অন্যকে পিতা দাবি করার পরিণতি

প্রতীকী ছবি
পরিবার ইসলামের দৃষ্টিতে সমাজের মৌলিক ভিত্তি। আর সেই ভিত্তির অন্যতম স্তম্ভ হলো বংশপরিচয়ের সুরক্ষা। ইসলাম মানুষের পাঁচটি মৌলিক স্বার্থ (মাকাসিদুশ শরিয়াহ) সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। এর একটি হলো বংশ বা বংশপরিচয় (হিফযুন নাসাব) সংরক্ষণ। তাই নিজের জন্মদাতা পিতাকে অস্বীকার করে অন্য কাউকে পিতা হিসেবে পরিচয় দেওয়া বা দাবি করা ইসলামে গুরুতর অপরাধ। এটি শুধু ব্যক্তিগত নৈতিকতার প্রশ্ন নয়; বরং উত্তরাধিকার, মাহরাম সম্পর্ক, বিবাহ, সামাজিক পরিচয় ও পারিবারিক অধিকারের সঙ্গে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বংশপরিচয় সংরক্ষণের নির্দেশ
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমরা তাদেরকে তাদের পিতার নামেই ডাকো। এটাই আল্লাহর কাছে অধিক ন্যায়সঙ্গত। যদি তাদের পিতাদের না জানো, তবে তারা তোমাদের দ্বীনি ভাই ও বন্ধু।’ (সুরা আহযাব, আয়াত : ৫)
এই আয়াতটি ইসলামে বংশপরিচয়ের গুরুত্ব স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। ইসলাম দত্তক সন্তানকে লালন-পালনের উৎসাহ দিলেও তার প্রকৃত পিতার পরিচয় পরিবর্তনের অনুমতি দেয় না। কারণ পরিচয় গোপন বা পরিবর্তন করা সত্য গোপনের শামিল।
ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যকে পিতা দাবি করা কবিরা গুনাহ
রাসুলুল্লাহ (সা.) এ বিষয়ে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জেনেশুনে নিজ পিতা ছাড়া অন্যকে নিজের পিতা বলে দাবি করবে, তার জন্য জান্নাত হারাম।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৭৬৬; মুসলিম, হাদিস : ৬৩)
অন্য এক হাদিসে তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিজেকে তার পিতা ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে সম্পৃক্ত করে, অথচ সে জানে যে তিনি তার পিতা নন, তার ওপর আল্লাহ, ফেরেশতা এবং সমগ্র মানুষের অভিশাপ। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার কোনো নফল বা ফরজ আমল গ্রহণ করবেন না।’ (মুসলিম, হাদিস : ১৩৭০)
এসব হাদিস প্রমাণ করে যে, বংশপরিচয় বিকৃত করা ইসলামে কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।
কেন এত কঠোর নিষেধাজ্ঞা?
ইসলাম বংশপরিচয় বিকৃতিকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণে।
এক. এটি উত্তরাধিকার আইনে জটিলতা সৃষ্টি করে। ইসলামে সম্পত্তি বণ্টনের বিধান বংশসম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। ভুল পরিচয় অন্যের হক নষ্ট করতে পারে।
দুই. মাহরাম সম্পর্ক নির্ধারণে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। ফলে এমন ব্যক্তির সঙ্গে বিবাহের আশঙ্কা দেখা দিতে পারে, যার সঙ্গে শরিয়ত অনুযায়ী বিবাহ বৈধ নয়।
তিন. পারিবারিক পরিচয় ও সামাজিক আস্থার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। ইসলাম সত্য ও ন্যায়ের ওপর সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চায়; তাই পরিচয় বিকৃতিকে উৎসাহ দেয় না।
দত্তক সন্তান ও ইসলামের বিধান
অনেকে মনে করেন, দত্তক সন্তানকে নিজের সন্তানের পরিচয় দেওয়াই ইসলামের বিধান। বাস্তবে বিষয়টি তা নয়। ইসলাম এতিম ও অসহায় শিশুর লালন-পালনকে অত্যন্ত সওয়াবের কাজ হিসেবে ঘোষণা করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি ও এতিমের অভিভাবক জান্নাতে এভাবে থাকব।’ এরপর তিনি নিজের তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল পাশাপাশি করে দেখালেন। (বুখারি, হাদিস : ৫৩০৪)
কিন্তু এতিমকে নিজের সন্তান বা অন্য পিতার সন্তান হিসেবে পরিচয় দেওয়া বৈধ নয়। বরং তার প্রকৃত বংশপরিচয় সংরক্ষণ করেই তাকে ভালোবাসা, ভরণ-পোষণ ও শিক্ষা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম।
আধুনিক সমাজে এই শিক্ষার প্রাসঙ্গিকতা
বর্তমান সময়ে নানা কারণে কেউ কেউ নিজের পরিচয় পরিবর্তন করেন। কখনো সামাজিক মর্যাদা লাভের আশায়, কখনো উত্তরাধিকার পাওয়ার উদ্দেশ্যে, আবার কখনো পারিবারিক জটিলতা এড়াতে জন্মদাতার পরিচয় গোপন করেন। ডিজিটাল পরিচয়, জাতীয় পরিচয়পত্র কিংবা আইনি নথিতেও ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল পিতার নাম ব্যবহার করা একটি গুরুতর নৈতিক ও ধর্মীয় অপরাধ।
তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বোঝা দরকার। যদি কোনো ব্যক্তি নিজের জন্মদাতা পিতার পরিচয়ই না জানেন, অথবা প্রশাসনিক ভুলের কারণে কোনো নথিতে ত্রুটি থেকে যায়, তাহলে তিনি এ হাদিসের আওতায় পড়বেন না। হাদিসে কঠোর শাস্তির ঘোষণা এসেছে জেনেশুনে ও ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের প্রকৃত পিতাকে অস্বীকার করে অন্যকে পিতা দাবি করার ক্ষেত্রে।
তাওবার সুযোগ রয়েছে
ইসলামে তাওবার দরজা সব সময় খোলা। কেউ যদি অতীতে ভুলবশত বা স্বার্থের কারণে নিজের পরিচয় পরিবর্তন করে থাকেন, তবে তার উচিত আল্লাহর কাছে আন্তরিক তাওবা করা এবং সম্ভব হলে আইনসম্মত উপায়ে নিজের প্রকৃত পরিচয় সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন।"(সুরা জুমার, আয়াত : ৫৩)
ইসলাম সত্য, ন্যায় ও বংশপরিচয়ের স্বচ্ছতা রক্ষার ধর্ম। তাই জন্মদাতা ছাড়া অন্যকে পিতা ঘোষণা করা বা নিজের প্রকৃত বংশপরিচয় গোপন করা ইসলামে গুরুতর গুনাহ। একজন মুসলমানের উচিত নিজের পরিচয়ে সত্যবাদী থাকা, পারিবারিক সম্পর্কের মর্যাদা রক্ষা করা এবং আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা অতিক্রম না করা। কারণ বংশপরিচয়ের পবিত্রতা রক্ষা শুধু ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয়; এটি একটি ন্যায়ভিত্তিক ও সুশৃঙ্খল সমাজ গঠনেরও অপরিহার্য শর্ত।




