যেন ক্যানিজিয়ার জীবনেরই অংশ ম্যারাডোনা

১৪ জুলাই, ১৯৯৬; বিখ্যাত লা বোম্বোনেরা স্টেডিয়ামে রিভারপ্লেটকে হারিয়ে দিল বোকা জুনিয়র্স। ৪-১ গোলের সেই জয়ে হ্যাটট্রিক ক্লদিও ক্যানিজিয়ার। তার প্রিয় বন্ধু ডিয়েগো ম্যারাডোনা এতটাই খুশি যে, আবেগ ধরে রাখতে না পেরে ঠোঁটে চুমু দিয়ে বসেন বন্ধুকে। আর সেই চুমু নিয়ে কম রটনা হয়নি। তবে ব্যাপারটা সে রকম কিছু নয়, পুরোটাই আবেগ ও আনন্দের। ক্যানিজিয়ার কাছে ম্যারাডোনা মানে ‘জীবন’। তাই প্রয়াত বন্ধুর প্রতি মুগ্ধতা এখনো অটুট।
গতকাল ফর্টিস এফসির আমন্ত্রণে ইন্টারস্কুল চ্যাম্পিয়নস লিগের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলেন আর্জেন্টিনার সাবেক তারকা ফুটবলার। এরপর এক সংবাদ সম্মেলনে ম্যারাডোনার সঙ্গে সেই চুমুর স্মৃতি টেনে ক্যানিজিয়া বলেছেন, ‘সে আমার বন্ধু, আমি ওকে অনেক মিস করি। ওর কথা মনে করে এখনো মুগ্ধ হই। ২০ বছরের মতো একসঙ্গে খেলেছি। ডিয়েগোকে দেখে বড় হয়েছি। বোকা জুনিয়র্সে ওর সঙ্গে খেলার সময়টা আমার সবচেয়ে উপভোগ্য ছিল। ওই চুমুর ব্যাপারটাও সেখানেই। এটা অন্যরকম কিছু না, জয়ের পর শুধু একটি উদযাপন মাত্র।’
ম্যারাডোনায় তিনি এতটা মঝে আছেন, সেখানে মেসিও পেছনে। সেরা ফর্মের মেসিকে দেখেও এ আর্জেন্টাইন তারকা ম্যারাডোনার চেয়ে এগিয়ে রাখতে রাজি নন, ‘মেসি ও ম্যারাডোনার মধ্যে কে সেরা এটা সবসময়ের প্রশ্ন। আমার কাছে দুজনই সেরা, লিজেন্ড। তবে আমি পেলেকেও যোগ করতে চাই। ফুটবলে এ তিনজন আমার কাছে সেরা। এর মধ্যে দুজন আর্জেন্টিনার। এটা আমাদের দেশের জন্য একটা গর্বের বিষয়।’
আর্জেন্টিনার প্রতি বাংলাদেশ ফুটবলপ্রেমীদের ভালোবাসা তার কানেও পৌঁছেছে। গতকাল তা দেখেছেন নিজের চোখে। ফর্টিস এফসি একাডেমির খুদে ফুটবলারদের সঙ্গে ছবি তুলতে গিয়েই বুঝছেন আর্জেন্টিনার ফুটবল আবেগে ভেসে যায় বাংলাদেশের মানুষ।
৫০ বছর বয়সী এই আর্জেন্টাইন তারকাকে এ সময়ের কিশোররা খুব একটা চেনে না। তাকে চেনার একমাত্র ভরসা ইন্টারনেট। তা দেখেই হয়তো চিনে নিয়েছেন ম্যারাডোনার পাশাপাশি আকাশি-নীল জার্সিতে তারকা হয়ে ওঠা এই ফুটবলারকে। তাই কিশোরদের একের পর এক তার সঙ্গে ছবি তোলা বা অটোগ্রাফের আবদার মিটিয়েছেন হাসিমুখে। সংবাদ সম্মেলনেও জানিয়েছেন, এখানকার মানুষের আর্জেন্টিনাপ্রীতি তাকে অবাক করে।
সেই অবাক করার শুরুটা ১৯৮৬ বিশ্বকাপ থেকে। আর্জেন্টিনা সেবারের বিশ্বকাপ জয়ের পর বাংলাদেশের মানুষের উল্লাস-উন্মাদনার কথা শুনেছেন। একই রকম আগ্রহ এ দেশের মানুষের মধ্যে দেখেছেন সবশেষ বিশ্বকাপেও।
এ বিশ্বকাপের ব্যাপারটাও অবশেষে ফিরে এলো। ক্যানিজিয়ার চোখে এবারের বিশ্বকাপ ফাইনাল হেরে যাওয়া একজন আর্জেন্টাইন হিসেবে হতাশার, ‘সত্যিই আমি হতাশ। হতাশা এই কারণে যে, আমরা পুরো টুর্নামেন্ট একরকম খেলেছি। সেই অনুযায়ী আমাদের বিশ্বকাপ প্রাপ্য। কিন্তু শুধু ফাইনালের কথা বললে, আমার মধ্যে হতাশা কাজ করে না। কারণ সেই ম্যাচে আমরা ভালো খেলিনি। স্পেন দাপটে খেলেছে। এমন খেলে জয়ের প্রত্যাশা করা যায় না।’
শুধু ফাইনাল ম্যাচ ক্যানিজিয়াকে হতাশ করে না। কিন্তু লিওনেল মেসির হাতে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ দেখতে না পারা তাকে পীড়া দেয়। টানা দুটি বিশ্বকাপ জয়ের সুযোগ ছিল মেসির সামনে। এবারের বিশ্বকাপেও তিনি খেলেছেনও অবিশ্বাস্য ফুটবল। কিন্তু তীরে এসে তরী ডুবে যাওয়ার ব্যাপারটি সময়ের সেরা ফুটবলারের জন্য খানিকটা অপূর্ণতারও।
ক্যানিজিয়াও তাই বিশ্বাস করেন, ‘মেসির জন্য ফাইনাল খেলাটা গুরুত্বপূর্ণ, তারা আগেই (আর্জেন্টিনা) আউট হতে পারত মিসরের বিপক্ষে ম্যাচে। সেই বাধা পেরিয়ে ফাইনালে গিয়ে হেরে যাওয়া মেসির জন্য হতাশার। সে জিততে পারত। তবে এটা ফুটবল। গ্রেট ফুটবলাররা জেতে আবার হারেও, এটাই আসল গল্প।’ ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ে মেসির গল্পটা পূর্ণতা পেয়েছে। তাকে কি পরের বিশ্বকাপেও দেখা যাবে? ক্যানিজিয়ার উত্তর, ‘যদি মেসির ইচ্ছে হয় তাহলে ২০৩০ বিশ্বকাপ খেলতেও পারে।’






