শুধুই একটি ফুটবল ম্যাচ নয়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে পেয়ে আর্জেন্টাইন কোচ লিওনেল স্কালোনি বলেছিলেন, ‘এটি শুধুই একটি ফুটবল ম্যাচ।’ একইভাবে ৪০ বছর আগে ১৯৮৬ বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালের আগে কার্লোস বিলার্দো বারবার বলেছিলেন, ‘এটি শুধুই ফুটবল ম্যাচ’। তবে হোর্হে ভালদানো বলেছিলেন, ‘এটি বোকাদের বিভ্রান্ত হওয়ার জন্য আদর্শ ম্যাচ।’
বৈরী ইতিহাস, ফকল্যান্ড যুদ্ধ, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক আর ফুটবলীয় উত্তেজনায় স্পষ্ট যে, আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ডের লড়াই শুধুই একটি ফুটবল ম্যাচ নয়। এ কারণেই হয়তো সেমিফাইনালে পৌঁছে খোদ আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়রা গান ধরেছিলেন ‘ফকল্যান্ডের জন্য’। দর্শকরা তো শুরু থেকেই গাইছেন ‘যারা লাফায় না তারা ইংলিশ’— এই গান।
১৮৬৩ সালে ইংল্যান্ডে আধুনিক ফুটবলের জন্ম হয়। এর ঠিক চার বছর পর বুয়েনস এইরেসে ব্রিটিশ কমিউনিটির মাধ্যমেই আসে খেলাটি। শুরুটা ব্রিটিশদের হাত ধরে হলেও বিকাশ ঘটেছিল স্থানীয়দের মাধ্যমে। তবে ফুটবলের সেই অদৃশ্য সুতো কখনোই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইস্যু থেকে আলাদা ছিল না। আশির দশকে ফকল্যান্ড যুদ্ধের পর সেটি পেয়েছে ভিন্ন মাত্রা।
সেই বৈরিতা নিয়েই আজ ফাইনালে পৌঁছানোর অভিযানে মুখোমুখি আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। দুটি দলের খেলার ধরন দুই ঘরানার। ইংল্যান্ড প্রিমিয়ার লিগের মতোই গতিনির্ভর। আর আর্জেন্টিনা এবারের বিশ্বকাপ খেলছে ম্যাচের গতি কমিয়ে। প্রতিপক্ষের দুর্বলতাগুলো কাজে লাগিয়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের ডিএনএ ধারণ করেই তারা সেমিফাইনালে।
দল দুটির মিল হচ্ছে শতভাগ দাপটে খেলতে না পারলেও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হাল না ছাড়া। প্রচণ্ড চাপের মধ্যেও নিজেদের চরিত্র ও মানসিক শক্তি দেখিয়েছে দুই দল। কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও জিতেছে ইংল্যান্ড। আর শেষ ষোলোয় মিসরের সঙ্গে ২ গোলে পিছিয়েও ফিরে আসার মহাকাব্য লিখেছিল আর্জেন্টিনা। এমনকি কেপ ভার্দে, সুইজারল্যান্ডও ভুগিয়েছে তাদের।
টমাস টুখেলের দল অবশ্য ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের জন্য বল পজেশনে আধিপত্য দেখায় না। বরং বেশি গুরুত্ব দেয় দ্রুত গোল করার অবস্থানে পৌঁছানোকে। মেক্সিকোর বিপক্ষে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ বলের দখল েরখেও আজতেকার উচ্চতা জয় করেছিল তারা। তাদের ফরমেশন ৪-২-৩-১ দিয়ে শুরু হলেও জুড বেলিংহাম ও হ্যারি কেইনের মুভমেন্টের ওপর খেলার ধরন বদলাতে থাকে।
বেলিংহাম এখন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার থেকে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেওয়া খেলোয়াড় হয়ে উঠেছেন। কেইনের তৈরি করা ফাঁকা জায়গাগুলো ব্যবহার করছেন দারুণ দক্ষতায়। আর কেইন শুধু গোল করা নয়, মাঝমাঠের খেলোয়াড়দের সঙ্গে সংযোগ বাড়িয়ে মাঝের পথ ফাঁকা করে দিতে আরও বেশি নিচে নেমে আসছেন। তাতে দৌড়ানোর জায়গা পেয়ে যাচ্ছেন বেলিংহাম, সাকারা।
সেট পিস থেকেও তারা বিপজ্জনক। এ ছাড়া ইংল্যান্ডের উইং বড় চ্যালেঞ্জ হবে আর্জেন্টিনার জন্য। বুকায়ো সাকার ওয়ান-টু-ওয়ানে ডিফেন্স ভেঙে ফেলার ক্ষমতা আছে। অ্যান্থনি গর্ডনও ভালো জানেন কখন গতি বাড়াতে হবে আর কখন পাস দিতে হবে। আর্জেন্টিনার নড়বড়ে ডান দিকটা টার্গেট করতে পারেন কোচ টমাস টুখেল। এটাই বড় দুশ্চিন্তার হতে পারে লিওনেল স্কালোনির জন্য।
ইংল্যান্ডের বড় দুর্বলতা হচ্ছে রক্ষণভাগ গুছিয়ে নিতে সময় লাগা। প্রতিপক্ষ শুরু থেকেই তীব্র গতিতে খেললে তারা বেশ ভুগেছে। আর্জেন্টিনা তাই চাইবে সুইজারল্যান্ড ম্যাচের মতো শুরুতে গোল আদায় করে ইংল্যান্ডকে চাপে রাখতে। ইংল্যান্ড যখন অনেক খেলোয়াড়কে আক্রমণের সামনে রেখে বলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, তখন ডিফেন্ডারদের কভার সময়মতো হয় না। সেন্ট্রাল ডিফেন্ডাররা বিশাল এলাকা একা ডিফেন্ড করতে বাধ্য হন। এটাই কাজে লাগাতে চাইবেন লিওনেল মেসি, হুলিয়ান আলভারেসরা।
এই বিশ্বকাপে ৮ গোল আর ২ অ্যাসিস্ট করা মেসিকে বোতলবন্দি করতে নানা পরিকল্পনাই হয়তো আঁটবেন টুখেল। কিন্তু জাদুকরকে তো আর খাঁচায় আটকানো সম্ভব না, পারেনি অন্য দলগুলোও। মেসিও চাইবেন ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ডিয়েগো ম্যারাডোনার ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’র মতো বিশেষ কিছু করে সেমিফাইনালের ভাগ্য বদলে দিতে। উত্তেজনার ম্যাচটা উপভোগ্য হতে যাচ্ছে নিশ্চিতভাবে।





