গণতন্ত্র, মানবিকতা ও সক্ষমতা অর্জন করতে হবে

স্বাধীনতার পর থেকে আজ অবধি দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রের সংস্কৃতির রূপান্তর হয়েছে; ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে গণমাধ্যম– সবখানেই পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে। কিন্তু আমাদের আমলাতন্ত্রকে কোনো কিছুই স্পর্শ করছে না। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির উত্তরাধিকার বহন করে এখনো নিয়ন্ত্রণ করার মানসিকতা থেকে বেরোতে পারেনি এই প্রতিষ্ঠান ২০৫০
আসতে এখনো অনেক দেরি। আমরা সাধারণত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রতিদিনের বিশ্লেষণেই মগ্ন থাকি। তবে একটু দূরবর্তী বিশ্লেষণ করাটাও জরুরি। আর দূরবর্তী স্বপ্নগুলো বাস্তবায়িত করতে হলে বর্তমানকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করে রাষ্ট্রের কাঠামোয় কিছু কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে হবে। বলা ভালো, রাষ্ট্রকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র অর্জন করতে হবে– জবাবদিহিমূলক গণতন্ত্র, মানবিকতা ও সক্ষমতা।
স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন সময় দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসন এসেছে। সর্বশেষ প্রায় এক-দেড় দশক, বিশেষ করে শেষ দশকটিতে অত্যন্ত কর্তৃত্ববাদী শাসন আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। এই দুঃখজনক অভিজ্ঞতা থেকেই দীর্ঘ মেয়াদে রাষ্ট্রীয় সংস্কারের কথা বিভিন্ন মহল থেকে অনেক দিন ধরে বলা হচ্ছে। এ সংস্কারের ক্ষেত্রে একদিকে যেমন রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক অবয়বের দিকে তাকানো জরুরি, অন্যদিকে রাষ্ট্র ও সমাজের আন্তঃসম্পর্কের দিকেও তাকানো জরুরি। কারণ, ঔপনিবেশিক একটি চরিত্র রাষ্ট্রের সর্বস্তরেই বিদ্যমান। যদিও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলের ‘শাসক-প্রজা’ সংস্কৃতি কাগজে-কলমে বিলুপ্ত হয়েছে; তারপর গণতন্ত্র এসেছে, ভোট এসেছে, আরও নানাবিধ উপাদান যোগ হচ্ছে। কিন্তু রাষ্ট্র শাসন প্রক্রিয়াটা এখনো ঔপনিবেশিক চরিত্র মৌলিকভাবে কাটিয়ে উঠতে পারেনি। আর রাষ্ট্রের এই ঔপনিবেশিক চরিত্রের ধারক-বাহক হচ্ছে আমলাতন্ত্র। ‘শাসক-প্রজা সংস্কৃতি’, অর্থাৎ ওই স্পিরিটটা আমলাতন্ত্রের মধ্যে এখনো সক্রিয়। ফলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে রাষ্ট্রের একটা দূরত্ব সবসময়ই থেকে গেছে। ব্রিটিশরা চলে গেছে ১৯৪৭ সালে, তার পরে পাকিস্তান হলো, তার পরে বাংলাদেশ জন্ম নিল, ’৯০-এর অভ্যুত্থান হলো, সর্বশেষ ’২৪-এ অভ্যুত্থান হলো; কিন্তু আমলাতন্ত্রের মতো রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক চরিত্রগুলোতে বড় ধরনের ধাক্কা আমরা দিতে পারিনি।
ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার হিসেবে প্রাপ্ত যে প্রশাসনিক সংস্কৃতি, তার একটা অবসান ঘটাতে হবে। এ ছাড়া আমলাদের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ এবং বিচার বিভাগকে স্বাধীনভাবে চলার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে
আইনি সংস্কারের কথাও যদি বলি, সেই ঔপনিবেশিক আমলের সিআরপিসি (কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর, ১৮৯৮) কিন্তু রয়ে গেছে। অর্থাৎ এখানেও রয়েছে ঔপনিবেশিক চরিত্রটা। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের শেষদিকে আমলাতন্ত্রের মধ্যে যখন জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুরু হয়েছিল, পাকিস্তান আমলের শেষদিকে, অর্থাৎ বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সংগ্রামের সময়ও আমলাতন্ত্রের মধ্যে ছিল জাতীয়তাবাদী ভাবধারা। ফলে মানবিক রাষ্ট্রে রূপান্তরে জনআকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল। আকাঙ্ক্ষাটা হলো শাসক-প্রজার যে ঔপনিবেশিক সংস্কৃতি, সেটাকে অতিক্রম করে যেতে হবে আমাদের। কিন্তু আমলাতন্ত্রের মধ্যে ঘুরেফিরে সেই সংস্কৃতিটাই ফিরে এলো এবং তা প্রায় স্থায়ী রূপ লাভ করল।
আমলাতন্ত্রের মধ্যে আবার এখন দেখা যাচ্ছে, একটা অংশ মূল ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির উত্তরাধিকার বহন করছে। অ্যাডমিন ক্যাডার হলো আমলাতন্ত্রের মধ্যে সেই ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী। কারণ, তাদের মধ্যে ‘নিয়ন্ত্রণ’ করার প্রবণতা বেশি। যেমন: শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিসংখ্যানসহ প্রতিটি বিভাগ প্রশাসনিক আমলাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বন্দরের মতো একটা বিশেষায়িত সংস্থায়ও রয়েছে তাদের নিয়ন্ত্রণ। তারা প্রবলভাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণটা ধরে রাখছে। এর ফলে প্রশাসনের যে ‘পেশাদারত্ব মনোভাব’ থাকে, তা এখানে গড়ে ওঠা ক্রমেই হয়ে গেছে কঠিন।
২০৫০-এর বাংলাদেশকে যদি আমি চিন্তা করি, অবশ্যই আশা করব, ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার হিসেবে প্রাপ্ত যে প্রশাসনিক সংস্কৃতি, তার একটা অবসান ঘটাতে হবে। এ ছাড়া আমলাদের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ এবং বিচার বিভাগকে স্বাধীনভাবে চলার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। এটা ঠিক যে, ’২৪-এর গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অস্থিরতার পর নির্বাচিত সরকার এলেও কাঙ্ক্ষিত ওই পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না এখনো। অন্তর্বর্তী সরকারের হাতেও সুযোগ ছিল, বড় ধরনের রাজনৈতিক পুঁজি ছিল তাদের। পুঁজিটা ছিল জনসমর্থন, কিন্তু তারা পারেনি। এখন যারা ক্ষমতায় আছে, তারা তো ভোটের মধ্য দিয়েই জনসমর্থন প্রমাণ করে এসেছে; তাদের হাতে সুযোগ ও সময় আছে দুটিই। অন্তর্বর্তী সরকার পারেনি কারণ, যারা দায়িত্বে ছিলেন, তারা আমলাতন্ত্র পরিচালনার বিষয়ে ছিলেন না অভিজ্ঞ ও দক্ষ। তা ছাড়া ঔপনিবেশিক আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে যে প্রস্তুতি ও গভীর উদ্যোগের প্রয়োজন ছিল, তাও ছিল না অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে। অন্তর্বর্তী সরকার বরং প্রথম দিন থেকেই আমলাতন্ত্রকে চালকের আসনে বসিয়ে দিয়েছিল।
২০৫০ সালে বাংলাদেশকে যদি ভিন্ন একটা চিত্রে দেখতে চাই, তাহলে ‘গণতান্ত্রিক, মানবিকতা ও সক্ষমতা’– এই তিনটি চরিত্র অর্জন করতে হবে। এটি অর্জন করতে হলে শাসকশ্রেণিকে পরিবর্তনের মানসিকতা ধারণ করতে হবে। জবাবদিহির জায়গা ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। তাহলে প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কৃতিটাও সংস্কার হবে। এগুলো করার পেছনে আমাদের ডেমোক্রেটিক ডিসকোর্স প্রয়োজন। সিভিল সোসাইটি বা অন্যরা এ বিষয়ে সার্বিকভাবে খুবই একপেশে আলোচনা করে থাকে, প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির বিষয়ে তাদের আলোচনা তুলনামূলক কম। যেসব নিয়মকানুন ও আচারের ভেতর দিয়ে আমাদের প্রশাসনিক সংস্কৃতি এত প্রবলভাবে চেপে বসেছে, সেখানে প্রতিষ্ঠান দুর্বল থেকে যাচ্ছে।
আরেকটা দিক যেটি পরিবর্তন করা খুবই প্রয়োজন, সেটি হলো স্থানীয় সরকারকে দুর্বল করে রাখার সংস্কৃতি। স্থানীয় সরকারকে নখদন্তহীন, আজ্ঞাবহ একটা জুনিয়র অধস্তন কর্মচারীর পর্যায় থেকে তুলে আনতে হবে। তাহলে প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় পর্যায়ের জনমানুষের একটা কাউন্টারভেলিং প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠবে একসময়। ইউনিয়ন ও উপজেলা পরিষদকে কৌশলে দুর্বল করে রাখা হয়। জেলা পরিষদকেও গুরুত্ব দেওয়া দরকার; কিন্তু জেলা পরিষদগুলো মূলত হয়ে গেছে আমলা ও রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীকে পুনর্বাসন করার প্রতিষ্ঠান। স্থানীয় সরকার পর্যায়কে স্বতন্ত্রভাবে সক্ষম করে তুলতে জরুরি সংস্কার প্রয়োজন। এখানে একদিকে যেমন স্থানীয় সরকারগুলোকে আমলাতান্ত্রিক আজ্ঞাবহতার বাস্তবতা থেকে মুক্ত করতে হবে, অন্যদিকে ‘এমপি-রাজ’ তথা সংসদ সদস্যের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করার প্রচেষ্টা থেকেও মুক্ত রাখতে হবে।
গণতন্ত্র শব্দটাতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি, কিন্তু গণতন্ত্র বলতেই শুধু নির্বাচন ছাড়া আর কিছু বুঝি না। গণতন্ত্রের সঙ্গে মানবিক শব্দটা যোগ করতে হবে আমাদের। গণতান্ত্রিক, মানবিক ও দক্ষ– এই তিনটি শব্দের সংযোজন দরকার। গণতান্ত্রিক মানে জবাবদিহি, মানবিক হচ্ছে সংস্কৃতি আর দক্ষতা হচ্ছে রাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতি-কৌশলের সক্ষমতা। এ তিনটি মিলেই গণতন্ত্র শব্দটিকে করতে হবে অর্থবহ।
রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার বিষয়টি ৫০ বছরের বেশি সময় উপেক্ষিত হয়ে আছে। অথচ এখানে মনোযোগ দরকার। সক্ষমতা তৈরির অন্যতম শর্ত হলো কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন। প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। শুধু শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোটা নয়; জাতির শিক্ষাচিন্তাও হতে হবে সঠিক। শুধু শিক্ষা কমিশন গঠন করে, নামমাত্র দায়সারা রিপোর্টের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।
সক্ষমতার দিক থেকে আমাদের ঘাটতির জায়গাটা বুঝতে গণপরিবহনের দিকে তাকালেই হয়। এই গণপরিবহনকে এখানে সবচেয়ে বেশি অবমূল্যায়ন করা হয়– নীতিনির্ধারণী জায়গা থেকে। পৃথিবীর সব দেশে যারা ফাংশনাল, সেখানে ব্যক্তিগত গাড়ি আছে; কিন্তু গণপরিবহনকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফাংশনিং ও সক্ষম রাষ্ট্র হতে হলে গণপরিবহন হলো অন্যতম ফাউন্ডেশন। ইউরোপের এত কিছু হতো না গণপরিবহন না হলে, নারীদেরও নির্ভয়ে চলাচল হতো না গণপরিবহন না হলে। এই যে মোবিলিটি, এগুলো হতো না গণপরিবহন না হলে। অন্যদিকে, আমেরিকায় বৈষম্য বেশি। তার কারণ, গণপরিবহনের একটা বড় ঘাটতি আছে দেশটিতে। বিশ্বের যে দেশগুলো উন্নয়নশীল, সেখানেও গণপরিবহন আলাদা গুরুত্ব পায়। আমাদের রাজনৈতিক নেতারা সবসময় বলেন, দেশ মালয়েশিয়া হয়ে যাবে, সিঙ্গাপুর হয়ে যাবে; এটি কিন্তু ‘ফাংশনাল রাষ্ট্র বা গণতান্ত্রিক’ অর্থে বলেন না। মালয়েশিয়া-সিঙ্গাপুরে কিছু শাইনিং বিল্ডিং আছে, সেগুলো দেখার কথাই বলে তারা। ফাংশনাল রাষ্ট্রের বিষয়ে তারা গুরুত্ব দেয় না। ওই দেশগুলোতে অ্যান্টিকরাপশন কমিশন খুব শক্তিশালীভাবে কাজ করে। এ বিষয়েও তারা নীরবই থাকে। তারা শুধু বলবেন, ওখানে শাইনিং বিল্ডিং আছে, এখানেও একটা শাইনিং বিল্ডিং বানাতে হবে। যাই হোক, গণপরিবহনে ২০৫০ নাগাদ আমাদের এমন সক্ষমতা অর্জন করতে হবে যে, শুধু ঢাকা-চট্টগ্রাম থেকে নয়, কুড়িগ্রাম থেকে একজন তরুণী নির্দ্বিধায়-নির্ভয়ে ঢাকায় কোনো একটি পরীক্ষায় অংশ নিতে একাই চলে আসবেন। এটি গতিশীলতা, কারণ আমরা যখন গণতন্ত্র চাই, তার দৃশ্যমান ফলাফলও আশা করব। আর এই ফলাফলটা কোনো প্রাচুর্যের কামনা নয়; একটা সহনশীল, স্বস্তির গতিময় জীবন।
আমাদের যে গণতান্ত্রিক জবাবদিহিমূলক, মানবিক ও সক্ষম রাষ্ট্র দরকার, ২০৫০ নাগাদ হয়তো এগুলো অর্জিত হয়েও যেতে পারে। এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন সরকারগুলোকে আন্তরিক হতে হবে। তা ছাড়া আমাদের আকাঙ্ক্ষার জগৎটাকেই পরিশীলিত করার দরকার আছে, যাকে সুশৃঙ্খল সাফল্যের দিকে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনে।
লেখক: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা





