ঈশ্বরের হাত বেকহামের লাল কার্ড, আজ কী...

লিওনেল মেসি। গ্রাফিকস: আগামীর সময়
চোখ আটকে গেল একটা খবরে। লিওনেল মেসি এ বিশ্বকাপে ৪৭ শতাংশ সময় হেঁটে ফুটবল খেলেছেন। এটা বিস্ময়কর তথ্য! বিশ্বকাপের মতো কঠিন মঞ্চে কেউ যদি এত অল্প দৌড়ে ৮ গোল করে শীর্ষে থাকতে পারে, তাহলে পুরো সময় দৌড়ে খেলার দরকার কী! এই আর্জেন্টাইন মহাতারকা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে বদলে ফেলেছেন। তিনি বলের জন্য অপেক্ষা করেন। হাঁটেন। দেখেন। এরপর একমুহূর্তে বদলে দেন ম্যাচের গতিপথ। যেন দাবার বোর্ডে শেষ চালটা তিনিই দেন। সেটা সবাই জানে। ইংল্যান্ডও জানে, তাই মেসিকে ‘ঘুম’ পাড়িয়ে রাখার কথা বলেছেন ইয়ান রাইট। অর্থাৎ তার কাছে বলের সাপ্লাই-চেইনটা ভেঙে দেওয়ার কৌশল করবে ইংল্যান্ড। এ ম্যাচটা কোনো কৌশলে চলে না। অনেকখানি চলে আবেগে। কারণ আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড সেই কয়েকটি বিরল দ্বৈরথের একটি। যেখানে মাঠে ৯০ মিনিটের সঙ্গে থাকে যুদ্ধের স্মৃতি, রাজনীতির ছায়া, প্রতিশোধের আবেগ আর কিংবদন্তিদের উত্তরাধিকার।
সেসব সামনে চলে এসেছে সেমিফাইনাল লাইনআপ চূড়ান্ত হওয়ার পর থেকেই। গ্যালারিতে আর্জেন্টিনা ও ইংলিশ সমর্থকের হাতাহাতির দৃশ্য ভাইরাল হয়েছে। তাদের সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে আটলান্টা পুলিশ। শুধু সমর্থকরা কেন, এ ম্যাচের আগে আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাবলো কুইর্নো কলাম লিখে বসেছেন ‘মালভিনাস’ নিয়ে। মালভিনাস মানে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ, যা এখন ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও আর্জেন্টাইন মন্ত্রী তার দাবি ছাড়ছেন না, ‘আমাদের এই দাবি কখনো পরিত্যাগ করা হবে না।’
একটা ম্যাচ ঘিরে যুদ্ধের স্মৃতি ফিরে এলে অবশ্যম্ভাবী হয়ে আসে ডিয়েগো ম্যারাডোনার ১৯৮৬ বিশ্বকাপের ‘হ্যান্ড অব গড’। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওই ম্যাচে হাতের গোলের কলঙ্কের চার মিনিট বাদেই ওই কিংবদন্তির পায়ে জন্ম হয় শতব্দীর সেরা গোলটি। ইংলিশরা কখনো ভুলতে পারবে না ওই ম্যাচের জ্বালা। এরপর ১৯৯৮ সালে বেকহামের লাল কার্ড দেখার ম্যাচেও টাইব্রেকারে হেরেছে ইংল্যান্ড।
তবে বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে জয়ের রেকর্ডে এখনো এগিয়ে ইংল্যান্ড। তাদের একমাত্র বিশ্বকাপ জয় ১৯৬৬ সালে, নিজেদের মাঠে আর্জেন্টিনাকে হারিয়েছিল। সেই ম্যাচে ইংলিশ কোচ আলফ রামসে আর্জেন্টাইনদের ‘পশু’ বলে ডেকেছিলেন।
এসবই আজকের ম্যাচে স্মৃতি হয়ে এসে তাতিয়ে দেবে দুপক্ষকেই। কাকতালীয়ভাবে এটা লিওনেল মেসির প্রথম ম্যাচ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে, স্বাভাবিকভাবে এটিকে স্মরণীয় করে রাখতে চাইবেন জাদুকর। কাতার বিশ্বকাপের মতো না দৌড়ালেও তিনি জানেন কীভাবে ম্যাচ বের করে আনতে হয়। এ তারকা থাকেন আর্জেন্টিনার প্রতিটি আক্রমণের কেন্দ্রে। গোল করছেন, করাচ্ছেন, ছন্দ তৈরি করছেন। ৩৯ বছর বয়সেও মনে হচ্ছে, পুরো আর্জেন্টিনা যেন তার বাঁ পায়ের ছন্দেই মেতে আছে।
সুইজারল্যান্ড ম্যাচের পর তিনি যেন আশাবাদী হতে চাইছেন অন্যদের নিয়ে। বিশেষ করে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে আলভারেসের গোল দেখে। এই তরুণ ফরোয়ার্ড বলছেন, ‘ইংল্যান্ড অনেক শক্তিশালী দল। তাদের দলে বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় আছে, তাই তারা সেমিফাইনালে উঠেছে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমরাও জানি ম্যাচটি মোটেও সহজ হবে না।’ এরপর যোগ করেন, ‘নকআউটের ম্যাচগুলো আমাদের জন্য অনেক কঠিন ছিল। আমরা লড়াই করেছি, কষ্ট করেছি। তবে এই দলের বড় শক্তি হলো, যেকোনো পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত লড়াই করার মানসিকতা।’
ইংল্যান্ডও চমৎকার খেলছে। আজতেকায় গিয়ে মেক্সিকোকে হারিয়ে আসার পর তাদের আত্মবিশ্বাস উঠে গেছে অনেক ওপরে। শেষ দুই ম্যাচে জুড বেলিংহাম করেছেন জোড়া গোল। নিজের ওপর বিশ্বাসটা অনেকখানি বেড়েছে রিয়াল মাদ্রিদ মিডফিল্ডারের, ‘কী করতে হবে আমরা জানি। তবে এটাও ঠিক, আর্জেন্টিনার ম্যাচটা অনেক কঠিন। ফাইনালে উঠতে হলে এমন কঠিন ম্যাচই জিততে হবে। এজন্য অামরা প্রস্তুত।’
দর্শকরাও প্রস্তুত একটা ঝাঁজালো সেমিফাইনাল দেখার জন্য। যে ম্যাচে ফুটবলের সঙ্গে থাকবে অনেক ইতিহাস।




