কোরআনের বাণী
যেভাবে মানুষ শয়তানের ফাঁদে আটকে যায়

প্রতীকী ছবি
কোরআনুল কারিমের বার্তা
সুরা : নূর, আয়াত : ২১
بِسْمِ ٱللَّٰهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَتَّبِعُوۡا خُطُوٰتِ الشَّیۡطٰنِ ؕ وَ مَنۡ یَّتَّبِعۡ خُطُوٰتِ الشَّیۡطٰنِ فَاِنَّهٗ یَاۡمُرُ بِالۡفَحۡشَآءِ وَ الۡمُنۡكَرِ ؕ وَ لَوۡ لَا فَضۡلُ اللّٰهِ عَلَیۡكُمۡ وَ رَحۡمَتُهٗ مَا زَكٰی مِنۡكُمۡ مِّنۡ اَحَدٍ اَبَدًا ۙ وَّ لٰكِنَّ اللّٰهَ یُزَكِّیۡ مَنۡ یَّشَآءُ ؕ وَ اللّٰهُ سَمِیۡعٌ عَلِیۡمٌ
২১. হে মুমিনগণ! তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। আর কেউ শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করলে শয়তান তো অশ্লীলতা ও মন্দ কাজেরই নির্দেশ দেয়। আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকলে তোমাদের কেউই কখনো পবিত্র হতে পারতে না, তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছে পবিত্র করেন এবং আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা
পবিত্র কোরআনের সুরা আন-নূরের এই আয়াতে মহান আল্লাহ মুমিনদের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দিয়েছেন। মানুষকে শুধু বড় গুনাহ থেকেই নয়, বরং গুনাহের দিকে নিয়ে যায় এমন প্রতিটি ছোট পদক্ষেপ থেকেও দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আয়াতে ‘তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না।’ এখানে পদাঙ্ক শব্দটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। শয়তান মানুষকে সাধারণত একবারে বড় অপরাধে ফেলে না; বরং ধাপে ধাপে তাকে বিভ্রান্ত করে। প্রথমে মনে সন্দেহ সৃষ্টি করে, তারপর ছোটখাটো অবাধ্যতায় উৎসাহ দেয়, এরপর ধীরে ধীরে বড় গুনাহে জড়িয়ে ফেলে।
ইবনে কাসির (রহ.) বলেছেন, শয়তানের পদাঙ্ক বলতে এমন সব পথ ও মাধ্যমকে বোঝানো হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত মানুষকে আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে নিয়ে যায়। (তাফসির ইবনে কাসির)
বর্তমান যুগে এই আয়াতের বাস্তবতা আরও স্পষ্ট। অশ্লীলতা, মিথ্যা, পর্নোগ্রাফি, হারাম সম্পর্ক, সুদ, অহংকার কিংবা বিদ্বেষ হঠাৎ করে মানুষের জীবনে প্রবেশ করে না। এগুলোর সূচনা হয় ছোট কিছু ছাড় দিয়ে। একটি অনিয়ন্ত্রিত দৃষ্টি, একটি অশালীন কনটেন্ট, একটি মিথ্যা কথা, একটি গোপন সম্পর্ক কিংবা একটি সন্দেহজনক আয় থেকে ধীরে ধীরে মানুষের অন্তর কলুষিত হতে থাকে। এভাবেই শয়তান মানুষকে ধাপে ধাপে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়।
এরপর আল্লাহ বলেছেন, ‘শয়তান তো অশ্লীলতা ও মন্দ কাজেরই নির্দেশ দেয়।’ আয়াতে ‘ফাহশা’ শব্দটি এমন সব কাজের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে, যা নৈতিকতা ও লজ্জাবোধ ধ্বংস করে দেয়। আর ‘মুনকার’ হলো এমন কাজ, যা বিবেক, শরিয়ত ও সুস্থ সমাজ প্রত্যাখ্যান করে। শয়তানের লক্ষ্য শুধু মানুষকে একটি গুনাহে জড়ানো নয়; বরং মানুষের ভেতর থেকে পবিত্রতা, লজ্জা ও ইমানি সংবেদনশীলতা ধ্বংস করে দেওয়া।
এই আয়াতের সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক অংশ হলো, ‘আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকলে তোমাদের কেউই কখনো পবিত্র হতে পারতে না।’ অর্থাৎ মানুষের নিজের শক্তি বা ইবাদতই তাকে সম্পূর্ণ পবিত্র রাখতে যথেষ্ট নয়। মানুষ দুর্বল, তার নফস দুর্বল, পরিবেশ দুর্বল করে দেয়, শয়তান প্রতিনিয়ত ধোঁকা দেয়। তাই মানুষ আল্লাহর রহমত ছাড়া পাপমুক্ত থাকতে পারে না।
হাসান বসরি (রহ.) বলতেন, ‘যদি আল্লাহ তার বান্দাকে আড়াল না করতেন এবং ক্ষমা না করতেন, তবে কোনো মানুষই নিরাপদ থাকতে পারত না।’
আল্লাহ যাকে চান, তাকেই পবিত্র করেন। তবে এর অর্থ এই নয় যে মানুষ চেষ্টা করবে না। বরং বান্দার দায়িত্ব হলো গুনাহের পথ থেকে দূরে থাকা, তওবা করা, নিজের অন্তরকে পরিশুদ্ধ রাখার চেষ্টা করা এবং সর্বদা আল্লাহর সাহায্য কামনা করা। যখন মানুষ আন্তরিকভাবে পবিত্রতা চায়, তখন আল্লাহ তার জন্য হেদায়াতের দরজা খুলে দেন।
আয়াতের শেষাংশে মহান আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’ অর্থাৎ মানুষের প্রকাশ্য ও গোপন সব কথা, সব ইচ্ছা, সব দুর্বলতা এবং অন্তরের সব প্রবণতা আল্লাহ জানেন। কেউ যদি গোপনে গুনাহের দিকে এগোয়, আল্লাহ তা জানেন। আবার কেউ যদি অন্তরে পবিত্রতার জন্য কাঁদে, সেটিও আল্লাহ শোনেন।




