নারীর সম্মানে নবী ও সাহাবাযুগের অনন্য দৃষ্টান্ত

প্রতীকী ছবি
মানবসভ্যতার ইতিহাসে নারীর মর্যাদা সব যুগে সমান ছিল না। পৃথিবীর বহু জাতি ও সভ্যতায় নারীকে কখনো সম্পত্তি, কখনো ভোগের বস্তু, আবার কখনো সামাজিক বোঝা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ইসলাম আবির্ভূত হওয়ার পূর্বে আরব সমাজেও নারীরা নানা ধরনের বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার হতো। কন্যাসন্তান জন্মকে লজ্জার কারণ মনে করা হতো, সম্পদের উত্তরাধিকারে নারীর কোনো অংশ ছিল না, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে নারীদের মানুষ হিসেবেও পূর্ণ মর্যাদা দেওয়া হতো না। এমন এক অন্ধকার যুগে ইসলাম নারীকে সম্মান, অধিকার ও মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করে মানব ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতিফলন দেখা যায় রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের জীবনাদর্শে।
পবিত্র কোরআন নারী-পুরুষ উভয়কেই মানবমর্যাদার ক্ষেত্রে সমান ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করেছে। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ
‘নারীদের জন্য ন্যায়সংগত অধিকার রয়েছে, যেমন তাদের ওপর দায়িত্ব রয়েছে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২২৮)
অন্য আয়াতে বলা হয়েছে,
إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ
‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত সে, যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ১৩)
এ আয়াতগুলো স্পষ্ট করে যে, ইসলামে মর্যাদার মানদণ্ড লিঙ্গ নয়; বরং ঈমান, তাকওয়া ও সৎকর্ম।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনে নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। তাঁর প্রিয় কন্যা ফাতিমা (রা.) যখন তাঁর কাছে আসতেন, তিনি দাঁড়িয়ে যেতেন, তাকে স্বাগত জানাতেন এবং নিজের স্থানে বসতে দিতেন। আয়েশা (রা.) বলেছেন, ‘ফাতিমা (রা.) যখন নবী (সা.)-এর কাছে আসতেন, তিনি তার জন্য দাঁড়াতেন, তাকে চুম্বন করতেন এবং নিজের জায়গায় বসাতেন।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৫২১৭)
সেই সমাজে, যেখানে কন্যাসন্তানকে অপমানের প্রতীক মনে করা হতো, সেখানে একজন রাষ্ট্রনেতা, নবী এবং সর্বোচ্চ সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই আচরণ ছিল এক যুগান্তকারী শিক্ষা।
নারীদের সঙ্গে সদাচরণের বিষয়ে তিনি উম্মতকে বিশেষভাবে উপদেশ দিয়েছেন। বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি বলেন,
اسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ خَيْرًا
‘তোমরা নারীদের সঙ্গে সদাচরণ করো।’ (বুখারি, হাদিস : ৫১৮৬)
এ নির্দেশনা কোনো বিশেষ পরিস্থিতির জন্য নয়; বরং মুসলিম পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের একটি স্থায়ী নীতি।
রাসুলুল্লাহ (সা.) শুধু উপদেশই দেননি, বরং নিজের জীবনেও তা বাস্তবায়ন করেছেন। আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি ঘরে কী করতেন। তিনি উত্তর দেন, ‘তিনি পরিবারের কাজে সহযোগিতা করতেন। আর নামাজের সময় হলে নামাজে চলে যেতেন।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৭৬)
এ হাদিস পরিবারে নারীদের প্রতি সহযোগিতা, সম্মান ও দায়িত্ববোধের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
নারীর জ্ঞানচর্চার অধিকার প্রতিষ্ঠাতেও নবী (সা.) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। একদল নারী তাঁর কাছে এসে বলেন, পুরুষরা আপনার সময়ের বেশির ভাগ অংশ পেয়ে যায়, আমাদের জন্যও একটি দিন নির্ধারণ করুন। তখন তিনি তাদের জন্য আলাদা সময় নির্ধারণ করেন এবং শিক্ষা প্রদান করেন। (বুখারি, হাদিস : ১০১)
এ ঘটনা প্রমাণ করে যে, ইসলাম নারীশিক্ষাকে শুধু অনুমোদনই দেয়নি; বরং তার জন্য বাস্তব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
সাহাবায়ে কেরামের জীবনেও নারীর প্রতি
সম্মানের অসংখ্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রয়েছে। খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর একটি
ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি একবার মোহরের পরিমাণ সীমিত করার প্রস্তাব দিলে
একজন নারী কোরআনের আয়াত উদ্ধৃত করে তাঁর মতের বিরোধিতা করেন। তখন উমর (রা.)
প্রকাশ্যে বললেন, ‘নারীটি সঠিক বলেছে, আর উমর ভুল করেছে।’
(তাফসিরে কুরতুবি, সুরা নিসা, ২০ নং আয়াতের ব্যাখ্যা)
একজন রাষ্ট্রপ্রধানের পক্ষ থেকে একজন সাধারণ নারীর মতামত গ্রহণ করার এই ঘটনা ইসলামের ন্যায়পরায়ণতা ও নারীর মর্যাদার এক অনন্য উদাহরণ।
উমর (রা.) আরও বলেছেন, ইসলাম আগমনের আগে আমরা নারীদের কোনো গুরুত্বই দিতাম না। কিন্তু আল্লাহ যখন তাদের সম্পর্কে বিধান নাজিল করলেন এবং তাদের জন্য অধিকার নির্ধারণ করলেন, তখন আমরা বুঝলাম তাদেরও অধিকার রয়েছে।’ (বুখারি, হাদিস : ৪৯১৩)
এ বক্তব্য ইসলামের মাধ্যমে আরব সমাজে সংঘটিত মানসিক ও সামাজিক বিপ্লবের সাক্ষ্য বহন করে।
আবু বকর (রা.)-এর জীবনেও মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পরও তিনি এক বৃদ্ধ অন্ধ নারীর ঘরে গিয়ে তার গৃহস্থালির কাজ করে দিতেন। পরবর্তীতে উমর (রা.) এ ঘটনা জানতে পেরে বিস্মিত হন। (ইবন সা'দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা)
এ ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে যে, সাহাবায়ে কেরাম নারীদের প্রতি সম্মানকে শুধু তাত্ত্বিক আদর্শ হিসেবে নয়, বরং বাস্তব জীবনের দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
ইসলামের ইতিহাসে নারী ছিলেন জ্ঞানচর্চা, হাদিস বর্ণনা, সমাজসেবা এবং জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের সক্রিয় অংশীদার। আয়েশা (রা.) একাই দুই হাজারের বেশি হাদিস বর্ণনা করেছেন। ইমাম যাহাবি (রহ.) উল্লেখ করেছেন যে, অসংখ্য সাহাবি ও তাবিঈ তাঁর কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করেছেন। (সিয়ারু আ'লামিন নুবালা)
নারীর সম্মান রক্ষার ক্ষেত্রে ইসলাম এমন ভারসাম্যপূর্ণ নীতি দিয়েছে, যেখানে নারীকে অবহেলাও করা হয়নি, আবার তাকে পণ্যেও পরিণত করা হয়নি। বরং তাকে মা, কন্যা, স্ত্রী এবং সমাজের সম্মানিত সদস্য হিসেবে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ
‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার পরিবারের প্রতি উত্তম।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৮৯৫)
আজকের বিশ্বে নারীর অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে নানা আলোচনা হয়। কিন্তু প্রায়ই দেখা যায়, একদিকে নারীর প্রতি বৈষম্য, অন্যদিকে তাকে ভোগবাদী সংস্কৃতির পণ্যে পরিণত করার প্রবণতা সমানভাবে বিদ্যমান। এমন সময়ে নবী (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের জীবন আমাদের সামনে এমন এক আদর্শ উপস্থাপন করে, যেখানে নারীর মর্যাদা, নিরাপত্তা, অধিকার ও সম্মান পরস্পরবিরোধী নয়; বরং পরস্পরের পরিপূরক।
নারীর প্রতি সম্মান কেবল একটি সামাজিক সৌজন্য নয়; এটি ইসলামী চরিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যে সমাজ নারীদের যথাযথ সম্মান দেয়, সে সমাজই প্রকৃত অর্থে মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক এবং কল্যাণমুখী সমাজে পরিণত হতে পারে। নবী (সা.) ও সাহাবাযুগের ইতিহাস আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক


