শুধুই নানির টানে লাল-সবুজে সুলিভানরা

সামাজিক মাধ্যমে সম্প্রতি যে নামটি ঘুরে ফিরছে, তিনি সুলতানা আলম। সবার প্রিয় ইরা আপা। তিনি কেবল একজন মানুষ নন, এক অনুপ্রেরণার নাম। এক অদৃশ্য শক্তি, যার টানে আজ রোনান-ডেক্লান সুলিভান বাংলাদেশের জার্সি গায়ে তুলে মাঠে নামছে।
ঢাকায় জীবনের বড় একটি অংশ কাটালেও সুলতানা আলমের শিকড় কিন্তু রাজবাড়ীর মাটিতে। সদর উপজেলার কাজীকান্দা এলাকাতেই তাঁর পৈতৃক নিবাস। তাঁর বাবা এস কে আলম ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের একজন স্বনামধন্য সার্জন। পরিবারে শিক্ষার পরিবেশ থাকলেও সুলতানা ছিলেন ব্যতিক্রমী; পড়াশোনার পাশাপাশি সংস্কৃতি চর্চাতেও সমান পারদর্শী। পাকিস্তান আমলে তিনি দু'বার গোল্ড মেডেল অর্জন করেন, যা তাঁর মেধা ও পরিশ্রমের এক উজ্জ্বল স্বীকৃতি।
১৯৬১ সালে ফুল স্কলারশিপ নিয়ে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভেনিয়ায়। সেখানেই উচ্চশিক্ষা শেষ করে কাজ করেন জাতিসংঘে। এরপর স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন যুক্তরাষ্ট্রে। তবে মাটির টান কখনোই ছাড়তে পারেননি। এখনো বছরের একটি বড় সময় তিনি কাটান বাংলাদেশে; আর নিয়ম করে আসেন রাজবাড়ীর বাড়িতে। স্থানীয় নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা তাঁকে এলাকাবাসীর কাছে করে তুলেছে আরও প্রিয়।
ব্যাংকপাড়ায় তাঁর একটি বাগানবাড়িও রয়েছে যেখানে শেকড়ের স্মৃতি আর আবেগ মিশে আছে প্রতিটি কোণে। অথচ এই মানুষটিই একসময় নাতিদের পড়াশোনা ছেড়ে খেলাধুলায় মনোযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়েছিলেন। কিন্তু সময় বদলেছে। আজ সেই নাতিদের নিয়েই গর্বে বুক ভরে ওঠে তাঁর।
রোনান ও ডেক্লান এই দুই তরুণ ফুটবলার, যাদের বাবা-মা, দাদা-দাদি কিংবা নানা কেউই বাংলাদেশি নন। শুধু একজন মানুষ তাদের নানি-সুলতানা আলম, যার হৃদয়ের গভীরে বাঁধা লাল-সবুজের পতাকা। সেই বন্ধনই আজ তাদের টেনে এনেছে বাংলাদেশের হয়ে খেলার অঙ্গীকারে।
অশীতিপর এই নারী ক্যান্সারের মতো কঠিন রোগের সঙ্গেও লড়েছেন সাহসিকতায়। কিন্তু তাঁর জীবনীশক্তি এতটাই প্রবল যে, শারীরিক সীমাবদ্ধতা উপেক্ষা করেও তিনি মালদ্বীপে গিয়ে নাতিদের খেলা দেখে এসেছেন। ভালোবাসা আর দেশের টানে তাঁর এই যাত্রা যেন এক প্রতীক; দূরত্বকে জয় করার।
এ বিষয়ে রাজবাড়ী জেলার বিশিষ্ট সংস্কৃতিজন ও শিক্ষক সৈয়দ সিদ্দিকুর রহমান বলছেন, সুলতানা আপা বাইরে থাকতেন। সেখানে তার বিয়ে হয়েছিল একজন বিদেশির সাথে। ফলে তার ছেলে-মেয়ে সবাই বিদেশি। তার মেয়ে বিয়ের বিয়ে হয়েছে সেখানে, বিদেশির সাথে। তাদেরই সন্তান রোনান ও ডেক্লেন। এর আগে সুলতানা আপার মেয়ে একবারমাত্র রাজবাড়ীতে এসেছিলেন। তবে সবাই আমেরিকাতেই বসবাস করছেন।
রাজবাড়ী থেকে ফিলাডেলফিয়া-নয় হাজার মাইলের ব্যবধানও তাঁর কাছে তুচ্ছ। কারণ তাঁর কাছে দেশ মানে শুধু ভূখণ্ড নয়; দেশ মানে আবেগ, ইতিহাস, পরিচয়। রোনান ও ডেক্লান হয়তো বড় হয়েছে আমেরিকায়, কিন্তু তাদের শিকড়ের এক প্রান্ত যে এই বাংলায়-তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
এক নানির অদম্য ভালোবাসা, এক জীবনের গল্প, আর ফুটবলের অদ্ভুত বন্ধনে আজ একসূত্রে গাঁথা সবকিছু। সত্যিই দেশ-নাগরিকত্ব-পাসপোর্ট, এসবের হিসাব কখনো কখনো জটিল হয়ে যায়। কিন্তু ভালোবাসা আর খেলাধুলা সেই জট খুলে দেয় সহজেই।















