যমযম: রহমতের চিরন্তন ঝর্ণাধারা
- যমযম ইতিহাস ও ঈমানের মিলনধারা
- মরুপ্রান্তরের বুকে রহমতের জীবন্ত নিদর্শন যমযম

সংগৃহীত ছবি
পৃথিবীর বুকে অসংখ্য নদী, ঝর্ণা ও জলাধার আছে, কিন্তু সব পানির স্বাদ এক নয়, সব পানির মর্যাদাও এক নয়। কিছু পানি আছে, যা কেবল শরীরকে সঞ্জীবিত করে; আবার কিছু পানি আছে, যা মানুষের হৃদয়, আত্মা ও ঈমানকে এক অদৃশ্য প্রশান্তিতে ভরিয়ে তোলে। যমযম তেমনই এক অনন্য পানি। এটি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ও সর্বোত্তম পানি; যা শুধু পিপাসাকাতর কলিজাকেই শীতল করে না, বরং অন্তরের গভীরে এনে দেয় এক অপার্থিব তৃপ্তি।
মক্কা নগরীতে অবস্থিত যমযম কূপ আল্লাহ তাআলার এক মহা নিদর্শন। যে ভূমিকে আল্লাহ তাঁর ঘরের জন্য নির্বাচিত করেছেন, সেই পবিত্র ভূমিতেই তিনি উৎসারিত করেছেন এই রহমতের ধারা। একসময় এই মক্কা ছিল সম্পূর্ণ জনশূন্য, অনুর্বর ও প্রাণহীন মরুপ্রান্তর। সেখানে ছিল না কোনো পানি, ছিল না কোনো জীবনের চিহ্ন। কিন্তু যমযম উৎসারণের পরই ধীরে ধীরে এই মরুভূমি প্রাণ ফিরে পায়।
ইয়ামানের জুরহুম গোত্র যখন এই পানির সন্ধান পায়, তারা হাজেরা (রা.)-এর অনুমতি নিয়ে এখানে বসতি স্থাপন করে। ইসমাঈল (আ.) বড় হয়ে এই গোত্রেই বিবাহ করেন, এবং সেই ছোট্ট পানির উৎসকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে আজকের পবিত্র মক্কা নগরী। তাই ইতিহাসের নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ অনুযায়ী যমযম কূপই ছিল মক্কা আবাদ হওয়ার মূল ভিত্তি আর একটি সভ্যতার সূচনাবিন্দু।
যমযমের আরেকটি বিস্ময়কর দিক হলো এর চিরবহমানতা। হাজার হাজার বছর ধরে এই কূপের পানি অবিরাম প্রবাহিত হচ্ছে, কখনো শুকিয়ে যায়নি। অসংখ্য হাজী ও উমরাহ পালনকারী এই পানি পান করছেন। আবার বহন করে নিয়ে যাচ্ছেন পৃথিবীর নানা প্রান্তে। তবুও এর প্রবাহ থেমে যাচ্ছে না। এটি আল্লাহর কুদরতের এক উজ্জ্বল নিদর্শন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) যমযমের মর্যাদা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন—‘পৃথিবীর বুকে সর্বোত্তম পানি হলো যমযম; এতে রয়েছে খাদ্যের বৈশিষ্ট্য এবং রোগ থেকে মুক্তি।’ (তবরানী, আল-মু‘জামুল কাবীর, হাদিস: ১১১৬৭) এই হাদিস আমাদের সামনে যমযমের দুটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে। এক. এটি খাদ্যের বিকল্প হতে পারে, দুই. এটি শিফার উৎস। সাহাবী আবু যর (রা.)-এর ঘটনা এ সত্যকে আরও স্পষ্ট করে। তিনি মক্কায় প্রায় ত্রিশ দিন অবস্থান করেন, আর পুরো সময়টিতে তার খাদ্য ছিল কেবল যমযমের পানি। তবুও তিনি দুর্বল হননি; বরং তার শরীরে শক্তি ও স্থিতি বজায় ছিল। (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২৪৭৩)
যমযম কেবল শারীরিক শক্তির উৎস নয়; এটি রোগমুক্তিরও এক বরকতময় মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যমযমের পানি যে উদ্দেশ্যে পান করা হয়, সে উদ্দেশ্য পূরণ হয়।’ (ইবন মাজাহ, হাদিস: ৩০৬২) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় আলেমগণ বলেন, যদি কেউ শিফার নিয়তে পান করে, আল্লাহ তাকে সুস্থতা দান করেন; যদি রিযিকের প্রশস্ততা চায়, আল্লাহ তা দেন; আর যদি ইলমের জন্য পান করে, আল্লাহ তার জ্ঞান বৃদ্ধি করেন। ইতিহাসে অসংখ্য আলেম ও সালাফের জীবনে এর বাস্তব উদাহরণ ছড়িয়ে আছে।
কিন্তু যমযমের আসল তাৎপর্য তার পানির গুণে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক গভীর ঈমানী কাহিনি। ত্যাগ, তাওয়াক্কুল ও আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের এক অনন্য ইতিহাস।
হাজেরা (আ.) যখন তার শিশু সন্তান ইসমাঈল (আ.)-কে নিয়ে নির্জন মরুভূমিতে একাকী, তখন তার সামনে ছিল না কোনো দৃশ্যমান সহায়তা। পানির শেষ ফোঁটাটুকুও যখন ফুরিয়ে গেল, তখন তিনি ছুটে বেড়ালেন সাফা ও মারওয়ার মাঝে। একবার, দু’বার, … সাতবার। এই দৌড় ছিল এক মায়ের অসহায় প্রচেষ্টা, আবার একইসাথে আল্লাহর ওপর অটল ভরসার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
যখন সব চেষ্টা ব্যর্থ হলো, তখনই আল্লাহর রহমত নেমে এলো। ফেরেশতার আঘাতে ফেটে বের হলো যমযমের ঝর্ণাধারা। এই ঘটনাই যেন মানবজাতির জন্য এক চিরন্তন শিক্ষা। মানুষ চেষ্টা করবে, আর ফল আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেবে। যখন বান্দা সত্যিকার অর্থে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, তখন রহমতের দরজা এমনভাবে খুলে যায়, যা কল্পনারও অতীত।
মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইবরাহীম (আ.)-এর সেই দোয়া উল্লেখ করেছেন—‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমি আমার বংশধরের একাংশকে এমন এক অনুর্বর উপত্যকায় বসবাস করিয়েছি…’ (সুরা ইবরাহীম, আয়াত : ৩৭)
এই দোয়ার প্রতিফলনই হলো যমযম। এক অনুর্বর ভূমিতে রহমতের অক্ষয় উৎস।
যমযম পান করারও কিছু আদব রয়েছে। কিবলামুখী হওয়া, বিসমিল্লাহ বলে শুরু করা, তিন শ্বাসে পান করা, আলহামদুলিল্লাহ বলা এবং দোয়া করা। বিশেষ করে দোয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই পানি দোয়া কবুলের এক বিশেষ মাধ্যম।
সবশেষে বলা যায়, যমযম কেবল একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন নয়; এটি একটি জীবন্ত বার্তা। এটি আমাদের শেখায়; ত্যাগ ছাড়া মহত্ত্ব আসে না, তাওয়াক্কুল ছাড়া রহমত আসে না, আর আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ছাড়া জীবনের সংকট অতিক্রম করা যায় না।
এই পানি তাই শুধু তৃষ্ণা নিবারণ করে না; এটি মানুষের অন্তরে ঈমানের শিখা প্রজ্বলিত করে।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
saifpas352@gmail.com



