কোরআনের বাণী
সংযমী চলন ও নম্র কণ্ঠে কোরআনিক নির্দেশনা

প্রতীকী ছবি
কোরআনুল কারিমের বার্তা
সুরা : লোকমান, আয়াত : ১৯
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে
১৯. আর তুমি
তোমার চলার ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন কর এবং তোমার কণ্ঠস্বর নীচু করো;
নিশ্চয় সুরের মধ্যে গর্দভের সুরই সবচেয়ে
অপ্ৰীতিকর।
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা
পবিত্র কোরআনের সুরা লোকমানের এই আয়াতটিতে লোকমান (আ.) প্রিয় পুত্রকে দেয়া উপদেশের ষষ্ঠ উপদেশ হিসেবে বলছেন যে, মানুষের চলাফেরা ও কথাবার্তার ভদ্রতা ও সংযম রক্ষা করে চলতে হবে।
আয়াতটির গভীরে গেলে দেখা যায়, এটি কেবল বাহ্যিক আচরণের নির্দেশনা নয়; বরং মানুষের অন্তর্গত চরিত্র, ব্যক্তিত্ব ও আত্মসংযমের এক পরিমিত রূপ গড়ে তোলার শিক্ষা।
প্রথমেই বলা হয়েছে, ‘তোমার চলার ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করো’ এর অর্থ হলো, চলাফেরায় এমন এক ভারসাম্য বজায় রাখা, যেখানে অহংকার নেই, আবার দুর্বলতাও নেই। কেউ যদি খুব দম্ভভরে হাঁটে, বুক ফুলিয়ে, মাথা উঁচু করে; তবে তা তার ভেতরের অহংকারকে প্রকাশ করে।
আবার কেউ যদি অতিরিক্ত নত হয়ে, দুর্বল হয়ে হাঁটে, সেটিও ব্যক্তিত্বের ভারসাম্যহীনতার লক্ষণ। ইসলাম চায় একজন মানুষ যেন আত্মমর্যাদাবোধ নিয়ে, কিন্তু বিনয়ী ভঙ্গিতে চলাফেরা করে। এই ‘মধ্যপন্থা’ আসলে জীবনের সর্বক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। খাওয়া, ব্যয়, কথা বলা, এমনকি চিন্তাধারাতেও।
এরপর বলা হয়েছে, ‘তোমার কণ্ঠস্বর নীচু করো’ এটি মানুষের কথাবার্তার শিষ্টাচার শেখায়। উচ্চস্বরে কথা বলা, চিৎকার করা বা অপ্রয়োজনীয়ভাবে কণ্ঠ উঁচু করা সাধারণত রূঢ়তা, অস্থিরতা ও অশিক্ষার পরিচায়ক। একজন পরিপক্ব ও সুশিক্ষিত মানুষ প্রয়োজন অনুযায়ী, নম্র ও সংযত কণ্ঠে কথা বলে। এখানে কণ্ঠস্বর নিচু রাখার অর্থ এই নয় যে একেবারে ফিসফিস করে কথা বলতে হবে; বরং পরিস্থিতি অনুযায়ী শালীন ও সহনীয় স্বর বজায় রাখা উচিত।
আয়াতের শেষে অত্যন্ত প্রভাবশালী একটি উপমা এসেছে। ‘নিশ্চয় সুরের মধ্যে গাধার সুরই সবচেয়ে অপ্রীতিকর’ এই উপমার মাধ্যমে পবিত্র কুরআন মানুষের কাছে একটি চিত্র তুলে ধরে। যে শব্দ কানে লাগে, বিরক্তিকর এবং অশোভন, তা যেন মানুষের কণ্ঠে না আসে। এখানে গাধার ডাককে উদাহরণ হিসেবে আনা হয়েছে তার কর্কশতা ও অমাধুর্যের কারণে। অর্থাৎ, কেউ যদি অকারণে চিৎকার করে বা কর্কশভাবে কথা বলে, তবে তা শুধু অন্যদের বিরক্তই করে না, বরং নিজের ব্যক্তিত্বকেও ছোট করে ফেলে।
এই আয়াত আমাদের শেখায় যে, একজন মুমিনের সৌন্দর্য শুধু তার ইবাদতে নয়, বরং তার আচার-আচরণ, চলাফেরা এবং কথাবার্তার মধ্যেও প্রকাশ পায়। তার পদক্ষেপে থাকে স্থিরতা, তার কণ্ঠে থাকে মাধুর্য, আর তার ব্যক্তিত্বে ফুটে ওঠে সংযম ও শালীনতা।



