প্রাইভেট-কার ছেড়ে যেভাবে সাইকেলের শহর প্যারিস

ছবিঃ দ্যা গার্ডিয়ান
দশ বছর আগে কোরেন্টিন রুডো যখন প্রথম প্যারিসে আসেন, তখন সাইকেল চালাতে ভয় পেতেন তিনি। একজন আইটি ডেভেলপার হিসেবে এর আগে সব জায়গায়ই সাইকেলে চলাফেরা করতেন রুডো। ফ্রান্সের রেন শহরে একজন শিক্ষার্থী থাকাকালীনও যাতায়াতের মূল সঙ্গী ছিল তার সাইকেলটি।
কিন্তু এই ব্যস্ত রাজধানী প্যারিসে রুডো প্রথম যেদিন পা রাখেন, রাস্তার পরিস্থিতি দেখে প্রাথমিকভাবে ভয় পেয়েছিলেন তিনি। চারদিকে গাড়ির ভিড়। অসংখ্য গাড়ি এদিক-ওদিক থেকে যাতায়াত করছে। সাইকেল আরোহীদের জন্য কোনো সুরক্ষা নেই বললেই চলে।
কিন্তু তার বাসার কাছেই ১১তম অ্যারঁদিসমঁর বুলেভার্ড ভলতেয়ারে যেদিন থেকে আলাদা করে সাইকেলের জন্য নিরাপদ লেন তৈরি করা হলো, সেদিন থেকে রুডো আবার সাইকেলে যাতায়াত শুরু করলেন। এরপর আর কখনো পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।
বর্তমানে তিনি 'প্যারিস এন স্যালে' নামের একটি সাইকেল প্রচারণা সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছেন। একইসঙ্গে বিস্ময়ের সাথে দেখছেন এই শহর কীভাবে ধীরে ধীরে ঝেড়ে ফেলেছে তার গাড়িনির্ভর পুরনো পরিচিতি।
রুডোর ভাষায়, এটা এমন একটি প্রক্রিয়া, যার শুরু হয়েছিল ধীরগতিতে। কিন্তু গত ১০ বছরে তা দ্রুত গতি পেয়েছে। শহরের অন্তত কিছু অংশে আমরা এখন এমন একটি সাইকেল নেটওয়ার্ক পেতে শুরু করেছি, যা নিরাপদ। একইসঙ্গে প্রায় সম্পূর্ণ।
২০১৪ সালে অ্যান হিডালগো যখন প্যারিসের মেয়র হন, তখন থেকেই প্যারিস একটি বৃহৎ রূপান্তরের পথে যাত্রা শুরু করেছে। তার নেতৃত্বে শহরে ১ লাখ ৫৫ হাজার গাছ লাগানো হয়েছে। শত শত কিলোমিটার সাইকেল লেন তৈরি করা হয়েছে। প্রায় ৩০০টি স্কুলসংলগ্ন রাস্তা পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। সেইন নদীর তীর থেকে সম্পূর্ণ ভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে গাড়ি চলাচল।
অনেক পার্কিং স্পটকে রূপান্তর করা হয়েছে সবুজ খোলা জায়গায়। তৈরি করা হয়েছে ক্যাফে-বারের মতো বসার জায়গায়ও। এখন অনেক বাবা-মায়ের আর সেই ভয় নেই যে তাদের সন্তান স্কুলে হাঁটতে গিয়ে গাড়ির নিচে চাপা পড়তে পারে।
১২ বছর মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে, সম্প্রতি, মার্চের ২৯ তারিখ রবিবার হিদালগো পদত্যাগ করেন। শহরকে আরও বাসযোগ্য করে তোলার তার এই লড়াই এখন ইউরোপের প্রগতিশীল শহরগুলোর জন্য একটি উদাহরণ হিসেবে ধরা হচ্ছে। বিশেষকরে এমন এক সময়ে এটি ঘটেছে যখন, অনেক জাতীয় সরকার পরিবেশবান্ধব নীতিগুলো থেকে সরে আসছে।
রুডো জানান, মানুষ যখন আমার কাছে পরামর্শ চায়, আমি তাদের বলি, উচ্চাভিলাষী হতে ভয় পেও না।
তিনি আরও জানান, হিদালগো তার পরিকল্পনার পুরোটা বাস্তবায়ন করতে না পারলেও, সবাই তার কাজে খুশি। সবাই বলছে, দেখো, প্যারিস কত অসাধারণ কাজ করেছে!
তবে সব প্যারিসবাসী যে হিদালগোর পরিকল্পনার বাস্তবায়নকে একই দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেছেন, তা-ও নয়।
রাস্তা নিরাপদ করার এই উদ্যোগে গাড়ির জন্য জায়গা কমে গেছে, ফলে অনেক গাড়িচালকই বিরোধিতা করছেন এই পরিকল্পনার। SUV গাড়ির পার্কিং-ফি বাড়ানো বা স্কুল-সংলগ্ন প্রশস্থ রাস্তা পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত করার মতো বিষয়ে গণভোটও হয়ে গেছে। কিন্তু সেখানে ভোটারের উপস্থিতি ছিল উদ্বেগজনকভাবে কম।
সর্বশেষ পৌর নির্বাচনের আগে, ডানপন্থী দল রিপাবলিকানের মেয়রপ্রার্থী রাশিদা দাতি শহরের জনপরিসরের এই পরিবর্তনকে 'রাস্তার উদ্বেগ সৃষ্টিকারী বিশৃঙ্খলা' বলে সমালোচনা করেন। যদিও নির্ধারিত মূল নীতিগুলো বাতিল করার কথা সরাসরি এখনও বলেননি রাশিদা।
সম্প্রতি দ্যা গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হিদালগো জানান, শহরের নদীর তীরকে পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত করা ছিল একটি কঠিন লড়াই। কিন্তু একবার তা বাস্তবায়িত হওয়ার পর মানুষ আর আগের অবস্থায় ফিরে যেতে চায় না।
তিনি আরও জানান, এখন এমন একটি প্রজন্ম বড় হচ্ছে, যারা কখনো কাউকে সেখানে গাড়ি চালাতে দেখেনি। যখন তাদের বলা হয় যে এখানে একসময় গাড়ি চলাচল করত, তখন তারা বিস্ময় প্রকাশ করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রূপান্তর তুলনামূলকভাবে সহজ হয়েছে কারণ শহরের প্রশাসনিক সীমানা খুবই সংকীর্ণ। ফলে পরিবহন নীতিতে শহরতলির মানুষদের প্রভাব কম। পাশাপাশি আগের মেয়রদের নেওয়া উদ্যোগও এই পরিবর্তনের পথ তৈরি করতে সাহায্য করেছিল।
শুরুতে এমন নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে সাহসের প্রয়োজন ছিল। যেগুলো একদিকে গাড়িচালকদের বড় নেটওয়ার্ককে অসুবিধায় ফেলেছে। কিন্তু অন্যদিকে সামাজিক ও পরিবেশগত সুবিধাও এনে দিয়েছে।
প্যারিসের স্থানীয় বাসিন্দা অড্রে ডি নাজেল, যিনি ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের একজন পরিবেশগত মহামারীবিদও, তার মতে, এখনও আরও অনেক কিছু করার বাকি আছে, তবে এ পর্যন্ত যা হয়েছে তা “অসাধারণ”। তিনি স্মরণ করেন এমন এক সময়, যখন প্যারিসে সাইকেল চালানো এতটাই বিরল ছিল যে, রাস্তায় আরেকজন সাইকেল আরোহী দেখলে থেমে একসাথে কফি খাওয়ার সুযোগ হতো।
তার ভাষ্য, “প্যারিসের তুলনায় বিশ্বের বাকি জায়গাগুলোতে যা অনুপস্থিত আছে, তা হলো সাহস। মেয়ররা চাইলেই বলতে পারতেন, একটি স্থায়ী পরিবর্তন রেখে যাওয়ার মতো এটাই সুযোগ। কিন্তু বেশিরভাগ মেয়রই সেই ঝুঁকি নিতে চান না।'
গত মাসের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্যারিস, বিশ্বের ১৯টি শহরের একটি, যারা ২০১০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বায়ুদূষক উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পেরেছে। তবে এই তালিকায় আরও কিছু ইউরোপীয় শহরও রয়েছে।
ব্রাসেলস ও ওয়ারশের মতো জায়গায় একই সময়ে দূষণ আরও দ্রুত কমেছে। আর নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ দ্রুত কমেছে লন্ডনে।
অন্যদিকে, বার্লিনে গত বছর শহরের ভেতরে একটি নতুন মোটরওয়ে চালু করা হয়েছে। ২৩টি প্রধান সড়কে ৩০ কিমি/ঘণ্টার পূর্ব নির্ধারিত যে গতিসীমা সেটি তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবুও সেখানে প্যারিসের তুলনায় সাইকেল আরোহীর হার বেশি।
ডর্টমুন্ডের টেকনিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন পরিবহন গবেষক গিউলিও মাত্তিওলির মতে, প্যারিস আসলে অন্য শহরগুলোর তুলনায় ব্যতিক্রম নয়, বরং তারা পিছিয়ে থাকা অবস্থা থেকে বর্তমানে অনেকটা এগিয়ে এসেছে। এই পরিস্থিতি আগেই তৈরি ছিল।
পরে কিছু সাইকেল লেন বানানোতে মানুষ তা দ্রুতই ব্যবহার করতে শুরু করেছে।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় ইউরোপের বিভিন্ন শহরে সাইকেল ব্যবহার এবং সাইকেলবান্ধব অবকাঠামোর বড় ধরনের উত্থান ঘটে। কিন্তু পরবর্তীতে কিছু ষড়যন্ত্র তত্ত্বের উত্থানের কারণে এই অগ্রগতিতে বাধা আসে।
বিশ্লেষক টেরা নোভায়ের মতে, পুরাতন নীতিমালা বুলেভার্ড পেরিফেরিক পরিবর্তন করে নতুন নীতিমালা সংযোজন করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছিল। আর ঠিক এই পরিবর্তনটাই করেছেন সাবেক ডেপুটি মেয়র জিন-লুই মিসিকা ।
তিনি লিখেছেন, “যতদিন এই ৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ মোটরওয়ে প্যারিসকে ঘিরে রাখবে, ততদিন ‘গ্রেটার প্যারিস’ কেবল কল্পনাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে। বাস্তব নগর হিসেবে কোনো অস্তিত্বই থাকবে না এই গ্রেটার প্যারিসের।
কারণ বাসিন্দাদের মধ্যে দেয়াল তুলে কখনই একটি মহানগর গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখা যায় না।”
দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনুদিত



