বললেন তামিম
উপমহাদেশের মানুষ তরুণদের সহজে নেতা মানে না

সবাইকে একত্রিত করতে চান তামিম। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সবচেয়ে কম বয়সী সভাপতি তামিম ইকবাল। পোড়খাওয়া অভিজ্ঞ আর কজন তরুণকে নিয়ে তিন মাসের জন্য দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি। ঘোষণা দিয়েছেন, নির্ধারিত তিন মাসের আগেই নতুন নির্বাচন দেওয়ার। গত কিছুদিনে বোর্ড সভাপতি হিসেবে কেমন হলো তার অভিজ্ঞতা?
এ নিয়ে ‘ক্রিকইনফো’য় দেওয়া সাক্ষাৎকারে তামিম বলেছেন, ‘উপমহাদেশের মানুষ তরুণ বয়সে আপনাকে নেতা হিসেবে সহজে মেনে নিতে পারে না। সবাইকে সম্মান দেখানো আমার দায়িত্ব হবে। আবার এখানে যোগাযোগ খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমি যদি আমার স্বপ্ন সবার সঙ্গে ভাগ করে নিই, আমার মনে হয় তারা ধীরে ধীরে আমার ওপর বিশ্বাস করতে শুরু করবে। আমি সবাইকে একত্র করতে চাই, তাদের প্রাপ্য সম্মান দিতে চাই। আমি এখানে নির্দেশ দিতে বা কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে আসিনি। এটা আমার পছন্দ-অপছন্দের বিষয় নয়। সভাপতির চেয়ারে বসে আমার অহংকার ও রাগ দূরে সরিয়ে রাখতে হবে। এটাই আমার মানসিকতা এবং এভাবেই আমি বাংলাদেশ ক্রিকেটকে ভবিষ্যতে নিয়ে যেতে চাই।’
আমি যদি নির্দেশ দেওয়া শুরু করি, তবে তা ভালো হবে না। আমি যদি দলের সঙ্গে যুক্ত হই এবং দল ভালো না করে, তাহলে কে কার কাছে জবাবদিহি করবে।
আমিনুল ইসলাম বুলবুলের জায়গায় দায়িত্ব পেয়ে নিজে নির্বাচন করার কথা জানিয়েছিলেন তামিম। সেই সিদ্ধান্তে তিনি অটল আছেন এখনো, ‘আমি প্রথম সংবাদ সম্মেলনে খুব স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছি, আগামী নির্বাচনে সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার দায়িত্ব রয়েছে আমার। বাংলাদেশ ক্রিকেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের একটি সুষ্ঠু নির্বাচন পাওয়ার অধিকার আছে। আপনারা সম্প্রতি দেখেছেন, কীভাবে বাংলাদেশে ক্রিকেট প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। খেলোয়াড়রা ভুগছিলেন, তাই আমরা চাই না সেই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হোক। নির্বাচনের পর যদি আমি সুযোগ পাই, তাহলে আমি বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য আমার স্বপ্ন বাস্তবায়নের কাজে হাত দেব।’
আমি এখানে নির্দেশ দিতে বা কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে আসিনি। এটা আমার পছন্দ-অপছন্দের বিষয় নয়। সভাপতির চেয়ারে বসে আমার অহংকার ও রাগ দূরে সরিয়ে রাখতে হবে।
কিছুদিন আগেও বাংলাদেশের হয়ে খেলেছেন তামিম ইকবাল। দেখেছেন বোর্ড সভাপতিদের দলে খবরদারি করতেও। তবে এমন কিছু করতে চান না তামিম, ‘আমি দলটিকে পেশাদারত্বের সঙ্গে সামলাতে চাই। আমি দীর্ঘদিন ধরে এই খেলা খেলেছি। তাই কী ঘটছে, সে সম্পর্কে ধারণা আছে। সবসময় পরামর্শ দেওয়া আর বিভিন্ন বিষয় ভাগ করে নেওয়া দলের জন্য ভালো নয়। আগের বোর্ড নির্বাচকদের নিয়োগ দিয়েছে, যাদের একটি ন্যায্য সুযোগ দিতে হবে। আমি যদি নির্দেশ দেওয়া শুরু করি, তবে তা ভালো হবে না। আমি যদি দলের সঙ্গে যুক্ত হই এবং দল ভালো না করে, তাহলে কে কার কাছে জবাবদিহি করবে?’
যে দর্শক একটি টিকিট কেনার জন্য ২০০ টাকা খরচ করে, সে কীভাবে ২৫০ টাকার বিরিয়ানি কেনার সামর্থ্য রাখে?
নারী ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা নিয়ে তামিম বলেছেন, ‘সবার আগে আমি আমাদের নারী ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাই। যা ঘটেছে (একজন সাবেক নির্বাচকের বিরুদ্ধে জাহানারার অসদাচরণের অভিযোগ) এবং গত কয়েক বছরে তারা যা সহ্য করেছে, তাতে তাদের সার্বিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষাই হলো এক নম্বর অগ্রাধিকার। উন্নয়ন ও বিশ্বকাপ নিয়ে আমরা একটু পরে ভাবতে পারি। তাদের মেয়েরা কত রান বা উইকেট করেছে বা নিয়েছে, তা নিয়ে তাদের মা-বাবারা খুব একটা চিন্তিত নন। তারা তাদের মেয়েদের ভালো থাকা ও নিরাপত্তা চান। বিসিবির প্রধান হিসেবে আমাকে নিশ্চিত করতে হবে যেন আমি সেই পরিবারকে নিরাপত্তার অনুভূতি দিতে পারি। আমাকে আমাদের মেয়েদের নিরাপদ রাখতে হবে।’
এই প্রজন্মের ক্রিকেটারদের তরুণ প্রজন্মের কাছে নায়ক হিসেবে তুলে ধরা বিসিবির কাজ।
গ্যালারির খাবারের দাম কমানো নিয়ে তামিম বললেন, ‘যে দর্শক একটি টিকিট কেনার জন্য ২০০ টাকা খরচ করে, সে কীভাবে ২৫০ টাকার বিরিয়ানি কেনার সামর্থ্য রাখে? বিসিবি একটি আন্তর্জাতিক ম্যাচের সময় সবাইকে বিনামূল্যে পানীয় জল দিতে পারে। যখন আপনি সুযোগ-সুবিধার কথা বলেন, আমি জানতে পারলাম যে, উদাহরণস্বরূপ, মিরপুর স্টেডিয়ামটি এত বছর আগে তৈরি হওয়ার পর থেকে এর কোনো সংস্কার করা হয়নি। আমি এই ভেন্যুর শৌচাগারগুলো দেখেছি। আপনি সত্যি সত্যি আশা করতে পারেন না যে একজন অভিভাবক তার সন্তানকে এই ধরনের শৌচাগারে নিয়ে যাবে। তাহলে আমার দায়িত্ব কী? বাংলাদেশ কীভাবে ব্যাট বা বল করবে, তা আমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না; কিন্তু একজন দর্শক ক্রিকেট মাঠে কতটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে, তা আমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। আমি জানি, আমি রাতারাতি সবকিছু পরিবর্তন করতে পারব না; কিন্তু আমি অবশ্যই কিছু পরিবর্তন আনতে পারি।’
আইসিসি ও অন্য বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যের কথাও জানিয়েছেন তামিম,‘ আমি সবার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি। অংশীদারদের সাথে কাজ করার সময় আপনাকে আরও কৌশলগত এবং যৌক্তিক হতে হবে। আমি যদি বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভিশন সুন্দরভাবে তুলে ধরতে পারি, তবে সব বোর্ডই এর প্রশংসা করবে।’
সভাপতি হিসেবে ভাবতে হয় পুরো কাঠামো—খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ, এমনকি বোর্ডের কর্মীদের নিয়েও। এখানে আবেগ দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই।
জাতীয় দলের নেতৃত্ব দেওয়া আর বোর্ডের নেতৃত্ব দেওয়া যে এক নয় সেটাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তামিম,‘জাতীয় দলের অধিনায়ক থাকা আর বোর্ড সভাপতির দায়িত্ব পালন একেবারেই আলাদা। অধিনায়ক হিসেবে কেবল দল ও খেলার দিকেই মনোযোগ দিতে হয়, আর সভাপতি হিসেবে ভাবতে হয় পুরো কাঠামো—খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ, এমনকি বোর্ডের কর্মীদের নিয়েও। এখানে আবেগ দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই, দেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ মাথায় রেখেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়।’
বাংলাদেশ ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা কমছে। দর্শক আগের মতো আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। টিভিস্বত্বও বিক্রি হচ্ছে না খুব বেশি দামে। এ নিয়ে তামিমের অভিমত, ‘এখানেই প্রচারের বিষয়টি আসে। এই দেশের মানুষ ক্রিকেট ভালোবাসে। তাই আমাদের তাদের এই অনুভূতিটা মনে করিয়ে দিতে হবে। হয়তো আপনার প্রিয় ক্রিকেটার আর খেলছেন না; কিন্তু বাংলাদেশ দল খেলছে। এই প্রজন্মের ক্রিকেটারদের তরুণ প্রজন্মের কাছে নায়ক হিসেবে তুলে ধরা বিসিবির কাজ। আমি যদি মিডিয়ায় তাদের সমালোচনা করি, যা অতীতে (অন্যান্য বোর্ড সভাপতিদের ক্ষেত্রে) ঘটেছে, তাহলে তা বাংলাদেশ ক্রিকেটের ব্র্যান্ড প্রচারে সাহায্য করবে না।’



