আতশবাজির আলোর নিচেই অভাবের অন্ধকার

আকাশ জুড়ে আতশবাজির ছটা মিলিয়ে যেতে না যেতেই জ্বলে উঠল ক্যামেরার ফ্লাশগুলো। তাদের লেন্স তাক করা প্রতিভা অন্বেষণ প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের দিকে। সেই বিজয়ী ২৩ জনের ভেতর মোহাম্মদ শাহজাহান শুভর ছেলে সাইফও আছে। খাগড়াছড়ি থেকে আসা শুভ জানেন না, বিজয়ীদের একজন হওয়ার জন্য তার ছেলে কোনো আর্থিক পুরস্কার পাবে কি না। শুধু জানেন, কতটা কষ্ট করেই তিনি খাগড়াছড়ি থেকে ঢাকায় আসা-যাওয়া ও অবস্থানের খরচটা জোগাড় করেছেন। আতশবাজি, আলোর রোশনাই, ফায়ারড্যান্স আর লাস্যময়ী মডেলের ব্যবস্থা করলেও আয়োজকরা একজন ৯ বছর বয়সী শিশু বিজয়ী এবং তার বাবার খাগড়াছড়ির প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ঢাকায় আসা-যাওয়া ও থাকার খরচটা বহন করতে পারেনি।
গতকাল সোমবার মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে হয়ে গেল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচি ‘বোলার হান্ট’-এর সমাপনী। একটি মোবাইল ফোন সেবাদাতা সংস্থার পৃষ্ঠপোষকতায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ৯টি ভেন্যু থেকে ১৪৩ জন সম্ভাবনাময় বোলারকে প্রাথমিকভাবে বাছাই করা হয়েছিল। সেখান থেকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করা হয়েছে ২১ জন খুদে বোলারকে। এ ছাড়া বিশেষ পুরস্কার পেয়েছে আরও দুজন।
আমন্ত্রণপত্রে উল্লিখিত সময়ের এক ঘণ্টা দেরিতে শুরু হয় অনুষ্ঠান। অতিথিদের বক্তব্যের সঙ্গে প্রতিভা অন্বেষণ প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত থাকা বিসিবির কোচ কোরি কোলিমোর বললেন মুগ্ধতার কথা, ‘আমি অনেক প্রতিভাবানই দেখেছি এই কর্মসূচিতে, তবে আমাকে সবচেয়ে অবাক করেছে খেলার প্রতি ভালোবাসা। সেই ভালোবাসা থেকে অনেকেই জিন্স আর চপ্পল পরে চলে এসেছে ট্রায়াল দিতে।’ আরেক কোচ দীপু রায় চৌধুরী বলেছেন, অনেকের মধ্যেই শোয়েব আখতার, জাসপ্রিত বুমরাহর মতো বোলারদের বোলিং অ্যাকশন অনুকরণের প্রবণতা দেখেছেন।
তবে নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বাদ পড়াদের একটা বড় অংশ। অতীতে ‘পেসার হান্ট’ উদ্যোগে বিসিবি খুঁজে বের করতে চেয়েছিল গতি তারকা, যেখানে বোলারের গতিই মুখ্য। এবার ‘বোলার হান্ট’ হওয়াতে ফল অনেকটাই কোচদের মার্কিংয়ের ওপর নির্ভরশীল। এখানেই বিসিবির কোচ মোহাম্মদ সালাহউদ্দিনকে নিয়ে বিতর্ক। জাতীয় দল থেকে হাইপারফরম্যান্স, সেখান থেকে আবার জাতীয় দল, মাঝে বোলার হান্টের বিচারক, সালাহউদ্দিন আছেন সব জায়গাতেই। বাংলাদেশের ক্রিকেটে বিকেএসপির এক অদৃশ্য বলয়ের অংশীদার সালাহউদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, বিকেএসপি থেকে আসা ক্রিকেটারদেরই তিনি নিয়েছেন বোলার হান্ট থেকে। বিকেএসপিতে যারা অধ্যয়ন করছেন, তারা একটি বিশেষায়িত ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী হিসেবে একজন সাধারণ ক্রীড়াবিদের চেয়ে বাড়তি প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন। তারা একটি নির্দিষ্ট কর্মসূচির অংশ। তারা কেন আবার প্রতিভা অন্বেষণের মাধ্যমে সুযোগ পাবেন, এই অভিযোগ অনেকেরই। বিকেএসপিতে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছে মেহেরুন নেসা। বোলার হান্টে পেস বোলার হিসেবে সেও সুযোগ পেয়েছে ২৩ জনের তালিকায়।
লাস্যময়ী মডেলদের সঙ্গে মঞ্চে হাঁটিয়ে নিয়ে আসা হলো এই উঠতি ক্রিকেটারদের। ক্রিকেটের প্রথম শিক্ষা চাকচিক্য আর প্রলোভন থেকে দূরে রাখা হলেও এখানে শুরুতেই তাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো রঙিন দুনিয়ার সঙ্গে। অনুষ্ঠানের পর ইভেন্ট আয়োজক আর পৃষ্ঠপোষকদের ছবি তোলার হিড়িক লাগে। একজন সংবাদকর্মী তাড়া দিতেই পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠানের একজন বললেন, ‘ভাই নিউজ পরেও ধরানো যাবে।’



