বিশ্বকাপ
পাহাড়ি গ্রামে ইরাক, বোর্ডিং স্কুলে স্পেন, তামাকের গুদামে জার্মানি

ব্যায়লর স্কুলের ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের অটোগ্রাফ দিচ্ছেন লামিনে ইয়ামাল।
যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যের সিগনাল ও লুকআউট পর্বতের পাদদেশে আট বছর বয়সী ছোট্ট বেকহ্যাম টানা তিন ঘণ্টা ধরে রেলিংয়ের ওপর দাঁড়িয়ে ছটফট করছিল। তার হাতে একটি চিঠি, যাতে লেখা, ‘আমি তোমাদের খুব ভালোবাসি এবং অনুসরণ করি। আমার শহরে আসার জন্য ধন্যবাদ। আশা করি তোমরাই বিশ্বকাপ জিতবে।’ চিঠিটি স্পেনের দুই তারকা পেদ্রি ও লামিন ইয়ামালের উদ্দেশ্যে লেখা।
যখন স্পেনের খেলোয়াড়রা ব্যায়লর স্কুলের মাঠে এসে নামলেন, বেকহ্যামের চোখ জোড়া বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল। পাশে থাকা বাবার হাত টেনে সে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘বাবা, ওরা তো সত্যি সত্যিই এসেছে!’ তেনেসির নদীর পাড়ে অবস্থিত সেই নামীদামি বোর্ডিং স্কুলেই ঘাঁটি গেড়েছে বিশ্বকাপের অন্যতম ফেবারিট স্পেন। তাই বেকহ্যামদের মতো শিশুদের কাছে আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো ব্যাপার!
যুক্তরাষ্ট্র যখন ৩২ বছর পর আবারও একক বা যৌথভাবে ফুটবলের এই মহাযজ্ঞের আয়োজন করছে, তখন তেনেসির চাটানুগা শহরের মতো বেশ কয়েকটি ছোট ও শান্ত শহর মেতে উঠেছে বিশ্বকাপের বেইস ক্যাম্পের আমেজে। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাক দল ক্যাম্প করছে ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার মাত্র ৩ হাজার মানুষের এক পাহাড়ি গ্রামে। এছাড়া জার্মানি ঘাঁটি গেড়েছে নর্থ ক্যারোলিনার উইনস্টন-সেলেমে, যেখানে তামাকের গুদাম আর পাথরে বাঁধানো রাস্তাগুলো এখন ছেয়ে গেছে জার্মান পতাকায়।
স্পেন দলকে স্বাগত জানাতে চাটানুগা শহরের লুকআউট পর্বতের ভেতরের একটি ১৪৪ ফুট ভূগর্ভস্থ জলপ্রপাতে অনিন্দ্য সুন্দর লাইটিং করা হয়েছে। স্পেন দল যে ‘এম্বাসি সুইটস’ হোটেলে অবস্থান করছে, সেখানে উড়ছে তাদের ঐতিহ্যবাহী লাল-হলুদ ‘লা রখিউয়ালদা’ পতাকা। বিমানবন্দরের বাইরে বড় বড় ব্যানারে লেখা ‘চাটানুগায় স্বাগতম’। স্থানীয় বাসিন্দা স্কিপ শোয়ার্টজ বলেন, ‘রাস্তায় এত মানুষ স্পেনের জার্সি পরে ঘুরছে যে, কে স্পেন থেকে এসেছেন আর কে স্থানীয় মানুষ, চেনা দায়!’
স্পেন দলের অনুশীলন দেখার জন্য ব্যায়লর স্কুলের ১ হাজার টাকার টিকিটের লটারিতে নাম লিখিয়েছিলেন প্রায় ২৫ হাজার মানুষ! অন্যদিকে নর্থ ক্যারোলিনায় জার্মানি দলের অনুশীলন দেখার টিকিট মাত্র চার মিনিটে বিক্রি হয়ে গেছে। স্থানীয় একজন রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার সাভানা লাহি বলেন, ‘মানুষের এই উন্মাদনা দেখা সত্যিই দারুণ। আমরা জার্মান দর্শকদের জন্য বিশেষ খাবারের মেনুও তৈরি করেছি। সবাইকে ঘরের বাইরে আরেকটা ঘর উপহার দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।’
ফিফা অনুমোদিত তালিকা থেকে র্যাংকিংয়ের ওপর ভিত্তি করে দলগুলো তাদের বেইস ক্যাম্প বেছে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। শিকাগো বা লস অ্যাঞ্জেলেসের মতো বড় শহর ছেড়ে স্পেনের ফুটবল ফেডারেশন বেছে নেয় চাটানুগার এই ব্যায়লর স্কুলকে। ৬০০ একরের এই চত্বরে রয়েছে চমৎকার তিনটি ঘাসের মাঠ, অত্যাধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং ইনডোর মিডিয়া সেন্টার। স্পেনের খেলোয়াড়দের জন্য মাঠ নিখুঁত রাখতে বসন্তকালে এই স্কুলের শিক্ষার্থীরা কৃত্রিম ঘাসে (টার্ফ) অনুশীলন করেছে, যাতে মূল মাঠ নষ্ট না হয়।
ব্যায়লর স্কুলের ট্রাস্টি
বোর্ডের সদস্য শোয়ার্টজ আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘আশির দশকে
যখন আমি এই স্কুলে ফুটবল খেলতাম, আমরা বন্ধুরা মিলে মাঠে বারমুডা ঘাস লাগিয়েছিলাম।
আজ যদি কেউ আমাকে বলত যে ৪০ বছর পর এই মাঠে স্পেনের মতো বিশ্বসেরা দল বিশ্বকাপের প্রস্তুতি
নেবে, আমি তা বিশ্বাসই করতে পারতাম না।’
ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত আমেরিকান নাগরিক টিনা আনকার স্পেনের খোলা অনুশীলন দেখে গ্যালারিতে গলা ফাটিয়েছেন ‘ভামোস এস্পানিয়া’ (এগিয়ে যাও স্পেন) বলে। তিনি রসিকতা করে বলেন, ‘এবার আমেরিকার পাশাপাশি টুর্নামেন্টের শেষ পর্যন্ত সমর্থন করার মতো অন্তত একটা দল আমরা পেয়ে গেলাম।’
নিজেদের প্রিয় তারকাদের লকার রুমের সামনে দাঁড়িয়ে ব্যায়লর স্কুলের শিক্ষার্থীদের ছবি তোলার ধুম আর স্থানীয়দের উন্মাদনা প্রমাণ করছে, বিশ্বকাপের ম্যাচ যেখানেই হোক না কেন, উৎসবের আসল রং ছড়িয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এই নিভৃত শহরগুলোর বেইস ক্যাম্পেই।







