নাজমুলদের বিজয় কি সবার হৃদয় ছুঁতে পেরেছে?

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ক্রিকেট বলুন আর ফুটবল- দল হেরে গেলে সমর্থকদের মন খারাপ হয়েই থাকে। অনেক সময় তো ক্ষোভের বিস্ফোরণও দেখা যায়। খেলোয়াড়দের বাড়িঘরে হামলার ঘটনা এই উপমহাদেশে একসময় হরহামেশাই ঘটত। এই যুগে অবশ্য ঘরে বসে সোশ্যাল মিডিয়াতেই ক্ষোভ প্রকাশ করা যায়। খেলোয়াড় থেকে শুরু করে তাদের পরিবার-পরিজনরাও রেহাই পান না সাইবার বুলিং থেকে। বাংলাদেশের কাছে টেস্ট সিরিজে ২-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ হওয়ার পর এখন পর্যন্ত পাকিস্তানে বাড়ি-ঘর বা টিভি ভাঙার কোনো খবর পাওয়া যায়নি, তবে নিঃসন্দেহে পাকিস্তানি জনগণের মন ভালো নেই। ছাপান্ন হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশেও কি সবাই নাজমুলদের জয়ে খুশি?
একটা সময় ঢাকার স্টেডিয়ামে ‘ম্যারি মি আফ্রিদি’ লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে তরুণীদের দেখা যেত। সেসব নিয়ে পত্র-পত্রিকায় সমালোচনা হতো বিস্তর। কারণ একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসররা এদেশের মানুষের ওপর যে নজিরবিহীন গণহত্যা চালিয়েছিল, নারীদের ওপর ইতিহাসের যে বর্বরতম নির্যাতন চালিয়েছিল; তারপর থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে পাকিস্তানি সমর্থক থাকাটা বিস্ময়কর বটে। কিন্তু সংখ্যায় কম হলেও বাংলাদেশে পাকিস্তানি সমর্থক আছে। বাংলাদেশ সফরে এসে পাকিস্তান ক্রিকেট দলের কখনো সমর্থনের অভাব হয়নি। প্রকাশ্যে হোক বা গোপনে- সবসময়ই কিছু বাঙালি তাদের সমর্থন দিয়ে গেছে। একটা সময় সমালোচনার ফলে স্টেডিয়ামে প্রকাশ্যে পাকিস্তানকে সমর্থন দেওয়া অনেকাংশেই বন্ধ হয়েছিল। শুধু পাকিস্তানি নাগরিকদের দেখা যেত বাংলাদেশের স্টেডিয়ামগুলোতে নিজ দলকে সমর্থন করতে। তবে গত দুই বছরে দেশের অনেক পরিবর্তনের মতো স্টেডিয়ামের গ্যালারিতেও এসেছে পরিবর্তন। এখন পাকিস্তানের জার্সি পরে, হাতে পাকিস্তানি পতাকা নিয়ে এই প্রজন্মের বাংলাদেশি নাগরিকদের দেখা যায় নিয়মিতই পাকিস্তানকে সমর্থন দিতে। খেলাটা হচ্ছে নিজ দেশের বিপক্ষে, কিন্তু তারা পাকিস্তান সমর্থক। গণমাধ্যমের কাছে গর্ব করে তারা সেটা প্রচারও করেন। পাকিস্তানের হারে তাদের মন খারাপ হয়। সদ্য সমাপ্ত টেস্ট সিরিজেও দেখা গেছে এই দৃশ্য। বাংলাদেশের ক্রীড়াপ্রেমীদের বিশাল একটি অংশ স্প্যানিশ ফুটবলের নিয়মিত দর্শক। ধরুন, বার্সেলোনার কোনো ফুটবলার দলবদল করে রিয়াল মাদ্রিদে গেল; কিংবা রিয়ালের কেউ যোগ দিল বার্সেলোনায়। ধারণা করতে পারেন, সেই ফুটবলারের ভাগ্যে কী ঘটতে পারে? ২০০০ সালে বার্সা থেকে রিয়ালে যাওয়ার ‘মজা’ হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলেন কিংবদন্তি লুইস ফিগো, যা ইতিহাসের 'কুখ্যাত দলবদল' হিসেবে পরিচিত। মাঠে নামলেই বার্সা সমর্থকেরা তাকে যেভাবে হেনস্থা করত, তারপর আর কোনো ফুটবলার সেই সাহস করেননি।
বার্সা-রিয়ালের এই দ্বৈরথের পেছনে আছে
শত বছরের পুরনো রাজনৈতিক বিরোধ। কাতালুনিয়া বহু বছর ধরেই স্পেনের থেকে স্বাধীনতা চায়।
তাদের আছে নিজস্ব ভাষা ও ঐতিহ্য। বারবার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পরও স্পেন তাদের স্বাধীনতা
দেয়নি, কিংবা কাতালানরা এখনো পেরে ওঠেনি স্পেনের সাথে। কিন্তু বাংলাদেশ পেরেছিল ১৯৭১
সালে পাকিস্তানের থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিতে। এজন্য দিতে হয়েছিল চরম মূল্য। তারপরও
পাকিস্তানের পরাজয়ে এদেশের কিছু মানুষের মন খারাপ হয়। অশ্রাব্য ভাষায় তারা আক্রমণ করে
নিজ দেশের খেলোয়াড় থেকে শুরু করে সমর্থক-সাংবাদিকদের। বাংলাদেশের চেয়ে সবক্ষেত্রে যোজন
যোজন পিছিয়ে থাকা পাকিস্তানের স্বপ্নে তারা এখনো বিভোর হয়ে থাকে!
বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তান ক্রিকেট দলের এত সমর্থন কিন্তু স্রেফ খেলাধুলার কারণেই নয়; বরং এর পেছনে আছে সংঘবদ্ধ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। ইমরান-ওয়াসিম-ওয়াকার কিংবা শোয়েবদের যুগ শেষে পাকিস্তান সেই মাপের কোনো ক্রিকেটারও তৈরি করতে পারেনি, যারা বিশ্বজুড়ে তাদের সমর্থক তৈরি করবে। স্রেফ ক্রিকেটীয় কারণে সমর্থন পাওয়ার মতো দল এখন পাকিস্তান নয়; রাজনৈতিক কারণেই তারা বাংলাদেশের গ্যালারিতে কখনো নীরব আবার কখনো সরব সমর্থন পেয়ে আসছে। একবার ভাবুন তো, ন্যু ক্যাম্পে কাতালুনিয়ার কোনো ব্যক্তি রিয়াল মাদ্রিদের পতাকা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে! সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে বলছে- ‘খেলাধুলায় রাজনীতি মেশানো ঠিক না’ কিংবা ‘রিয়াল আমাদের ভাই, স্পেনের সঙ্গে যা হয়েছে সব অতীত...।’









