বিশ্বকাপ ফুটবলে বাংলাদেশ: একটি স্বপ্নপূরণের গল্প

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ফুটবল কর্তারা এখনো যদি ক্লাব ফুটবলের জনপ্রিয়তা ফেরানোর উদ্যোগ নেন, স্পন্সর জোগাড়ে সচেষ্ট হন, কাঠামোগত উন্নয়ন করেন, ক্লাবগুলোও সে মিশনে যোগ দেয়, তাহলে বাংলাদেশের ফুটবলে প্রাণ ফেরা, সাফল্য আসা সময়ের ব্যাপার মাত্র। বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে বাংলাদেশের নাম লিখিয়ে ফেলাও অসম্ভব নয়
কোপেনহেগের মার্চ। শীতের আড়মোড়া ভেঙে বসন্তযাত্রার আয়োজন প্রকৃতিতে। সেদিনের রোদ্দুরও ঝকঝকে। মৃদুমন্দ হাওয়ায় সুখী সুখী বার্তা।
অথচ শহরতলির ওই হাসপাতালে কী ভীষণ বিষণ্নতা! বিলাপহীন বোবাকান্নায় স্তব্ধ এক পরিবার। যে পরিবারের ছায়া হয়ে থাকা ৭২ বছরের বৃদ্ধ সপ্তাহখানেক ধরে কোমায়। হৃদযন্ত্রের জটিলতার কোনো কূলকিনারা হচ্ছে না। কিছুতেই সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না তার।
১৬-১৭ বছরের এক কিশোর রোজ আসে হাসপাতালে। ওই বৃদ্ধের নাতি; দাদুর দেওয়া ‘বাংলাদেশ’ নাম তার। সেদিন ভিজিটিং আওয়ারের বাইরের সময়ে সে ছুটে আসে হন্তদন্ত হয়ে। ডাক্তারকে কী যেন বলতে থাকে ব্যাকুল ছলছল নয়নে। তাতেই পেশাদারিত্বের পাথর গলে যায়; খুলে যায় আইসিইউর দরজা। দাদুর কাছে যাওয়ার, তাকে স্পর্শ করার অনুমতি পায় ছেলেটি। মাত্র মিনিট পাঁচেকের জন্য।
কিশোরটি ছুটে যায় তার প্রিয়জনের কাছে। নিজের মোবাইল বের করে ছোট্ট একটি ভিডিও ক্লিপ শোনায়। এক মিনিট। দুই মিনিট। তিন মিনিট। কী আশ্চর্য, বৃদ্ধের আঙুল নড়ে ওঠে ধীরগতিতে। ভিজে যায় চোখের কোল। সপ্তাহখানেক পর প্রাণের স্পর্শ ফেরে শরীরে। ছুটে আসেন ডাক্তার-নার্স। যমে-মানুষে টানাটানিতে জীবনের জয়গানের এক ফালি প্রতিশ্রুতি থাকে সেখানে।
বাইরের করিডরে এসে দাঁড়ায় কিশোর। ফোন করে দাদুর সুসংবাদ দেয় বাবা-মাকে। পাশের লম্বা খোলা জানালায় তখন ছবি আঁকে চৌকো আকাশ। যেখানে ভেসে বেড়ায় আশ্চর্য মেঘদল।
সেদিন বিকালেই কোমা থেকে অলৌকিকভাবে ফিরে আসেন বৃদ্ধ। নাতিকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘তোর বয়সে একবার গোলাগুলির মাঝে পড়ে চারটা গুলি খেয়ে কোমায় ছিলাম আমি। সেখান থেকে ফিরেছি কীভাবে, জানি না। তবে এবার যে ফেরালি তুই, তা নিশ্চিতভাবেই জানি। আর বল তো, এই দিনটি দেখার আগে আমি চলে যাই কী করে?’
সময়টা ২০৬২। প্রথমবারের মতো ফুটবল বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে নাম লিখিয়েছে বাংলাদেশ। কোমায় থাকা দাদুর কানে কানে মোবাইলে শুনিয়েছিল সেই গর্বের খবরটা। আর তাতেই চিকিৎসাবিজ্ঞানকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে মৃত্যুকে হারিয়ে জীবনে ফেরেন ৭২ বছরের বৃদ্ধ। তার নাম? জামাল ভূঁইয়া।
অনেক বছর আগে বাংলাদেশ নামক ছোট্ট দেশটায় তিনি ফিরেছিলেন ফুটবল পুনর্জাগরণের স্বপ্ন নিয়ে। চেষ্টা করেছিলেন প্রাণপণ। তার দেখাদেখি আরও কত কত ফুটবলার রক্তের ঋণ শোধে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে গিয়ে গায়ে জড়িয়েছেন লাল-সবুজ জার্সি! যে বিপ্লবের মশাল জ্বেলেছিলেন জামাল, সে মিছিলে যোগ হয় আরও অনেক নাম। তারিক কাজী। শমিত সোম। ফাহমিদুল ইসলাম। কাজেম শাহ। সুলিভান ব্রাদার্স এবং আরও কতজন! এবং একজন হামজা চৌধুরী।
ছোট্ট বদ্বীপের মৃতপ্রায় ফুটবলে তারা এনেছিলেন সঞ্জীবনী সুধা। কালে কালে দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের মুকুটও জেতেন। বিশ্বকাপ বাছাই পর্বেও ভালো ফল করেন নিয়মিত। কিন্তু চূড়ান্ত পর্বে ওঠা হয়নি কখনো। সেই অসম্ভবকে সম্ভব করেন সেবার জামাল-হামজা-শমিতদের উত্তরসূরিরা
ছোট্ট বদ্বীপের মৃতপ্রায় ফুটবলে তারা এনেছিলেন সঞ্জীবনী সুধা। মরা গাঙে জনপ্রিয়তার ভরা জোয়ার ওঠে আবার। কালে কালে দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের মুকুটও জেতেন। পরের প্রজন্মে এশিয়ান কাপের মূল পর্বে উঠে সেমিফাইনাল পর্যন্ত যায় বাংলাদেশ। বিশ্বকাপ বাছাই পর্বেও ভালো ফল করেন নিয়মিত। কিন্তু চূড়ান্ত পর্বে ওঠা হয়নি কখনো। সেই অসম্ভবকে সম্ভব করেন সেবার জামাল-হামজা-শমিতদের উত্তরসূরিরা। তাদের সময়ে ফিফা র্যাংকিংয়ে ১৮০-১৯০ নম্বরে থাকা বাংলাদেশ কিনা বিশ্বকাপে নাম লিখিয়েছে! আসলেই তো, এমন দিন দেখার আগে কীভাবে চলে যান জামাল ভূঁইয়া!
হ্যাঁ, ফিফা বিশ্বকাপে দল সংখ্যা বাড়ানোর অবদান তাতে রয়েছে নিশ্চিতভাবে। সেই ১৯৩০ সালে ১৩টি দেশ নিয়ে হয় প্রথম বিশ্বকাপ। প্রথম চার আসরে দল সংখ্যা ১৩ থেকে ১৬-এর মধ্যে ঘুরপাক। ১৯৫৪ থেকে স্থায়ীভাবে ১৬ দলের টুর্নামেন্ট। টানা সাত বিশ্বকাপ চলে সেই ফরম্যাটে। ১৯৮২ সাল থেকে ২৪ দলের প্রতিযোগিতা। ১৯৯৮ থেকে ৩২ দলের। ২০২৬ থেকে ৪৮ দলের। ২০৪৬ থেকে ৬৪ দলের। ২০৫৮ থেকে ৭২ দলের।
সেই ৭২ দেশের একটি হিসেবেই ২০৬২ সালে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার যৌথ আয়োজনের বিশ্বকাপে উড়বে বাংলাদেশের পতাকা। সে পতাকায় জামাল ভূঁইয়ার প্রতিচ্ছবি যেমন থাকবে, তেমনি থাকবে হামজা চৌধুরীর জলছাপও।
ডেনমার্ক থেকে জামাল বাংলাদেশে প্রথম যান ২০১১ সালে। কিন্তু আবহাওয়া-পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেননি। দেশের ফুটবলের দুষ্টচক্র তথা সিন্ডিকেটের অসহযোগিতাও ছিল। ভাঙা হৃদয় নিয়ে জামাল ফিরে যান ডেনমার্ক। কিন্তু মনের গহিনে ওড়া ইচ্ছেঘুড়িটা প্রতিনিয়তই আবার ওড়ার স্বপ্ন দেখায় তাকে। ২০১৩ সালে আরেক চেষ্টায় আবার ফেরেন বাংলাদেশে। এবার সব প্রতিকূলতা জয় করে খেলেন জাতীয় দলে। হয়ে ওঠেন বাংলাদেশ ফুটবলের পোস্টার বয়।
রিলে রেসের বাটনের মতো জামালের কাছ থেকে তা চলে যায় হামজার কাছে। কত বড় তারকা তখন ঝাঁকড়া চুলের হামজা! ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের দল লেস্টার সিটিতে খেলেছেন। শুধু খেলেননি, এফএ কাপের মতো মর্যাদাপূর্ণ টুর্নামেন্টও জিতেছেন। ইংল্যান্ডের বয়সভিত্তিক দলেও খেলা হয়ে গেছে তার। এমন একজন কি আর শুধু বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বলে বাংলাদেশ জাতীয় দলে খেলবেন? খেলেছেন তো! আর সেই জোয়ারে কানাডা থেকে শমিত, ইতালি থেকে ফাহমিদুল, যুক্তরাষ্ট্র থেকে রেনান সুলিভান, ডেক্লান সুলিভান; ঝাঁকের কৈ মাছের মতো প্রবাসী ফুটবলার আসা শুরু হয়। এটাই হয়ে যায় বাংলাদেশে মৃতপ্রায় ফুটবলে জনপ্রিয়তার অক্সিজেন।
হ্যাঁ, সংশয় ছিল তখনো। প্রবাসী ফুটবলার কি ফুটবলের স্থায়ী উন্নয়নের সিঁড়ি হতে পারে? কারণ জাতীয় দলের খেলা বছরে ৮-১০টি। আর ফুটবল মূলত প্রতি সপ্তাহের খেলা; ক্লাবকেন্দ্রিক। ক্লাব ফুটবলের জনপ্রিয়তা ফেরানো না গেলে এ উদ্যোগ তো ফানুসের মতো হয়ে যাবে। সাময়িক আগুনের উত্তাপে আকাশে উড়বে ঠিকই কিন্তু সলতে নিভে গেলে তা মাটিতে পড়তেও সময় নেবে না।
কিন্তু সেই সলতেটা আর নেভেনি। বাংলাদেশের ফুটবল-কর্তারা প্রবাসী ফুটবলারদের উন্মাদনা কাজে লাগিয়েছেন। স্পন্সর এনেছেন, কাঠামোগত উন্নয়ন করেছেন। ক্লাবগুলোও আন্তরিকতার সঙ্গে সে মিশনে যোগ দেয়। ফলে বাংলাদেশের প্রাণের খেলা ফুটবলে আবার প্রাণ ফেরে। ফেরে জনপ্রিয়তা। ফেরে সাফল্য। আর ২০৬২ সালে তো সব ছাপিয়ে বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বেই নাম লিখিয়ে ফেলে বাংলাদেশ!
সেটা হতে পারত আরও বছর চারেক আগেই। যখন শেষ চৌকাঠে গিয়ে হোঁচট খায় বাংলাদেশ। প্লে-অফে জিতলেই বিশ্বকাপ; অমন অবস্থায় হেরে যায় ভারতের কাছে। টাইব্রেকারে। সেই দলটির কোচ ছিলেন হামজা। ২০২৫ সালে ফুটবলার হিসেবে বাংলাদেশে গিয়েছিলেন যিনি, তিন দশক পর পূর্ণতা এনে দিয়েছিলেন প্রায় কোচ হিসেবে। একটুর জন্য যে পারেননি, সেজন্য অভিমানে কোচিং পর্যন্ত ছেড়ে দিয়েছেন।
অবশেষে সেই চক্রপূরণ। বাংলাদেশ বিশ্বকাপে। সেই প্লে-অফের বাধা পেরিয়ে। সেই ভারতকে হারিয়ে। নাইবা থাকলেন সেখানে কোচের ভূমিকায় হামজা!
হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে বাইরের সাদা মেঘে ভালোবাসার কালিতে লেখা এসব গল্পই যেন পড়ছিলেন জামাল। তখনই বেজে ওঠে ফোন। ওপাশে হামজা। কাঁদছেন। একে একে কনফারেন্সে যোগ দেন শমিত-কাজেম-তারিক-ফাহমিদুল-সুলিভান ব্রাদার্স এবং আরও অনেকে। সবুজ এই গ্রহে বিভিন্ন প্রান্তে তারা। কোথাও ভোরের প্রদীপ্ত সূর্য, কোথাও বিকালের নরম আলো, কোথাও রাতের চাঁদ-তারার স্নিগ্ধতা। কিন্তু বাংলাদেশ ফুটবলের সেই মাহেন্দ্রক্ষণে সময় যেন থমকে গেছে একবিন্দুতে। বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলছে, এর চেয়ে বড় মুহূর্ত ওই মানুষগুলোর ৫২ কিংবা ৬২ অথবা ৭২ বছরের জীবনে কখনো আসেনি। সবার চোখেই তাই চিকচিক করছে আনন্দাশ্রু।
যে অশ্রুবিন্দুর প্রতিটি ফোঁটায় বাংলাদেশের জন্য, বাংলাদেশ ফুটবলের জন্য ভালোবাসা।
লেখক: ক্রীড়া সাংবাদিক





