যে জীবনকে নবী (সা.) শ্রেষ্ঠ বলেছেন

প্রতীকী ছবি
মানুষের জীবনের প্রকৃত সাফল্য দীর্ঘায়ু লাভের মধ্যে নয়। জীবনকে কতটা কল্যাণকর ও সৎকর্মময় করা হয়েছে, তার ওপরই নির্ভর করে প্রকৃত সাফল্য। কেউ দীর্ঘ জীবন পেয়েও যদি অন্যায়, গুনাহ ও মানুষের ক্ষতি করার কাজে জীবন কাটিয়ে দেয়, তাহলে সেই দীর্ঘায়ু তার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে না। বিপরীতে অল্প সময়ের জীবনও যদি ঈমান, নেক আমল ও মানুষের উপকারে ব্যয় হয়, তবে তা হতে পারে অত্যন্ত বরকতময়। এ কারণেই ইসলাম মানুষের বয়সের দৈর্ঘ্যের পাশাপাশি জীবনের কর্মের মানকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ أَبِي بَكْرَةَ، عَنْ أَبِيهِ، أَنَّ رَجُلاً، قَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَىُّ النَّاسِ خَيْرٌ قَالَ مَنْ طَالَ عُمُرُهُ وَحَسُنَ عَمَلُهُ قَالَ فَأَىُّ النَّاسِ شَرٌّ قَالَ مَنْ طَالَ عُمُرُهُ وَسَاءَ عَمَلُهُ
আব্দুর রহমান ইবনে আবু বকরা (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি তার পিতা আবু বকরা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, কোনো এক ব্যক্তি প্রশ্ন করল, হে আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উত্তম ব্যক্তি কে? তিনি বললেন, যে দীর্ঘ জীবন পেয়েছে এবং তার আমল সুন্দর হয়েছে। সে আবার প্রশ্ন করল, মানুষের মধ্যে কে নিকৃষ্ট? তিনি বললেনঃ যে দীর্ঘ জীবন পেয়েছে এবং তার আমল খারাপ হয়েছে। (তিরমিজি, হাদিস : ২৩৩০)
অন্য হাদিসে এসেছে-
خَيْرُ النَّاسِ مَنْ طَالَ عُمُرُهُ وَحَسُنَ عَمَلُهُ
অর্থ: ‘মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম সে, যার আয়ু দীর্ঘ হয়েছে এবং যার আমল সুন্দর হয়েছে।’ (সহিহুত তারগিব, হাদিস: ৩৩৬৪)
হাদিসদ্বয়ে মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়া হয়েছে। এখানে শুধু দীর্ঘ জীবনকে শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড বলা হয়নি। বরং দীর্ঘ জীবনের সঙ্গে ব্যক্তির আমল সুন্দর হওয়ার শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। তাই বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একজন মুমিনের ঈমান, ইবাদত, চরিত্র ও মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধও বাড়তে থাকা উচিত।
দীর্ঘ জীবন আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বড় নিয়ামত। জীবনের প্রতিটি অতিরিক্ত দিন একজন মানুষের জন্য তওবা করার, নিজের ভুল সংশোধনের, নেক আমল বাড়ানোর এবং অন্যের উপকার করার নতুন সুযোগ। যে ব্যক্তি সুস্থতা ও অবসরকে কাজে লাগিয়ে নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, দান-সদকা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা এবং মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করে, তার জীবন ক্রমেই কল্যাণময় হয়ে ওঠে। এ কারণেই বয়সের প্রতিটি ধাপ একজন মুমিনের জন্য আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের নতুন সুযোগ।
অন্যদিকে শুধু বয়স বেড়ে যাওয়াই কোনো বিশেষ মর্যাদার বিষয় নয়। একজন মানুষ যদি দীর্ঘ জীবন পেয়েও আল্লাহর অবাধ্যতায় ডুবে থাকে, মানুষের অধিকার নষ্ট করে, অন্যায়-অপরাধে লিপ্ত থাকে কিংবা নিজের সময়কে অর্থহীন কাজে নষ্ট করে, তাহলে তার দীর্ঘ জীবন তাকে শ্রেষ্ঠ মানুষের মর্যাদা এনে দেয় না। বরং দীর্ঘ জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত সম্পর্কে তাকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
হাদিসে ‘সুন্দর আমল’ কথাটিও ব্যাপক অর্থ বহন করে। সুন্দর আমল শুধু বেশি ইবাদত করার নাম নয়; বরং যে আমল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হয়, শরিয়তসম্মতভাবে করা হয় এবং যার মাধ্যমে মানুষের কল্যাণ সাধিত হয়, সেটিই সুন্দর আমলের অন্তর্ভুক্ত। একজন মানুষ নামাজ আদায় করবে, কিন্তু একই সঙ্গে তার আচরণে সত্যবাদিতা, আমানতদারি, নম্রতা, ক্ষমাশীলতা ও মানুষের প্রতি সদাচরণও প্রকাশ পাবে। কারণ ইবাদতের প্রভাব মানুষের চরিত্রে প্রতিফলিত হওয়া উচিত।
এই হাদিস আমাদের সময়ের মূল্য সম্পর্কেও সচেতন করে। মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো সময়। অর্থ হারালে তা কখনো কখনো ফিরে পাওয়া যায়, কিন্তু জীবনের যে সময় একবার চলে যায়, তা আর ফিরে আসে না। তাই একজন বুদ্ধিমান মুমিন প্রতিটি দিনকে আল্লাহর দেওয়া সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে। গতকালের ভুলের জন্য তওবা করে, আজকের সময়কে নেক কাজে ব্যয় করে এবং আগামী দিনের জন্য কল্যাণকর কাজের প্রস্তুতি নেয়।
আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত দীর্ঘ জীবনের জন্য দোয়া করার পাশাপাশি সুন্দর আমলের জন্যও চেষ্টা করা। কারণ জীবনের সার্থকতা কত বছর বেঁচেছি, শুধু তা দিয়ে নির্ধারিত হবে না; বরং কতটা ভালোভাবে বেঁচেছি, কতটা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করতে পেরেছি এবং কত মানুষের উপকারে এসেছি, সেটিই হবে প্রকৃত সফলতার মাপকাঠি। আল্লাহ তাআলা আমাদের জীবনকে দীর্ঘায়িত করলে তা যেন ঈমান, নেক আমল ও মানুষের কল্যাণে পরিপূর্ণ করেন এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে তাঁর সন্তুষ্টির পথে ব্যয় করার তাওফিক দান করেন। আমিন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



