সমালোচনার ইসলামী নীতি

প্রতীকী ছবি
মানুষ সামাজিক জীব। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা কর্মকাণ্ডে ভুল-ত্রুটি, সীমাবদ্ধতা ও বিচ্যুতি দেখা দিতেই পারে। এসব ভুল সংশোধনের জন্য সমালোচনা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু সমালোচনা তখনই কল্যাণকর হয়, যখন তা সত্য, ন্যায়, সদিচ্ছা ও সংশোধনের উদ্দেশ্যে করা হয়। অন্যদিকে বিদ্বেষ, অপমান, হেয়প্রতিপন্ন করা বা ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার উদ্দেশ্যে করা সমালোচনা ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রাজনৈতিক মঞ্চ এবং গণমাধ্যমে সমালোচনার নামে কটূক্তি, বিদ্রূপ, চরিত্রহনন ও অপপ্রচারের প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এমন বাস্তবতায় ইসলামের সমালোচনাবিষয়ক নীতিমালা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।
ইসলাম সত্য গোপন করা বা অন্যায় দেখে নীরব থাকার শিক্ষা দেয় না। বরং অন্যায় সংশোধনকে ঈমানের দাবি হিসেবে বিবেচনা করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ، وَذَلِكَ أَضْعَفُ الْإِيمَانِ
‘তোমাদের কেউ কোনো অন্যায় দেখলে সে যেন তা হাত দিয়ে প্রতিরোধ করে। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে মুখের মাধ্যমে; আর তাও সম্ভব না হলে অন্তর দিয়ে ঘৃণা করে। আর এটিই ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।’ (মুসলিম, হাদিস : ৪৯)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, অন্যায়ের সমালোচনা ও সংশোধন ইসলামের একটি মৌলিক শিক্ষা। তবে সেই সমালোচনারও কিছু নৈতিক সীমারেখা রয়েছে।
ইসলামের প্রথম নীতি হলো, সমালোচনা অবশ্যই সত্য ও প্রমাণভিত্তিক হতে হবে। গুজব, অনুমান বা সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে অভিযুক্ত করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا
‘হে মুমিনগণ! যদি কোনো পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে নাও।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ৬)
বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে কোনো তথ্য যাচাই না করে প্রচার করা বা সমালোচনার নামে মিথ্যা অভিযোগ ছড়িয়ে দেওয়া ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে দেখা যাচ্ছে।
দ্বিতীয় নীতি হলো, সমালোচনার উদ্দেশ্য হতে হবে সংশোধন করা। কাউকে অপমান করার মানসিকতা নিয়ে সমালোচনার সুযোগ নেই। পবিত্র কোরআন মুমিনদের পারস্পরিক সম্পর্ককে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
‘নিশ্চয়ই মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ১০)
ভাইয়ের ভুল ধরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য যেমন তাকে ছোট করা নয়, বরং তার কল্যাণ কামনা করা, তেমনি ইসলামী সমালোচনার লক্ষ্যও সংশোধন ও কল্যাণ।
ইমাম শাফিঈ (রহ.) একটি বিখ্যাত উক্তিতে বলেছেন,
مَنْ وَعَظَ أَخَاهُ سِرًّا فَقَدْ نَصَحَهُ وَزَانَهُ، وَمَنْ وَعَظَهُ عَلَانِيَةً فَقَدْ فَضَحَهُ وَشَانَهُ
‘যে ব্যক্তি তার ভাইকে গোপনে উপদেশ দেয়, সে তাকে সত্যিকারের কল্যাণকামিতা করেছে এবং সম্মানিত করেছে। আর যে প্রকাশ্যে উপদেশ দেয়, সে তাকে অপদস্থ করেছে ও তার মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেছে।’ (শু‘আবুল ঈমান, আল-বায়হাকি; সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, আয-যাহাবি)
যদিও সব ক্ষেত্রে গোপন সমালোচনা সম্ভব নয়, তবে এ বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে, ইসলামে মানুষের মর্যাদা রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয় নীতি হলো, সমালোচনায় ন্যায়বিচার বজায় রাখা। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতি বিরাগ থাকলেও তাদের ভালো দিক অস্বীকার করা বা অন্যায়ভাবে দোষারোপ করা ইসলামে অনুমোদিত নয়। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَى أَلَّا تَعْدِلُوا ۚ اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى
‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে ন্যায়বিচার ত্যাগ করতে প্ররোচিত না করে। তোমরা ন্যায়বিচার করো, এটাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত : ৮)
এই আয়াত সমালোচনার ক্ষেত্রে এক অনন্য নৈতিক মানদণ্ড নির্ধারণ করে। ইসলামে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ন্যায্যতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
চতুর্থ নীতি হলো, সমালোচনার ভাষা হতে হবে শালীন ও মার্জিত। আল্লাহ তাআলা মুসা (আ.) ও হারুন (আ.)-কে ফিরাউনের মতো অত্যাচারীর কাছেও কোমল ভাষায় কথা বলার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
فَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَيِّنًا
‘তোমরা তার সঙ্গে নম্র ভাষায় কথা বলো।’ (সুরা ত্ব-হা,আয়াত : ৪৪)
যদি ফিরাউনের মতো ব্যক্তির সঙ্গেও নম্র ভাষায় কথা বলার নির্দেশ দেওয়া হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে শালীনতা ও ভদ্রতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা সহজেই অনুমেয়।
ইসলাম সমালোচনার নামে উপহাস, বিদ্রূপ ও চরিত্রহননকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِنْ قَوْمٍ
‘হে মুমিনগণ! কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য কোনো সম্প্রদায়কে উপহাস না করে।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ১১)
একই আয়াতে পরনিন্দা, অপমানজনক উপাধি এবং মানুষের সম্মানহানিকর আচরণ থেকেও বিরত থাকতে বলা হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজ জীবনেও সমালোচনার ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ আচরণের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। অনেক সময় তিনি কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ না করে বলতেন,
مَا بَالُ أَقْوَامٍ يَفْعَلُونَ كَذَا وَكَذَا
‘কিছু মানুষের কী হয়েছে, তারা এমন এমন কাজ করছে?’ (বুখারি, হাদিস : ৬১০১)
এর মাধ্যমে তিনি ভুলের সমালোচনা করেছেন, কিন্তু অপ্রয়োজনে ব্যক্তিকে অপমান করেননি।
ইসলামের ইতিহাসে আলেমরা সত্যভিত্তিক সমালোচনার এক উজ্জ্বল ধারা গড়ে তুলেছেন। হাদিসশাস্ত্রে বর্ণনাকারীদের নির্ভরযোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য ‘ইলমুল জারহ ওয়াত তা‘দিল’ নামে একটি পূর্ণাঙ্গ শাস্ত্র গড়ে উঠেছিল। সেখানে ব্যক্তিগত বিদ্বেষ নয়, বরং সত্য সংরক্ষণই ছিল মূল লক্ষ্য। ফলে সমালোচনা জ্ঞানচর্চার একটি দায়িত্বশীল উপকরণে পরিণত হয়েছিল।
বর্তমান দুনিয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের মতপ্রকাশের সুযোগ বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে দায়িত্বহীন সমালোচনা, অপপ্রচার ও চরিত্রহননের প্রবণতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। ইসলাম আমাদের শেখায়, কোনো ব্যক্তি, নেতা, আলেম, লেখক বা প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা করতে হলে তা হতে হবে সত্যনিষ্ঠ, ন্যায়ভিত্তিক, শালীন এবং কল্যাণকামী। কারণ সমালোচনার উদ্দেশ্য মানুষকে ধ্বংস করা নয়; বরং ভুল সংশোধনের মাধ্যমে ব্যক্তি ও সমাজকে উন্নতির পথে এগিয়ে নেওয়া।
প্রকৃতপক্ষে ইসলামী দৃষ্টিতে সমালোচনা একটি আমানত। এটি রাগ, বিদ্বেষ বা আত্মপ্রদর্শনের মাধ্যম নয়; বরং সত্য, ন্যায় ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠার একটি দায়িত্বশীল উপায়। যখন সমালোচনা কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশিত নীতিমালার আলোকে পরিচালিত হয়, তখন তা ব্যক্তি ও সমাজের উন্নয়নের শক্তিতে পরিণত হয়। আর যখন তা সত্য ও ন্যায় থেকে বিচ্যুত হয়, তখন তা বিভেদ, বিদ্বেষ ও অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই সমালোচনা করার আগে আমাদের প্রত্যেকেরই নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত, আমার কথার উদ্দেশ্য কি সংশোধন, নাকি অপমান? এই প্রশ্নের সঠিক উত্তরই ইসলামী সমালোচনার প্রকৃত চেতনার দিকে আমাদের পরিচালিত করবে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক


