হজ আত্মশুদ্ধির চিরন্তন প্রশিক্ষণ

সংগৃহীত ছবি
একদম দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে বিশ্ব মুসলিমের মহাসম্মিলন হজের দিনগুলো। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে লাখো মানুষ ছুটে আসছেন মক্কা নগরীর দিকে। কারও যাত্রা শুরু হয়ে গেছে, কেউ প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। সবার কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে এক অনন্ত আহ্বান— ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’।
এই যাত্রা শুধু ভৌগোলিক নয়; এটি আত্মার এক গভীর প্রত্যাবর্তন। পার্থিব সাজসজ্জা ও বাহ্যিক আভিজাত্য ত্যাগ করে মানুষ ইহরামের সাদা কাপড়ে নিজেকে সমর্পণ করে এক মহান প্রভুর দরবারে। মিনা, আরাফাত ও মুজদালিফার প্রতিটি ধাপ যেন মানবজীবনের একেকটি প্রতীক। যেখানে মিলে ত্যাগ, ধৈর্য ও আত্মসমর্পণের অনুশীলন।
হজের এই ইতিহাস আমাদের নিয়ে যায় সহস্রাধিক বছর আগে, এক পিতা ও পুত্রের অনন্য আনুগত্য ও ত্যাগের গল্পে। আল্লাহর নির্দেশে হজরত ইবরাহিম (আ.) ও তার পুত্র ইসমাইল (আ.) কাবা শরিফ নির্মাণে আত্মনিয়োগ করেন। ইসমাইল (আ.) পাথর জোগান দিতেন, আর ইবরাহিম (আ.) তা স্থাপন করতেন। নির্মাণকাজের ফাঁকে তাদের কণ্ঠে ধ্বনিত হতো এক বিনম্র দোয়া—
‘রব্বানা তাকাব্বাল মিন্না, ইন্নাকা আনতাস্-সামীউল আলীম।’
(হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের পক্ষ থেকে এটি কবুল করুন; নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ) — (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩৬৪)
এই ঘর সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করেছেন, ‘নিশ্চয়ই মানবজাতির জন্য সর্বপ্রথম যে ঘর নির্ধারিত হয়েছে, তা মক্কায় অবস্থিত; এটি বরকতময় এবং বিশ্ববাসীর জন্য হেদায়েত।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ৯৬–৯৭)
কাবা নির্মাণ শেষে ইবরাহিম (আ.)-কে যখন হজের আহ্বান জানাতে বলা হলো, তিনি নিজের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু আল্লাহ বললেন, ঘোষণা করা তোমার কাজ, পৌঁছে দেওয়া আমার দায়িত্ব। সেই আহ্বানের প্রতিধ্বনি আজও থামেনি। যুগের পর যুগ ধরে মানুষ সেই ডাকে সাড়া দিয়ে ছুটে আসছে ‘লাব্বাইক’ বলতে বলতে।
হজকে তাই নিছক একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদত বলা যায় না; এটি এক প্রেমময় ইবাদত। এখানে প্রতিটি কাজেই ভালোবাসার প্রকাশ। কাবা তাওয়াফ, সাফা-মারওয়া সাঈ, মিনায় কংকর নিক্ষেপ; সবকিছুতেই রয়েছে আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসা ও আনুগত্যের নিদর্শন।
এই মহাসমাবেশ মানবজাতির জন্য এক জীবন্ত বার্তাও বহন করে। এখানে বর্ণ, ভাষা ও জাতিগত পরিচয়ের সব পার্থক্য বিলীন হয়ে যায়। একই পোশাকে, একই ময়দানে দাঁড়িয়ে মানুষ প্রমাণ করে; আল্লাহর কাছে মর্যাদার একমাত্র মাপকাঠি হলো তাকওয়া।
একই সঙ্গে হজ আমাদের পরকালের যাত্রার কথাও মনে করিয়ে দেয়। যেমন মানুষ মৃত্যুর পর সবকিছু ছেড়ে কাফনের কাপড়ে যাত্রা করে, তেমনি হাজিরাও ইহরামের সাদা পোশাকে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হন নিঃস্ব ও নিরহংকার অবস্থা নিয়ে।
হজের আধ্যাত্মিক ফলও অপরিসীম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ করে এবং কোনো অশ্লীলতা বা পাপাচারে লিপ্ত হয় না, সে এমনভাবে ফিরে আসে, যেন আজই তার জন্ম হয়েছে।’ (বুখারি, হাদিস: ১৫২১)
অন্য হাদিসে এসেছে, ‘হজ ও ওমরাহ গুনাহ ও দারিদ্র্য দূর করে, যেমন আগুন লোহা থেকে ময়লা দূর করে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ৮১০)
অতএব, হজ কোনো উদ্দেশ্যহীন ইবাদত নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, ত্যাগ ও ইমানকে পুনর্জাগ্রত করার এক অনন্য প্রশিক্ষণ।
এই মহান ইবাদতের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রত্যাশা; আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে হজে মাবরুর নসিব করুন এবং হজের শিক্ষাকে আমাদের জীবনে বাস্তবায়নের তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : সিনিয়র শিক্ষক, মদিনাতুল উলুম মাদ্রাসা, বসুন্ধরা, ঢাকা।



