হাদিসের আলোকে কোরবানির সঠিক পদ্ধতি

ছবি: এআই
কোরবানি ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি শুধু পশু জবাইয়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ, তাকওয়া ও আনুগত্যের বাস্তব প্রকাশ। তাই কোরবানি আদায়ের ক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশনা ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজকাল অনেক সময় কোরবানিকে নিছক উৎসব বা সামাজিক প্রথায় সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়, অথচ শরিয়ত কোরবানির প্রতিটি ধাপে সৌন্দর্য, মানবিকতা ও আল্লাহভীতির শিক্ষা দিয়েছে। পশু নির্বাচন থেকে শুরু করে জবাই, দোয়া, গোশত বণ্টন এবং পশুর প্রতি আচরণ পর্যন্ত প্রতিটি বিষয়ের রয়েছে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমরা তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামাজ পড় এবং কোরবানি কর।’ (সুরা কাউসার, আয়াত: ২)
বিশুদ্ধ নিয়ত করা
কোরবানির মূল ভিত্তি হলো ইখলাস বা একনিষ্ঠতা। লোকদেখানো, সামাজিক মর্যাদা কিংবা প্রতিযোগিতার মানসিকতা নিয়ে কোরবানি করলে এ ইবাদতের প্রকৃত উদ্দেশ্য নষ্ট হয়ে যায়। কোরবানির সময় অন্তরে এ নিয়ত থাকতে হবে যে, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যই এ ইবাদত করছি।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সমস্ত আমলের ভিত্তি হলো নিয়ত।’ (বুখারি, হাদিস: ১)
হালাল উপার্জন দিয়ে পশু নির্বাচন
কোরবানির পশু অবশ্যই হালাল উপার্জনের অর্থে ক্রয় করতে হবে। হারাম সম্পদ দিয়ে কোরবানি করলে তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। পশুটি হতে হবে শরিয়ত নির্ধারিত বয়সের। সেই সাথে পশুটি অবশ্যই ত্রুটিমুক্তও হতে হবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘চার ধরনের পশু দ্বারা কোরবানি জায়েজ নয়: স্পষ্ট কানা, স্পষ্ট রোগাক্রান্ত, স্পষ্ট খোঁড়া এবং এমন দুর্বল পশু যার হাড়ে মজ্জা নেই।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ২৮০২; তিরমিজি, হাদিস: ১৪৯৭)
পশুর প্রতি সদয় আচরণ
ইসলাম পশুর প্রতিও দয়া ও সহানুভূতির শিক্ষা দিয়েছে। কোরবানির পশুকে মারধর করা, অযথা কষ্ট দেওয়া, এক পশুর সামনে আরেক পশু জবাই করা। জবাইয়ের আগে পশুটির সামনেই ছুরি ধার করা নিষেধ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ সবকিছুর ওপর ইহসান (সদাচার) ফরজ করেছেন। যখন তোমরা জবাই করবে, তখন উত্তমভাবে জবাই করবে। তোমাদের কেউ যেন তার ছুরি ধার করে এবং পশুকে কষ্টমুক্ত রাখে।’ (মুসলিম, হাদিস: ১৯৫৫)
এক হাদিসে এসেছে আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) এক ব্যক্তিকে পশুর সামনে ছুরি ধার করতে দেখে বলেন, ‘তুমি কি একে দুইবার হত্যা করতে চাও?’ (মুসতাদরাকে হাকিম, হাদিস: ৭৫৬৩)
জবাইয়ের আগে পশুকে কিবলামুখী করা
সুন্নত হলো পশুকে বাম কাতে শোয়ানো এবং কিবলামুখী করে জবাই করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) কোরবানির সময় এ পদ্ধতি অনুসরণ করতেন। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) দুটি শিংওয়ালা সাদা-কালো দুম্বা কোরবানি করেন। তিনি নিজের হাতে সেগুলো জবাই করেন এবং জবাইয়ের সময় “বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার” বলেন। (বুখারি, হাদিস: ৫৫৫৮)
জবাইয়ের সময় দোয়া পড়া
জবাইয়ের সময় আল্লাহর নাম নেওয়া ওয়াজিব। সুন্নত হলো “বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার” বলা। আবার কেউ চাইলে দীর্ঘ দোয়াটিও পড়া যায়।
بِسْمِ اللَّهِ اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُمَّ مِنْكَ وَلَكَ
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার। আল্লাহুম্মা মিনকা ওয়ালাকা।
অর্থ : আল্লাহর নামে, আল্লাহ সবচেয়ে মহান। হে আল্লাহ! এ কোরবানি তোমার পক্ষ থেকে এবং তোমারই জন্য। (মুসলিম, হাদিস: ১৯৬৭)
দ্রুত ও সঠিকভাবে জবাই করা
জবাই এমনভাবে করতে হবে যেন দ্রুত পশুর কষ্ট কমে যায়। গলার প্রধান চারটি রগ কেটে দিতে হয়। অপ্রয়োজনে বারবার ছুরি চালানো কিংবা জবাইয়ের পর সঙ্গে সঙ্গে চামড়া ছাড়ানো অনুচিত।
ইমাম নববি (রহ.) বলেন, ‘জবাইয়ের সময় পশুকে দ্রুত আরাম দেওয়া মুস্তাহাব।’ (শরহু সহিহ মুসলিম, ১৩/১০৬)
নিজের হাতে কোরবানি করা উত্তম
সম্ভব হলে নিজের কোরবানি নিজ হাতে করা সুন্নত। তবে কেউ অক্ষম হলে অন্যকে দিয়ে করাতে পারেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজ হাতে কোরবানি করেছেন। (বুখারি, হাদিস: ৫৫৫৪)
গোশত বণ্টনের আদব
কোরবানির গোশত নিজে খাওয়া, আত্মীয়-স্বজন
ও গরিবদের মাঝে বণ্টন করা উত্তম। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা তা থেকে খাও এবং অভাবগ্রস্ত ও দরিদ্রকে খাওয়াও।’
(সুরা হজ, আয়াত:
২৮)
কসাইকে পারিশ্রমিক হিসেবে গোশত না দেওয়া
কোরবানির গোশত, চামড়া বা কোনো অংশ কসাইয়ের পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া জায়েজ নয়। আলাদা পারিশ্রমিক দিতে হবে।
হজরত আলী (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন আমি কোরবানির পশুর গোশত, চামড়া ও ঝুল সব সদকা করি এবং কসাইকে এর কোনো অংশ পারিশ্রমিক হিসেবে না দিই। (বুখারি, হাদিস: ১৭১৬; মুসলিম, হাদিস: ১৩১৭)
কোরবানি মুসলমানের জন্য শুধু একটি ইবাদত নয়; এটি তাকওয়া, দয়া, শৃঙ্খলা ও আল্লাহর আনুগত্যের অনন্য প্রশিক্ষণ। তাই কোরবানির বাহ্যিক আয়োজনের পাশাপাশি সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ ও অন্তরের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত একজন মুমিনের প্রধান লক্ষ্য।






