সীমাবদ্ধতার মধ্যেও স্বপ্ন দেখেন রাকিবরা

‘যদি আমি পেরে থাকি, তবে যে কেউ পারবে’— কথাটি ভারতের কিংবদন্তিতুল্য বক্সার মেরি কমের। হাজারো বাধার পাহাড় ডিঙিয়ে মেরি ২০১২ লন্ডন অলিম্পিকে ভারতকে এনে দিয়েছিলেন ব্রোঞ্জপদক। এশিয়ান গেমস ও কমনওয়েলথ গেমসেও হেসেছেন সোনার হাসি। মেরি কমে অনুপ্রাণিত হয়ে আরও অনেকেই এসেছেন বক্সিং রিংয়ে, ভারতকে এনে দিয়েছেন সাফল্য।
ভারতের একজন মেরি কম ছিলেন। আর বাংলাদেশের?
মেরি কমের মতো তুঙ্গস্পর্শী বক্সারের দেখা মেলেনি কখনোই। তবে একজন ছিলেন— মোশাররফ হোসেন। ১৯৮৫ এশিয়ান গেমসে ব্রোঞ্জ জিতে চমকে দেওয়া মানুষটি হতে পারতেন মেরি কমের মতোই সফল একজন। রূঢ় বাস্তবতা আর কর্মকর্তাদের অবহেলায় মোশাররফ আর এগোতে পারেননি। বাংলাদেশও আরেকজন মোশাররফের খোঁজ পায়নি। আব্দুর রহিম ও জুয়েল আহমেদ জনিরা ২০১০ ঢাকা সাউথ এশিয়ান গেমসে সোনা জয়ের পরই হারিয়ে গেছেন।
সুযোগ-সুবিধা, উন্নত প্রশিক্ষণের অভাব, নিয়মিত আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে যেতে না পারা, মোটাদাগে আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি ঘটাতে না পারা এ দেশের বক্সারদের বড় প্রতিবন্ধকতা। দক্ষিণ এশিয়ায় তাই খাবি খেতে হয়। এশিয়ান গেমস, কমনওয়েলথ গেমসে পদক তো অনেক দূর কল্পনা।
তারপরও ২০২২ এশিয়ান গেমসে খুব কাছে পৌঁছেও পারেননি সেলিম হোসেন, কোয়ার্টার ফাইনালে বিদায় নিয়েছিলেন। সম্প্রতি স্কটল্যান্ডে কমনওয়েলথ গেমসেও কোয়ার্টার ফাইনালে থামতে হয় রাকিব হোসেনকে।
মোহাম্মদ আলীর নামে পল্টনে নির্মিত বক্সিং স্টেডিয়ামই এ দেশের বক্সিংয়ের তীর্থকেন্দ্র। এর বাইরে রাজশাহী, যশোর, দিনাজপুরে ব্যক্তি উদ্যোগে আছে কিছু বক্সিং ক্লাব। আর ছোট্ট পরিসরে প্রতিভাবান বক্সার খোঁজার কাজ করে বিকেএসপি। ২০১০ এসএ গেমসে স্বর্ণপদক জয়ী জুয়েল আহমেদ ১৯৯৫ সালে বক্সিং ক্যারিয়ার শুরু করে এখনো খেলছেন এবং সেরাও হচ্ছেন। তার অর্থ, ৮০ কেজিতে তার প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার মতো কেউ নেই। রাজশাহী থেকে ফোনে এ বক্সারের কথাগুলো হাহাকারের মতো শোনাল— ‘আনসারের চাকরিটা আছে বলে রক্ষা। যদিও সেখানে আয়-উন্নতি হয়নি। সিপাহি পদে যোগ দিয়েছিলাম, এখনো সে পদেই আছি।’
জুয়েলের আপন ভাগ্নে উৎসব আহমেদ এখন আছেন এশিয়ান গেমসের ক্যাম্পে। ৫৫ কেজিতে দেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন এশিয়ান গেমসে, ‘প্রায় তিন মাস ধরে স্থানীয় কোচদের অধীনে প্রস্তুতি নিচ্ছি। এশিয়াডে পদক জেতা সহজ নয়। তারপরও চেষ্টা তো করবই।’ গত বছর ভুটানে ফোর নেশন কাপে স্বর্ণপদক জেতা উৎসব চলতি বছর একটিও আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে খেলার সুযোগ পাননি।
ফেডারেশন কর্তাদের এসব নিয়ে হেলদোল নেই। কর্তারা ব্যস্ত পদ ধরে রাখতে। পরপর দুটি অ্যাডহক কমিটির সাধারণ সম্পাদক পদে টিকে যাওয়া এমএ কুদ্দুস খান অবশ্য দিচ্ছেন উজ্জ্বল আগামীর প্রতিশ্রুতি— ‘মাঝখানে অযোগ্যরা খেলাটিকে ধ্বংসের কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছিল। আমি ফিরে চেষ্টা করছি। আশা করি সামনে ভালো কিছু হবে।’
সেই ভালোর কোনো ইঙ্গিত অবশ্য মিলছে না। বক্সার হতে প্রয়োজন যথেষ্ট শারীরিক সামর্থ্যের। সেটি বাড়াতে স্বাস্থ্যকর খাবারের পাশাপাশি প্রয়োজন অনেক ধরনের সাপ্লিমেন্ট। অথচ ফেডারেশন কখনোই সেই দায়িত্ব নেয় না। ক্যাম্পে থাকা বক্সাররা দৈনিক ভাতা পান ৪০০ টাকা, মাসে অঙ্কটা দাঁড়ায় ১২ হাজার। এর সিংহভাগ দিয়ে সাপ্লিমেন্ট কিনে খেতে হয় তাদের।
এত অপ্রাপ্তির পরও অতীতের মোশাররফ, জুয়েল, রহিম; হালের সেলিম, রাকিব, উৎসবরা যতটুকু এগিয়েছেন, সেটি শুধুই ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় এবং খেলাটির প্রতি দুর্নিবার ভালোবাসায়।




