পবিত্র হজ ২০২৬
ইহরাম অবস্থায় নারীর মুখ ঢাকার বিধান, কী বলে শরিয়ত

সংগৃহীত ছবি
হজ ইসলামের এমন একটি ইবাদত, যেখানে শারীরিক কষ্ট, আর্থিক ব্যয় এবং আত্মিক পরিশুদ্ধি একসঙ্গে মিলিত হয়। এটি শুধু একটি ধর্মীয় সফর নয়, বরং আল্লাহর সামনে পূর্ণ আত্মসমর্পণের এক জীবন্ত অনুশীলন। এই মহান ইবাদতের মধ্যেও ইসলাম নারীর মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং পর্দার বিধানকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। হজের ভিড়, সফরের দীর্ঘতা এবং বহুজাতিক পরিবেশে নারীর পর্দার বিধান কীভাবে কার্যকর হবে, তা নিয়ে ইসলামি ফিকহ ও সমকালীন স্কলারদের বিশদ মতামত রয়েছে।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা
নারীদের পর্দার মৌলিক নীতি স্পষ্ট করে দিয়ে বলেছেন—‘আর মুমিন নারীদের বলো, তারা যেন
তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে এবং তারা
যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তবে যা সাধারণত প্রকাশমান তা ব্যতীত।’
(সুরা নুর, আয়াত : ৩১)
এই আয়াত শুধু সাধারণ জীবনের জন্য নয়, বরং হজের মতো জনসমাগমপূর্ণ ইবাদতের ক্ষেত্রেও একটি মৌলিক নীতি হিসেবে বিবেচিত। অর্থাৎ নারীর সৌন্দর্য ও ব্যক্তিগত আকর্ষণ প্রকাশ না করা এবং পরপুরুষের দৃষ্টি থেকে নিজেকে রক্ষা করা ইসলামের স্থায়ী নির্দেশ।
ইহরাম অবস্থায় নারীর পোশাক সম্পর্কে হাদিসে এসেছে, ‘মুহরিম মহিলারা মুখে নেকাব এবং হাতে হাত মোজা পরবে না।’ (বুখারি, হাদিস : ১৮৩৮) এই হাদিসে যদিও নারী মুখ ঢাকার জন্য নিকাব এবং হাত ঢাকার জন্য দস্তানা পরবে না বলা হয়েছে। তবে এর মানে এই নয় যে পর্দা ত্যাগ করা হবে; বরং বিকল্পভাবে ঢিলেঢালা কাপড় দিয়ে মুখ ঢাকার নির্দেশনা ফকিহরা দিয়েছেন। যাতে প্রয়োজন হলে মুখ আংশিকভাবে হলেও আবৃত থাকে।
ইমাম ইবনে কুদামা (রহ.) তার ‘আল-মুগনি’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ইহরামে নারীর মুখ ও হাত ঢাকার জন্য সেলাই করা নির্দিষ্ট পোশাক নিষিদ্ধ হলেও, পরপুরুষের দৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য কাপড় দিয়ে মুখাবয়ব আড়াল করা বৈধ। একই মত ইমাম নববী (রহ.) তার ‘আল-মাজমু’ গ্রন্থেও ব্যক্ত করেছেন।
সমকালীন স্কলারদের মধ্যেও প্রায় একই অবস্থান দেখা যায়। সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি শাইখ ইবনে বাজ (রহ.) এবং শাইখ উসাইমিন (রহ.) ব্যাখ্যা করেছেন, ইহরামে নিকাব নিষিদ্ধ হলেও নারীর জন্য পর্দা বজায় রাখা ফরজ। প্রয়োজনে ঢিলেঢালা ওড়না বা আবায়া দিয়ে মুখ ঢেকে রাখা যাবে, বিশেষ করে, যখন ভিড় বা অচেনা পুরুষের সামনে পড়ার আশঙ্কা থাকে। (মাজমু ফাতাওয়া ইবনে বায (রহ.), ইবরাম অবস্থায় নারীর মুখ ঢাকা অধ্যায়, পৃষ্ঠা : ২৭৪-২৭৫; মাজমু ফাতাওয়া ইবনে উসাইমিন, নারীর জন্য ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ বিষয়গুলো অধ্যায়, পৃষ্ঠা : ১৭৯)
একটি হাদিসেও পরিষ্কার উল্লেখ রয়েছে, আয়িশা (রা.) বলেন, অনেক কাফেলা আমাদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিল। তখন আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে ইহরাম অবস্থায় ছিলাম। তারা আমাদের সামনা-সামনি এলে আমাদের নারীরা নিজ মুখাবরণ মাথা থেকে নামিয়ে নিজ নিজ মুখমণ্ডল ঢেকে ফেলতাম। অতঃপর তারা অতিক্রম করে চলে গেলে আমরা মুখ খুলতাম। (আবু দাউদ, হাদিস : ১৮৩৩)
এই হাদিসও প্রমাণ করে যে, ইহরাম অবস্থাতেও পর্দা থেকে বিচ্যুত হওয়ার সুযোগ নেই।
হজের বাস্তব পরিবেশে নারীরা মক্কা-মদিনার পবিত্র এলাকায় প্রচুর ভিড়ের সম্মুখীন হন। তাওয়াফ, সাঈ, আরাফাত বা মিনায় অবস্থানের সময় পুরুষ ও নারী একসঙ্গে চলাচল করেন। এ অবস্থায় ইসলাম নারীর নিরাপত্তা ও সম্মান রক্ষার জন্য পর্দাকে আরও গুরুত্ব দিয়েছে।
তবে হজের সফরে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্যও রয়েছে। যেমন—অতিরিক্ত কঠোরতা বা এমন নিয়ম আরোপ করা ইসলাম সমর্থন করে না; যা ইবাদতকে কষ্টকর করে তোলে। ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন, শরিয়ত এমন সহজতা দিয়েছে, যাতে প্রয়োজন ও পরিস্থিতির আলোকে বিধান প্রয়োগ করা যায়, তবে মূলনীতির ব্যত্যয় না ঘটে।
সুতরাং হজের সফরে নারীর পর্দার
সারকথা হলো তিনটি মৌলিক নীতি একসঙ্গে রক্ষা করা—
এক. ইহরামের বিধান মেনে নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা পালন করা।
দুই. পরপুরুষের দৃষ্টি থেকে শরীর ও সৌন্দর্য রক্ষা করা।
তিন. সফরের বাস্তব পরিস্থিতিতে শালীনতা ও নিরাপত্তা বজায় রাখা।
এই তিনটি নীতির সমন্বয়েই ইসলামি শরিয়ত নারীর জন্য হজকে সহজ, মর্যাদাপূর্ণ এবং নিরাপদ করেছে।
আধুনিক যুগের মুসলিম স্কলার মাওলানা আশেক এলাহী লিখেছেন—‘মুখে কাপড় না লাগানোর বিধান তো শুধু ইহরামের হালতে প্রযোজ্য, যা উমরাহে় খুব বেশি হলে এক বা দুদিন এবং হজের বেলায় তিন-চার দিন। (তবে যদি কেউ ইফরাদ বা কিরানের নিয়তে ইহরাম বাঁধে, তার বিষয় ভিন্ন) এই দিনগুলো ছাড়া যারা বেপর্দা ঘোরাফেরা করে, তাদের তো ইহরামেরও অজুহাত নেই। তা ছাড়া মদিনা মুনাওয়ারার সফরে তো ইহরামের প্রশ্ন নেই। মদিনা অবস্থানের দিনগুলোয় মুখ খুলে রাখা এবং সব গায়রে মাহরামকে মাহরাম মনে করা অবশ্যই অজ্ঞতার পরিচায়ক এবং অযথা গুনাহগার হওয়া ছাড়া আর কিছুই নয়। (কিতাবুল হজ, মাওলানা আশেকে ইলাহি বুলন্দশহরী, পৃ. ২৮-২৯)
পরিশেষে বলা যায়, হজের সফরে নারীর পর্দা শুধু একটি পোশাকগত বিষয় নয়; এটি তার ইমান, শালীনতা এবং আল্লাহভীতির বহিঃপ্রকাশ। কাবার চারপাশে দাঁড়িয়ে যখন লাখ লাখ মানুষ ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনি তোলে, তখন সেই মহাসমাবেশেও একজন নারীর নীরব পর্দা তার ইমানের এক গভীর সাক্ষ্য হয়ে ওঠে।
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক দ্বীনি বুঝ দান করুন।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
saifpas352@gmail.com



