তামাক নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগে ঘাটতি: গবেষণা

ছবিঃ আগামীর সময়
বাংলাদেশে তামাক নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান আইন প্রয়োগে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে বলে একাধিক গবেষণায় উঠে এসেছে। সোমবার (৬ এপ্রিল) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক গবেষণা সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
বাংলাদেশ সেন্টার ফর কমিউনিকেশন প্রোগ্রামস (বিসিসিপি) এবং বাংলাদেশ টোব্যাকো কন্ট্রোল রিসার্চ নেটওয়ার্ক (বিটিসিআরএন), যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল টোব্যাকো কন্ট্রোল (আইজিটিসি)-এর সহযোগিতায় এ ‘রিসার্চ ফাইন্ডিংস ডিসেমিনেশন’ সম্মেলনের আয়োজন করে।
সম্মেলনে ২০২৫ সালের প্রোগ্রামের আওতায় পরিচালিত সাতটি গবেষণার ফলাফলসহ নির্বাচিত দেশীয় গবেষণার তথ্য উপস্থাপন করা হয়। এতে দেখা যায়, তামাকমুক্ত পরিবেশের পক্ষে জনগণের উচ্চ সচেতনতা ও সমর্থন থাকলেও আইনের কার্যকর বাস্তবায়নে বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে।
গবেষণায় উঠে এসেছে, রেলস্টেশন, ট্রেনসহ বিভিন্ন জনসমাগমস্থলে ধূমপানমুক্ত আইন ব্যাপকভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে আইনের দুর্বল প্রয়োগ, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কর্তৃত্বের অস্পষ্টতা এবং নজরদারি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা।
অন্যদিকে এতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোতে তামাকের উপস্থাপনায় স্বাস্থ্য সতর্কবার্তার অনুপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে, যা তরুণদের মধ্যে তামাক ব্যবহারের প্রবণতা বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আশপাশেও বিধিনিষেধ অমান্য করে একক শলাকা বিক্রি ও প্রচারণা চালু রয়েছে, ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধূমপানের ঝুঁকি বাড়ছে।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, ধোঁয়াবিহীন তামাক খাত এখনও কার্যত নিয়ন্ত্রণের বাইরে। অনানুষ্ঠানিক উৎপাদন, দুর্বল লাইসেন্সিং এবং সরবরাহ ব্যবস্থার তদারকির ঘাটতির কারণে এই খাতে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না। একইসঙ্গে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ই-সিগারেট অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে সহজলভ্য এবং ডিজিটাল মাধ্যমে এর প্রচারণা অব্যাহত রয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শেখ মোমেনা মনি জানান, সরকার জনস্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে শক্তিশালী নীতিমালা গ্রহণ করেছে। ধূমপান ও তামাকজাত পণ্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫-এ ই-সিগারেট, ইলেকট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম (ইএনডিএস) ও হিটেড টোব্যাকো পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
তিনি জানান, নতুন বিধানে স্কুল, হাসপাতাল, ক্লিনিক, খেলার মাঠ ও পার্কের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাকজাত পণ্য বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া পণ্যের মোড়কের ৭৫ শতাংশে গ্রাফিক স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং সিএসআর কার্যক্রমের আড়ালে তামাক কোম্পানির প্রচারণা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
আইজিটিসি-এর পরিচালক জোয়ানা কোহেন জানান, তামাকগ্রহণ সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধযোগ্য। উচ্চ কর, বিজ্ঞাপন নিষেধাজ্ঞা, প্লেইন প্যাকেজিং এবং কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে ধূমপানের হার কমানো সম্ভব।
সভাপতির বক্তব্যে গ্রিন ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শরিফ উদ্দিন জানান, তামাক সেবনের কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই এবং এটি প্রাণঘাতী রোগ ও অকাল মৃত্যুর অন্যতম কারণ।
বাংলাদেশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি রাজেশ নারওয়াল জানান, দেশে প্রতি ৩০ মিনিটে তামাকজনিত রোগে অন্তত ১০ জন মানুষের মৃত্যু হয়, যা একটি বড় জনস্বাস্থ্য সংকট।
সমাপনী অধিবেশনে বিটিসিআরএন-এর সভাপতি ড. নওজিয়া ইয়াসমিন সভাপতিত্ব করেন। এতে অধ্যাপক ড. সৈয়দ জাকির হোসেন এবং বিসিসিপির পরিচালক ও সিইও মোহাম্মদ শাহজাহানসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, বিসিসিপি গত ১৩ বছর ধরে টোব্যাকো কন্ট্রোল পলিসি রিসার্চ গ্রান্ট প্রোগ্রামের মাধ্যমে দেশে তামাক নিয়ন্ত্রণে গবেষণা ও নীতিনির্ধারণে সহায়তা করে আসছে।














