আকাশ যখন শেষ ছাদ
- উচ্ছেদের ক্ষত বুকে মরু তাঁবুতে পশ্চিম তীরের ঘরহারা পরিবার

ভিটেমাটি হারিয়ে খাঁ খাঁ মরুভূমিতে পশ্চিম তীরের আইন আল-হিলওয়েহ গ্রামের এই পরিবার। নিজেদের ভেঙে ফেলা বাড়ির পাশে অস্থায়ী এ আশ্রয়ে দিন কাটছে আদেল এবং খেইরিয়েহর -আলজাজিরা
ঘর ছিল, ছিল আদালতের নির্দেশও। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো কিছুই বাঁচাতে পারল না ফিলিস্তিনি দারাঘমেহ পরিবারের মাথার ছাদ। পশ্চিম তীরের আল-হিলওয়া এলাকায় বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর উচ্ছেদের ক্ষত বুকে নিয়েই খোলা আকাশের নিচে ত্রিপল টানিয়ে দিন কাটছে আদেল দারাঘমেহ, তার স্ত্রী খেইরিয়েহ ও তাদের পরিবারের সদস্যদের। বাইরে তাপমাত্রা ছুঁয়েছে ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
জানা যায়, গত ২৮ জুলাই ইসরায়েলি সেনা, বসতি স্থাপনকারী এবং সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের কর্মকর্তারা বুলডোজার নিয়ে আদেলদের বাড়িতে হাজির হন। সেসময় আদেল ওষুধ আনতে বাইরে গিয়েছিলেন। বাড়িতে ছিলেন তার স্ত্রী ও মেয়ে। খেইরিয়েহ তাদের বাড়ি ভাঙার বিরুদ্ধে ইসরায়েলি সুপ্রিম কোর্টের আগের একটি নির্দেশের নথিও দেখান। ওই নির্দেশে মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাদের বাড়ি ভাঙার ওপর স্থগিতাদেশ ছিল বলে পরিবারের দাবি।
কিন্তু সেই কাগজ দেখানোর পরও থামেনি বুলডোজার। খেইরিয়েহর দাবি, তাকে মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যে বাড়ি খালি করতে বলা হয়েছিল। অসুস্থ অবস্থায় আতঙ্কে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। পরে অ্যাম্বুলেন্সে তার জ্ঞান ফেরে। ততক্ষণে বাড়ির সঙ্গে ধ্বংস হয়ে গেছে জামাকাপড়, আসবাব, ওষুধ, সৌর প্যানেলসহ প্রয়োজনীয় প্রায় সবকিছু।
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত আদেল এখন ওষুধ জোগাড় করতেও সমস্যায় পড়েছেন। জল ও বিদ্যুৎহীন অবস্থায় মাটির ওপর পাতলা গদি পেতে রাত কাটছে পরিবারের। মাথার ওপর ছাদ বলতে এখন আছে শুধু খোলা আকাশ। তাদের অভিযোগ, শুধু বাড়িই নয়, তাদের জীবিকাও ক্রমেই কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। কাছের একটি ঝরনার চারপাশে বসতি স্থাপনকারীরা বেড়া দেওয়ায় পশুপালনকারী পরিবারটি আগের মতো পশুদের জন্য সেখান থেকে জলও ব্যবহার করতে পারছে না।
পরিবারটির আইনজীবী তাওফিক জাবারিনের অভিযোগ, আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও একের পর এক বাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। পশ্চিম তীরের এরিয়া সি (Area C)-তে ফিলিস্তিনিদের বসতি নির্মাণের সুযোগ সীমিত করে রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তবে শুধু আদেল দারাঘমেহর বাড়ি ভাঙার ঘটনাই নয়, একই পরিবারের সদস্য হিলাল দারাঘমেহর বাড়িও একইভাবে গত ২ জুলাই ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। তারও আগে আদেলের ভাই কাদরির বাড়ি ২০২৫ সালের আগস্টে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। হিলাল জানিয়েছেন, বসতি স্থাপনকারীরা এর আগে পরিবারের গবাদি পশু চুরি করেছে এবং কর্তৃপক্ষও পশু বাজেয়াপ্ত করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে আরও ৫০টি গবাদি পশু বসতি স্থাপনকারীরা নিয়ে গেছে বলে পরিবারের দাবি।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম যে ঝরনার জল তারা নিজেদের পশু ও পরিবারের জন্য ব্যবহার করে এসেছেন, সেটিও বসতি স্থাপনকারীরা বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেলেছে বলে অভিযোগ। বাড়ি ধ্বংসের পাশাপাশি এই পরিবারকে পুনর্নির্মাণ থেকেও বাধা দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ।
পশ্চিম তীরের এরিয়া সি (Area C), যা ইসরায়েলের সামরিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণাধীন, সেখানে ফিলিস্তিনিদের বৈধভাবে নির্মাণের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত— এমন অভিযোগ করেছেন আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা। তাদের বক্তব্য, এমন একটি পরিকল্পনা ও জোনিং ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে, যেখানে ফিলিস্তিনিদের নির্মাণের অনুমোদন পাওয়া কঠিন। অথচ ইসরায়েলি বসতিগুলো অব্যাহতভাবে সম্প্রসারিত হচ্ছে। ফলে পরিবারটির আশঙ্কা,
আদালতের নির্দেশও যখন কার্যত সুরক্ষা দিতে পারছে না, তখন পরের বাড়ি কার? এই আতঙ্কেই দিন কাটছে তাদের।
রাষ্ট্রসংঘের মানবিকবিষয়ক সমন্বয় দপ্তরের (OCHA) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে পশ্চিম তীরে ৬,২০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩০০০-এর বেশি শিশু। শুধু ২০২৬ সালেই ৯০৭টির বেশি ফিলিস্তিনি বাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
এ ঘটনায় ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ও সেনাবাহিনীর বক্তব্য জানতে চেয়েছিল আলজাজিরা। তবে প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত তাদের কাছ থেকে কোনো জবাব মেলেনি।






