যেসব কথা ও কাজে ঈমান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়
- শরীয়তকে তুচ্ছ করা কতটা ভয়ংকর
- দ্বীনকে তুচ্ছ করার ভয়াবহ পরিণতি
- ঈমানের জন্য বিপজ্জনক কিছু কথা ও কাজ

প্রতীকী ছবি
মানুষ সাধারণত মনে করে, ঈমান নষ্ট হয় কেবল আল্লাহকে অস্বীকার করলে, মূর্তি পূজা করলে বা প্রকাশ্য কুফরি করলে। কিন্তু ইসলামী আকীদার আলোচনায় এমন কিছু বিষয় রয়েছে, যেগুলো অনেক সময় মানুষ আবেগ, রাগ, হাস্যরস বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে করলেও; তা ঈমানের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। বিশেষ করে আল্লাহর বিধান, ইসলামের নিদর্শন, পবিত্র কোরআনের আইন কিংবা শরীয়তের কোনো অংশকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা এমন এক ভয়ংকর বিষয়, যা মানুষকে নিজের অজান্তেই ঈমানহারা করে দিতে পারে।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা প্রায়ই দেখি, কোনো অপরাধ বা সামাজিক সংকট ঘটলেই কিছু মুসলমান লিখছেন, ‘শরীয়ত দিয়ে এসব বন্ধ হবে না’। কেউ বলছেন ‘এই আইন আধুনিক যুগে অচল’। আবার কেউ মন্তব্য করছেন ‘এসব বিধান বাস্তবসম্মত নয়’ ইত্যাদি। যা কেউ হয়তো আবেগ থেকে বলছেন। কেউ অজ্ঞতা থেকে করছেন। আবার কেউ সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার আশায় এসব কথা বলে যাচ্ছেন। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে এসব বক্তব্য কতটা ভয়াবহ, সে বিষয়ে অনেকেই সচেতন নন।
ইসলামে শরীয়ত আল্লাহপ্রদত্ত পূর্ণাঙ্গ একটি জীবনব্যবস্থা। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَأَنزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ ... فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ
‘আমি আপনার প্রতি সত্যসহ কিতাব নাযিল করেছি... অতএব আপনি তাদের মধ্যে আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তদনুযায়ী বিচার করুন এবং সত্য আসার পর তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত : ৪৮)
একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য কী, সেটিও পবিত্র কোরআন স্পষ্ট করে দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
إِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِينَ ... أَن يَقُولُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا
‘মুমিনদের কথা তো কেবল এই যে, যখন তাদেরকে আল্লাহ ও তার রাসুলের দিকে আহ্বান করা হয়, যাতে তিনি তাদের মধ্যে ফয়সালা করেন, তখন তারা বলে, আমরা শুনলাম এবং মেনে নিলাম।’ (সুরা নূর, আয়াত : ৫১)
এ কারণেই ইসলামী আকীদায় বিশেষজ্ঞ আলেমগণ বলেছেন, শরীয়তের কোনো বিধানকে অবজ্ঞা করা, উপহাস করা বা অপ্রয়োজনীয় মনে করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। ইমাম নববী (রহ.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ, তার রাসুল, কোরআন, দ্বীনের কোনো বিধান বা ইসলামের কোনো নিদর্শনকে উপহাস করবে, সে সর্বসম্মতিক্রমে কাফির হয়ে যাবে।’ (রাওদাতুত তালিবীন, ইমাম নববী (রহ.), ১০/৬৪)
পবিত্র কোরআনেও এ বিষয়ে কঠোর সতর্কবার্তা এসেছে। তাবুক যুদ্ধের সময় কিছু লোক দ্বীন নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করেছিল। তখন আল্লাহ তাআলা আয়াত নাযিল করেছেন,
قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُم بَعْدَ إِيمَانِكُمْ
‘বলুন, তোমরা কি আল্লাহ, তার আয়াত ও তার রাসুলকে নিয়ে ঠাট্টা করছিলে? অজুহাত দিও না। তোমরা ঈমান আনার পর কুফরি করেছ।’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ৬৫-৬৬)
এই আয়াতের তাফসিরে ইবনে কাসির (রহ.) বলেছেন, এখানে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, দ্বীনের কোনো বিষয় নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা কুফরি। (তাফসির ইবনে কাসির, সূরা তাওবা ৬৫-৬৬ নং আয়াতের ব্যাখ্যা)
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে এই যে, কোনো মুসলমান যদি নিজের দুর্বলতার কারণে কোনো ফরজ আমল পালন করতে না পারে, তাহলে সে গুনাহগার হবে; কিন্তু সে যদি সেই বিধানকে সত্য মনে করে এবং নিজের ভুল স্বীকার করে, তাহলে তার ঈমান নষ্ট হয় না। কিন্তু কেউ যদি আল্লাহর বিধানকেই অপ্রয়োজনীয়, পশ্চাৎপদ বা অকার্যকর বলে তুচ্ছ করে, তাহলে বিষয়টি শুধুমাত্র গুনাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা আকীদাগত সংকটে রূপ নেয়।
আজকের যুগে এই বিপদ সবচেয়ে বেশি ছড়াচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে। আগে মানুষ সীমিত পরিসরে কথা বলত, এখন একটি পোস্ট মুহূর্তেই হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। অনেকেই ভাইরাল হওয়ার জন্য, বুদ্ধিজীবী সাজতে কিংবা তথাকথিত প্রগতিশীলতার পরিচয় দিতে গিয়ে দ্বীনের ব্যাপারে এমনসব মন্তব্য করে থাকেন। যার ভয়াবহতা হয়তো তিনি নিজেও বোঝেন না।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
إِنَّ الْعَبْدَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ مَا يَتَبَيَّنُ فِيهَا، يَزِلُّ بِهَا فِي النَّارِ أَبْعَدَ مَا بَيْنَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ
‘বান্দা এমন একটি কথা বলে ফেলে, যার পরিণতি সে চিন্তা করে না। অথচ সেই কথার কারণে সে জাহান্নামের এমন গভীরে পতিত হয়, যা পূর্ব ও পশ্চিমের দূরত্বের চেয়েও বেশি।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৪৭৭)
ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেছেন, ‘অনেক সময় একজন মানুষ একটি মাত্র শব্দ উচ্চারণ করে, যা তাকে বহু দূরে নিক্ষেপ করে দেয়। অথচ সে বিষয়টিকে গুরুত্বই দেয় না।’ (আল-জাওয়াবুল কাফি, পৃ. ১৩১)
এ কারণেই একজন মুমিনের জন্য জিহ্বা; আজকের প্রেক্ষিতে কিবোর্ডের হেফাজত অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে দ্বীন, আল্লাহর বিধান, হিজাব, সুন্নাহ, শরীয়ত কিংবা ইসলামী আইন সম্পর্কে মন্তব্য করার বা লিখার আগে গভীরভাবে চিন্তা করা উচিত। কোনো বিষয়ে না জানলে নীরব থাকা নিরাপদ।
যদি কেউ অতীতে এমন কোনো কথা বলে ফেলেন, তাহলে তার জন্য হতাশ হওয়ার কারণ নেই। ইসলামে তাওবার দরজা খোলা আছে। তবে শর্ত হলো, ভুল বুঝতে হবে, সেই বক্তব্য থেকে ফিরে আসতে হবে এবং আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাইতে হবে।
মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَّصُوحًا
‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর কাছে খাঁটি তাওবা কর।’ (সুরা তাহরীম, আয়াত : ৮)
মুমিন বান্দারা আল্লাহর বিধানের সামনে নিজের মতামতকে বড় মনে করে না। তার নীতি হলো, ‘সামি‘না ওয়া আতা‘না’ অর্থাৎ ‘আমরা শুনলাম এবং মান্য করলাম।’ শরীয়তের সব হিকমত হয়তো মানুষ সবসময় বুঝতে পারবে না, কিন্তু আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসই তাকে বিনয়ী রাখে।
তাই আমাদের সচেতনতা প্রয়োজন। কারণ অনেক মানুষ গুনাহ করে ঈমান হারায় না, বরং দ্বীনকে তুচ্ছ করতে গিয়েই নিজের অজান্তে ঈমান হারিয়ে ফেলে। আল্লাহ তাআলা আমাদের জিহ্বা, কলম ও কিবোর্ডকে হেফাজত করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক




