হাদিসের কথা
যে মানুষকে রাসুল (সা.) সবচেয়ে নিকৃষ্ট বলেছেন

প্রতীকী ছবি
মানুষের চরিত্রের নানা দোষের মধ্যে কিছু দোষ আছে, যা শুধু ব্যক্তিগত পাপেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং সমাজে অবিশ্বাস, বিভেদ ও শত্রুতার জন্ম দেয়। দ্বিমুখিতা এমনই একটি ভয়াবহ নৈতিক ব্যাধি। একজন দ্বিমুখী ব্যক্তি এক পক্ষের কাছে এক ধরনের কথা বলে, আবার অন্য পক্ষের কাছে গিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলে। নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য সে সত্যকে আড়াল করে এবং মানুষের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করে। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (সা.) এ ধরনের মানুষ সম্পর্কে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন।
আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
«إِنَّ شَرَّ النَّاسِ ذُو الْوَجْهَيْنِ، الَّذِي يَأْتِي هَؤُلَاءِ بِوَجْهٍ وَهَؤُلَاءِ بِوَجْهٍ»
অর্থাৎ, ‘নিশ্চয়ই মানুষের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তি হলো দ্বিমুখী মানুষ, যে এক দলের কাছে এক চেহারা নিয়ে আসে এবং অন্য দলের কাছে অন্য চেহারা নিয়ে আসে।’ (বুখারি, হাদিস : ৭১৭৯)
দ্বিমুখী আচরণ শুধু ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়; বরং তা পরিবার, সমাজ, প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রের ভেতরে অবিশ্বাস, বিভেদ ও শত্রুতার বীজ বপন করে। এ কারণেই রাসুলুল্লাহ (সা.) দ্বিমুখী মানুষকে সাধারণ পাপী নয়, বরং ‘মানুষের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
দ্বিমুখী ব্যক্তি এমন একজন, যে পরিস্থিতি ও স্বার্থ অনুযায়ী নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে। এক পক্ষের সামনে সে তাদের সমর্থক সেজে কথা বলে, আবার অন্য পক্ষের কাছে গিয়ে তাদের মন জোগাতে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলে। তার উদ্দেশ্য সত্য প্রতিষ্ঠা নয়; বরং নিজের অবস্থান শক্ত করা, সুবিধা অর্জন করা কিংবা উভয় পক্ষের কাছেই গ্রহণযোগ্য থাকা।
পবিত্র কোরআন মাজিদে বর্ণিত মুনাফিকদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এই দ্বৈত চরিত্র। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَإِذَا لَقُوا الَّذِينَ آمَنُوا قَالُوا آمَنَّا وَإِذَا خَلَوْا إِلَىٰ شَيَاطِينِهِمْ قَالُوا إِنَّا مَعَكُمْ
‘যখন তারা মুমিনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তখন বলে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’; আর যখন নিজেদের শয়তানদের কাছে ফিরে যায়, তখন বলে, ‘আমরা তো তোমাদের সঙ্গেই আছি।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৪)
যদিও হাদিসে উল্লিখিত দ্বিমুখী ব্যক্তি সব সময় শরিয়তের পরিভাষায় মুনাফিক নাও হতে পারে, তবুও তার এই চরিত্র মুনাফিকির একটি ভয়াবহ লক্ষণ বহন করে।
দ্বিমুখী মানুষের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো, সে মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাস ধ্বংস করে দেয়। কোনো পরিবারে যদি একজন সদস্য এক ভাইয়ের কাছে আরেক ভাইয়ের বিরুদ্ধে কথা বলে এবং অপর ভাইয়ের কাছে গিয়ে উল্টো কথা বলে, তাহলে অল্প সময়েই সেখানে সম্পর্ক ভেঙে পড়বে। কর্মক্ষেত্রে এমন ব্যক্তি সহকর্মীদের মধ্যে সন্দেহ ও সংঘাত সৃষ্টি করে। সমাজে তারা গুজব, অপবাদ এবং ভুল বোঝাবুঝির আগুন জ্বালিয়ে রাখে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে। দুই পক্ষের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে নরম ভাষায় কথা বলা এবং উভয়কে মিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা দ্বিমুখিতা নয়। বরং এটি একটি মহৎ কাজ। দ্বিমুখিতা তখনই হয়, যখন মানুষ সত্যকে বিকৃত করে, এক পক্ষের কথা অন্য পক্ষের কাছে বিকৃতভাবে পৌঁছে দেয় বা স্বার্থের জন্য ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করে।
আজকের যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দ্বিমুখী আচরণকে আরও সহজ করে দিয়েছে। অনেকেই এক গ্রুপে এক ধরনের বক্তব্য দেন, অন্য গ্রুপে গিয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত কথা বলেন। কারও সামনে প্রশংসা করেন, কিন্তু অনুপস্থিতিতে তার নিন্দা করেন। রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা ধর্মীয় অঙ্গনেও এমন আচরণ প্রায়ই দেখা যায়। মানুষ মনে করে এটি বুদ্ধিমত্তা বা কৌশল, অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে এটি নিকৃষ্ট চরিত্রের পরিচায়ক।
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন,
تَجِدُونَ مِنْ شِرَارِ النَّاسِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عِنْدَ اللَّهِ ذَا الْوَجْهَيْنِ
‘কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষের মধ্যে সেই দ্বিমুখী ব্যক্তি থাকবে।’ (বুখারি, হাদিস : ৬০৫৮)
রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন কাউকে ‘সবচেয়ে খারাপ মানুষ’ বলে আখ্যায়িত করেন, তখন তা কোনো সাধারণ সতর্কবার্তা নয়। এটি উম্মতের জন্য একটি গভীর নৈতিক শিক্ষা। একজন মুসলমানের মুখ, মন ও আচরণের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকতে হবে। কারণ সত্যবাদিতা মানুষকে সম্মানিত করে, আর দ্বিমুখিতা মানুষকে দুনিয়াতেও অপমানিত করে এবং আখিরাতেও কঠিন জবাবদিহির মুখোমুখি করে।
সুতরাং, যে ব্যক্তি এক দলের কাছে এক রূপে এবং অন্য দলের কাছে অন্য রূপে উপস্থিত হয়, সে শুধু মানুষের বিশ্বাসই নষ্ট করে না; বরং আল্লাহর নিকটও ঘৃণিত চরিত্রের অধিকারী হয়ে ওঠে। এ কারণেই রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ বলে ঘোষণা করেছেন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক




