এক দর্শন দুই দল এক ট্রফি
শেষটা রাঙাতে সঙ্গীরাও তৈরি

লিওনেল মেসি
লিওনেল মেসি একটু ‘হ্যাঁ’ বললেই হয়ে যেত। তাকে দেখা যেত স্পেনের জার্সিতে আর আর্জেন্টিনার ফুটবলেও যোগ হতো না এত শিরোপার সুরভি।
বার্সেলোনার একাডেমিতে থাকাকালে সেই চেষ্টা হয়েছিল! পরিকল্পনা করে, এমনকি দলবেঁধে চেষ্টা করা হয়েছিল মেসিকে পটানোর। পালের গোদা ছিলেন গিনেস মেলেন্দেস। তাকে বলা হয় স্পেনের যুব ফুটবলে সবচেয়ে সফল সমন্বয়কারীদের একজন। স্পেনের আগেকার সোনালি প্রজন্মের অনেকেই তার হাত ধরে উঠে এসেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা সত্যিই চেষ্টা করেছিলাম মেসিকে স্পেনের হয়ে খেলাতে। আমার বন্ধু আলেক্স গার্সিয়া ছিলেন বার্সায় মেসির কোচ। সে আমাকে বলত, যেভাবেই হোক, আর্জেন্টাইন ছেলেটিকে স্পেনের হয়ে খেলতে রাজি করাতে হবে।’
এই দলে ছিলেন জেরার্ড পিকে ও সেস ফেব্রেগাসরা, সবাই তখন স্পেন যুব দলে খেলছেন। ক্লাব ট্রেনিংয়ে মেসির অবিশ্বাস্য খেলা দেখে তারাও করেছিলেন চাপাচাপি। আবার মেলেন্দেসও সতর্ক করেছিলেন যেন আর্জেন্টাইন কিশোরের ভালো খেলার খবরটি পাঁচ কান না হয়। কিন্তু ফুলের সুরভি কি আটকে থাকে? খবর ঠিকই আর্জেন্টিনার কোচদের কানে পৌঁছে যায়। এরপর লিওনেল মেসি হয়ে গেলেন আকাশির জার্সির একজন। তারপর সময় তাকে বানিয়ে দিয়েছে আকাশির সেরা জাদুকর। ভাগ্য বিধাতা।
তাই হয়তো স্পেনের বিশ্বকাপজয়ী কোচ ভিসেন্তে দেল বস্ক আফসোস করে গিনেস মেলেন্দেসকে বলেছিলেন, ‘তুমি যদি মেসিকে স্পেনের হয়ে খেলাতে পারতে, আমরা আরও দু-তিনটি বিশ্বকাপ জিততাম।’ কথা সত্য। মেসি থাকলে ২০১০ সালে প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের পর হয়তো স্পেনকে এত অপেক্ষা করতে হতো না। এখন সেই মেসিতেই হয়েছে উল্টো শঙ্কা। ১৬ বছর পর তারা যখন দ্বিতীয় শিরোপার মঞ্চে তখন চোখ রাঙাচ্ছেন ওই লিওনেল মেসিই। যিনি কি না রবিবার রাতের ফাইনালে স্পেনের হয়েও খেলতে পারতেন!
লা ফুয়েন্তের স্পেনে যেন আধুনিক ফুটবলের এক নিখুঁত ক্যানভাস। তাদের প্রতিটি পাসে আছে ছন্দ, প্রেসিংয়ে শৃঙ্খলা এবং আক্রমণে ফুটে ওঠে অসাধারণ দলগত সমন্বয়। এ সামষ্টিক শক্তিতেই তারা উড়িয়ে দিয়েছে ফ্রান্সের মতো তারকাখচিত দলকে। ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের চেয়ে দলগত ফুটবলকে তারা নিয়ে গেছে শিল্পের উচ্চতায়। এই পরিপূর্ণতার মাঝেও একটি নাম নিঃশব্দে অস্বস্তি ছড়ায়— লিওনেল মেসি। এই এক জাদুকরের ছোঁয়ায় কৌশল, পরিকল্পনা, পরিসংখ্যান— সবই মুহূর্তেই অর্থহীন হয়ে যেতে পারে। মেসি যদি জাগেন, তার বাঁ পাটা যদি কবিতার মতো কথা বলতে শুরু করে তাহলে প্রতিপক্ষের সব পরিকল্পনাই ধুলোয় মিশে যেতে পারে।
আপনি বলতে পারেন, আজকের আর্জেন্টিনা শুধু লিওনেল মেসির ভরসায় চলে না। লাউতারো মার্তিনেস, এনসো ফের্নান্দেস, হুলিয়ান আলভারেস— প্রত্যেকেই অসাধারণ ছন্দে আছেন। তাদের গোল, দৌড় আর শেষ পর্যন্ত লড়াইয়ে ম্যাচের মোড় ঘুরছে। এ নিয়ে দ্বিমতের কোনো সুযোগ নেই। বরং এই আর্জেন্টিনা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও পরিণত, ক্ষুধার্ত ও দুর্ধর্ষ। কিন্তু দলটির হৃৎস্পন্দন এখনো মেসিই। আলভারেস, এনসোরা মাঠে বল নিয়ে এখনো খোঁজেন জাদুকরকেই। তাকে বাদ দিয়ে যেন পুরো আর্জেন্টিনাকে কল্পনা করা যায় না। আক্রমণের কল্পনা, মাঝমাঠের সংযোগ, সতীর্থদের আত্মবিশ্বাস সবকিছুর কেন্দ্রেই আছেন ৩৯ বছর বয়সী মহাতারকা।
এই অবিশ্বাস্য প্রতিভাই পারে লা ফুয়েন্তের পূর্ণাঙ্গ দর্শনকে হার মানাতে।




