বাংলা সাহিত্যের বরপুত্র হয়ে এসেছিলেন হুমায়ূন

শূন্য পকেটে, হলুদ পাঞ্জাবি গায়ে রাজপথ দিয়ে হেঁটে চলেছে হিমু। তার চোখ-মুখে রাজ্যের প্রশান্তি। হঠাৎ এক পুলিশ তাকে আটকাল। সন্দেহভাজন হিসেবে জেরা শুরু করতেই হিমু খুব গম্ভীর মুখে এমন কিছু কথা বলল, পুলিশের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করল। এক সাধারণ ভবঘুরের মুখে নিজের কিংবা স্বজন সম্পর্কে সত্যি কিছু কথা শুনে তিনি হিমুকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হলেন। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের এমন সব অদ্ভুত ও যুক্তিহীন যুক্তির মায়াজালে আটকা পড়েনি এমন পাঠক খুঁজে পাওয়া কঠিন।
বাংলা সাহিত্যের বরপুত্র হুমায়ূন আহমেদ ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনার কুতুবপুরে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ফয়জুর রহমান আহমেদ ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা, মা আয়েশা ফয়েজ। ছোটবেলা থেকেই মেধার স্বাক্ষর রাখা হুমায়ূন আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে উচ্চশিক্ষা শেষ করে শিক্ষকতা শুরু করেন। তবে অচিরেই ল্যাবরেটরির টেস্ট টিউব ছেড়ে তিনি বেছে নেন কলম ও কালি। ১৯৭২ সালে প্রকাশিত তার প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ সাহিত্য অঙ্গনে এক বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি করে।
তার বিশেষত্ব ছিল ভাষার সরলতা। মানুষের আবেগকে খুব সহজ ভাষায় ফুটিয়ে তুলতেন
হুমায়ূন আহমেদের বিশেষত্ব ছিল তার ভাষার সরলতা। তিনি সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক আবেগ, হাস্যরস আর বিষাদকে খুব সহজ ভাষায় ফুটিয়ে তুলতেন। তার হাত ধরেই পাঠক পেয়েছে হলুদ পাঞ্জাবি পরা ভবঘুরে ‘হিমু’, যুক্তিবাদী ‘মিসির আলি’ কিংবা চিরতরুণ ‘শুভ্র’র মতো অমর চরিত্র। সায়েন্স ফিকশন বা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির জগতেও তিনি ছিলেন সাবলীল।
সাহিত্যের গণ্ডি পেরিয়ে হুমায়ূন আহমেদ দাপিয়ে বেড়িয়েছেন নাটক ও চলচ্চিত্রের আঙিনায়। তার রচিত ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের চরিত্র বাকের ভাইয়ের ফাঁসি ঠেকাতে রাজপথে মিছিল বের করেছিল সাধারণ মানুষ— টেলিভিশন নাটকের ইতিহাসে যা এক বিরল ঘটনা। ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘অয়োময়’, ‘আজ রবিবার’ আজও দর্শকদের হৃদয়ে অম্লান। চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবেও ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ‘আগুনের পরশমণি’র মাধ্যমে যুদ্ধের যে করুণগাথা তিনি শুনিয়েছেন, তা দর্শককে অশ্রুসিক্ত করেছে। পরে ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘চন্দ্রকথা’ কিংবা ‘ঘেটুপুত্র কমলা’র মাধ্যমে তিনি ঢাকাই চলচ্চিত্রকে বিশ্বের দরবারে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত মানুষটি ছিলেন একাধারে গীতিকার ও চিত্রশিল্পী। ২০১২ সালের ১৯ জুলাই কোলন ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে নিউ ইয়র্কের একটি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। গাজীপুরের নুহাশপল্লীর লিচুতলায় শায়িত আছেন এই ভাষার জাদুকর।




