যে আমল আখিরাতের পাল্লায় সবচেয়ে ভারী হবে

প্রতীকী ছবি
মানুষ সাধারণত সফলতা বলতে ধন-সম্পদ, খ্যাতি, পদমর্যাদা কিংবা বাহ্যিক ইবাদতের আধিক্যকে বোঝে। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের প্রকৃত মর্যাদা নির্ধারিত হয় তার চরিত্র, আচরণ ও মানুষের সঙ্গে ব্যবহারের মাধ্যমে। অনেক মানুষ নামাজ পড়ে, রোজা রাখে, দানও করে; কিন্তু তার কথা কটু, আচরণ রূঢ়, ব্যবহারে অহংকার ও হৃদয়ে বিদ্বেষ। ইসলাম এমন ধর্ম নয়, যা শুধু আনুষ্ঠানিক ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ইসলাম মানুষের অন্তর, ভাষা, আচরণ ও সামাজিক সম্পর্ককেও ইমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ، أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم قَالَ " مَا شَيْءٌ أَثْقَلُ فِي مِيزَانِ الْمُؤْمِنِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ خُلُقٍ حَسَنٍ وَإِنَّ اللَّهَ لَيَبْغَضُ الْفَاحِشَ الْبَذِيءَ "
আবুদ দারদা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামত দিবসে মুমিনের দাড়িপাল্লায় সচ্চরিত্র ও সদাচারের চেয়ে বেশি ওজনের আর কোনো জিনিস হবে না। কেননা, আল্লাহতাআলা অশ্লীল ও কটুভাষীকে ঘৃণা করেন।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২০০২)
এই হাদিস ইসলামের নৈতিক শিক্ষার এক গভীর ভিত্তি তুলে ধরে। কিয়ামতের দিন যখন প্রতিটি আমল ওজন করা হবে, তখন মানুষের সুন্দর চরিত্র এমন এক আমল হবে, যা দাড়িপাল্লাকে সবচেয়ে বেশি ভারী করবে। কারণ সচ্চরিত্র শুধু একটি ব্যক্তিগত গুণ নয়; এটি মানুষের ইমান, তাকওয়া ও আত্মিক পরিশুদ্ধতার বহিঃপ্রকাশ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন মানবজাতির শ্রেষ্ঠ আদর্শ। আল্লাহতাআলা তাকে উদ্দেশ করে বলেন,
وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٍ
‘নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।’ (সুরা আল-কলম, আয়াত : ৪)
নবিজির জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক ছিল তার চরিত্রের সৌন্দর্য। তিনি শত্রুকেও ক্ষমা করেছেন, গালির উত্তরে দোয়া করেছেন, নির্যাতনের বদলে দয়া দেখিয়েছেন। মক্কার কাফিররা তাকে পাথর মেরেছে, অপমান করেছে; কিন্তু তিনি তাদের ধ্বংসের বদলে হেদায়েত কামনা করেছেন। তাই ইসলামি ইতিহাসে দেখা যায়, বহু মানুষ ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে শুধু মুসলমানদের উত্তম আচরণ দেখে।
আজকের সমাজে নৈতিক অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ হলো ভাষার অশ্লীলতা ও আচরণের রুক্ষতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গালি, অপমান, বিদ্রূপ ও কটূক্তি যেন স্বাভাবিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। মানুষ ভিন্নমত সহ্য করতে পারে না। সামান্য মতপার্থক্যেই চরিত্রহনন, ব্যঙ্গ ও ঘৃণার ভাষা ব্যবহার করা হয়। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্টভাবে বলেছেন, আল্লাহ অশ্লীল ও কটুভাষী মানুষকে অপছন্দ করেন।
এক হাদিসে তিনি আরও বলেন, ‘মুমিন গালি দেয় না, অভিশাপ করে না, অশ্লীল কথা বলে না এবং কটুস্বভাবও নয়।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৯৭৭)
প্রকৃত মুমিনের পরিচয় শুধু তার ইবাদত নয়; তার ভাষা, আচরণ ও ব্যবহারও তার ইমানের পরিচায়ক। একজন মানুষের মুখের ভাষা তার অন্তরের অবস্থা প্রকাশ করে। হৃদয় পবিত্র হলে ভাষাও কোমল হয়। হৃদয়ে অহংকার, হিংসা ও রাগ জমে থাকলে তা কথার মধ্যেই প্রকাশ পায়।
ইসলামে সচ্চরিত্রকে এত গুরুত্ব দেওয়ার কারণ হলো, এটি সমাজে শান্তি, ভালোবাসা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা সৃষ্টি করে। একজন সদাচারী মানুষ পরিবারে প্রশান্তি আনে, সমাজে সম্প্রীতি তৈরি করে এবং মানুষের হৃদয় জয় করে। পক্ষান্তরে কটুভাষী ও রূঢ় মানুষ ইবাদতগুজার হলেও মানুষের ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় এবং কিয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী হবে তারা, যারা চরিত্রে উত্তম।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২০১৮)
এই হাদিস একজন মুমিনের জন্য বিরাট অনুপ্রেরণা। কিয়ামতের দিন নবিজির নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম হলো উত্তম চরিত্র। মানুষ হয়তো দীর্ঘ নফল ইবাদত করতে পারে না, কিন্তু সুন্দর আচরণ, হাসিমুখ, নম্র কথা, ক্ষমাশীলতা ও মানুষের প্রতি দয়া প্রদর্শনের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে উচ্চ মর্যাদা অর্জন করতে পারে।
ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেছেন, ‘দ্বীনের মূলভিত্তি দুটি : আল্লাহর হক আদায় করা এবং বান্দার সঙ্গে উত্তম আচরণ করা।’ কারণ মানুষের অধিকাংশ দ্বন্দ্ব, বিচ্ছেদ ও অশান্তির পেছনে রয়েছে চরিত্রের সংকট। পরিবার ভাঙছে রূঢ় আচরণে, বন্ধুত্ব নষ্ট হচ্ছে অহংকারে, সমাজ অস্থির হচ্ছে কটুভাষা ও বিদ্বেষে।
আজ আমাদের প্রয়োজন শুধু ধর্মীয় পরিচয় নয়, বরং ইসলামের নৈতিক সৌন্দর্যকে জীবন্ত করা। মসজিদে ইবাদতের পাশাপাশি পরিবারে কোমল আচরণ, প্রতিবেশীর সঙ্গে সদ্ব্যবহার, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা এবং কথাবার্তায় শালীনতা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। কারণ ইসলামের সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায় একজন মুমিনের চরিত্রে।
মনে রাখতে হবে, কিয়ামতের দিন সম্পদ, বংশমর্যাদা কিংবা সামাজিক পরিচিতি কোনো কাজে আসবে না। তখন সবচেয়ে মূল্যবান হবে বিশুদ্ধ ইমান ও সুন্দর চরিত্র। যে মানুষ দুনিয়ায় মানুষের হৃদয় ভেঙেছে, কটূক্তি করেছে, অপমান করেছে, তার বাহ্যিক আমলও প্রশ্নের মুখে পড়বে। আর যে মানুষ কোমল ভাষা, দয়া, ক্ষমা ও সদাচারের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে, তার পাল্লা হবে ভারী।
তাই প্রতিটি মুমিনের উচিত নিজের চরিত্রকে প্রতিদিন যাচাই করা। আমার কথায় কেউ কষ্ট পাচ্ছে কি না, আমার আচরণে কেউ অপমানিত হচ্ছে কি না, আমার ভাষায় অশ্লীলতা বা অহংকার আছে কি না, তা ভেবে দেখা জরুরি। কারণ একজন মানুষের প্রকৃত সৌন্দর্য তার চেহারায় নয়, তার চরিত্রে। আর আখিরাতের পাল্লায় সবচেয়ে ভারী হবে সেই সচ্চরিত্র, যা মানুষকে আল্লাহর প্রিয় বান্দায় পরিণত করে।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক




