনিসেফ। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যে সংস্থাটি বলেছে, গত পাঁচ বছরে ২৬ লাখের বেশি আফগান মেয়ে মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আফগানিস্তান এখন বিশ্বের একমাত্র দেশ, যেখানে মেয়েদের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা কার্যত বন্ধ।
একসময় ছবিটা ছিল অন্য রকম। ২০০১ সালে আফগানিস্তানে খুব কম মেয়েই স্কুলে যেত। কিন্তু দুই দশকের অগ্রগতির পর ২০২১ সালে প্রায় ১০ লাখ মেয়ে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়ছিল। তালেবানের নতুন নিষেধাজ্ঞায় সেই অর্জনের বড় অংশই এখন উল্টো পথে। নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়, অধিকাংশ চাকরি ও জনজীবনের নানা ক্ষেত্র থেকেও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পার্ক, জিম ও সৌন্দর্যচর্চাকেন্দ্রে প্রবেশেও বিধিনিষেধ রয়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন কর্মকর্তা এই ধারাবাহিক বঞ্চনাকে ‘লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের’ চরম রূপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
কিন্তু এর সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদি আঘাত পড়তে যাচ্ছে কর্মক্ষেত্রে। ইউনিসেফের এপ্রিলের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমান নীতি চললে ২০৩০ সালের মধ্যে আফগানিস্তান হারাতে পারে প্রায় ২০ হাজার নারী শিক্ষক এবং ৫ হাজার ৪০০ নারী স্বাস্থ্যকর্মী। এরই মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষায় নারী শিক্ষকের সংখ্যা ২০২২ সালের প্রায় ৭৩ হাজার থেকে ২০২৪ সালে ৬৬ হাজারে নেমেছে, হ্রাস ৯ শতাংশের বেশি। সরকারি চাকরিতে নারীর অংশও ২০২৩ সালের ২১ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে ১৭.৭ শতাংশে নেমে এসেছে।
এর প্রভাব শুধু চাকরির সংখ্যায় আটকে থাকবে না। আফগান সমাজে বহু নারী ও শিশু পুরুষ চিকিৎসকের কাছে সেবা নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না বা সামাজিক কারণে তা সম্ভব হয় না। ফলে নারী চিকিৎসক, নার্স ও ধাত্রীর সংখ্যা কমলে মাতৃস্বাস্থ্য, নবজাতক ও শিশুস্বাস্থ্য সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একইভাবে নারী শিক্ষক কমে গেলে মেয়েদের প্রাথমিক শিক্ষাও আরও সংকুচিত হতে পারে।
আরও ভয়াবহ দীর্ঘমেয়াদি হিসাব দিয়েছে ইউনেস্কো। ২০২৪ সালে প্রকাশিত সংস্থাটির গবেষণা অনুযায়ী, নারীদের উচ্চশিক্ষা বন্ধ থাকলে আগামী ৩৫ বছরে কর্মজীবন থেকে বিদায় নেওয়া প্রায় ৬ লাখ শিক্ষিত নারীর জায়গা নেওয়ার মতো নতুন নারী পেশাজীবী তৈরি হবে না। ইতিমধ্যে এক লাখের বেশি নারী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরার সুযোগ হারিয়েছেন। শুধু নারী শিক্ষকের ক্ষেত্রেই ২০৩০ সালের মধ্যে অবসরে যাওয়া ১১ হাজারের বেশি শিক্ষকের বিকল্প তৈরি না হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই নিষেধাজ্ঞার অর্থনৈতিক অভিঘাত পরিবারেও পৌঁছবে। শিক্ষা নিয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে পারতেন—এমন লাখো নারী আয় থেকে বঞ্চিত হলে পরিবারের মোট আয় কমবে, বাড়বে আর্থিক নির্ভরতা। ইউনিসেফের হিসাবে, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান থেকে নারীদের দূরে রাখার বর্তমান নীতিই বছরে ৫৩০ কোটি আফগানি বা প্রায় ৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার অর্থনৈতিক উৎপাদন নষ্ট করছে, যা ২০২৩ সালের জিডিপির প্রায় অর্ধ শতাংশ।
শিশুদের উপরও এর প্রভাব প্রজন্ম পেরিয়ে যেতে পারে। ইউনিসেফ বলেছে, শিক্ষাহীন মায়ের সংখ্যা বাড়লে কম ওজন নিয়ে শিশু জন্মানো, প্রয়োজনীয় টিকা না পাওয়া এবং অপুষ্টিজনিত খর্বাকৃতির ঝুঁকিও বাড়ে। একই সঙ্গে স্কুলের বাইরে থাকা মেয়েদের শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, নির্যাতন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ঝুঁকি বেশি।
তালেবান কর্তৃপক্ষ তাদের ইসলামি আইনের ব্যাখ্যার ভিত্তিতে মেয়েদের শিক্ষার বিধিনিষেধকে ন্যায্যতা দিয়ে আসছে। তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে এখন পর্যন্ত শুধু রাশিয়া। অন্যদিকে জাতিসংঘ বারবার নিঃশর্তভাবে মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
পাঁচ বছর পর তাই বন্ধ শ্রেণিকক্ষের হিসাব আর শুধু ২৬ লাখ মেয়ের অপূর্ণ স্বপ্নের নয়। আজ যে মেয়েটিকে বই থেকে দূরে রাখা হচ্ছে, আগামীকাল তার জায়গায় একজন শিক্ষক, চিকিৎসক, নার্স বা দক্ষ কর্মীও হারাচ্ছে আফগানিস্তান। শিক্ষা থেকে নারীদের সরিয়ে দেওয়ার এই নীতি তাই একই সঙ্গে অধিকার, পরিবার এবং দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যতের উপর দীর্ঘ ছায়া ফেলছে।






