দীর্ঘদিনের মহাসচিব মির্জা ফখরুল এবার রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
রাজপথের মিছিল থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ— দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার একেবারে শেষ প্রান্তে এসে যেন নতুন এক অধ্যায়ের দরজায় দাঁড়িয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। যে মানুষটি বছরের পর বছর বিরোধী দলের কণ্ঠস্বর হয়ে রাজপথে ছিলেন, দলের দুঃসময়ে হাল ধরেছেন, আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তিনিই এবার উঠছেন বঙ্গভবনের সিঁড়িতে। বিএনপি মহাসচিবের পদ ছেড়ে রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার মধ্য দিয়ে রাজনীতির মাঠ থেকে রাষ্ট্রের অভিভাবকের ভূমিকায় যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে তার।
বিএনপির প্রায় ৪৮ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসে সাতজন নেতা দলটির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় এই পদে ছিলেন মির্জা ফখরুল। ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবসহ প্রায় সাড়ে ১৫ বছর দলটির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সাংগঠনিক পদে থেকে তিনি বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন। এখন সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলারই নতুন ঠিকানা হতে যাচ্ছে বঙ্গভবন।
রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ার পর গত বৃহস্পতিবার মহাসচিবসহ দলের সব পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন মির্জা ফখরুল। সংসদে ক্ষমতাসীন বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় আগামী ২০ আগস্টের নির্বাচনে তার জয় এখন অনেকটাই নিশ্চিত। সবকিছু ঠিক থাকলে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেবেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে বিএনপি মহাসচিবদের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করা নেতাই এবার বসতে যাচ্ছেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে।
মির্জা ফখরুলের মনোনয়ন ঘিরে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে যেমন উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছে, তেমনি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের অনেকেই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের মতে, তুলনামূলকভাবে সজ্জন, বিনয়ী ও গ্রহণযোগ্য একজন রাজনীতিককে রাষ্ট্রপতি পদে বেছে নিয়েছে বিএনপি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষ্য, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, দুঃসময়ে দলের নেতৃত্ব এবং আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলনে ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবেই মির্জা ফখরুলকে এই পদে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
তবে বঙ্গভবনের পথে মির্জা ফখরুলের এই যাত্রা এক দিনে তৈরি হয়নি। তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু ছাত্রজীবন থেকেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেন তিনি। কিন্তু সরকারি চাকরির নিরাপদ জীবন তাকে বেশিদিন আটকে রাখতে পারেনি। ১৯৮৬ সালে চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন। দুই বছর পর ১৯৮৮ সালে নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। স্থানীয় রাজনীতি থেকেই শুরু হয় তার নির্বাচনী ও সাংগঠনিক রাজনীতির বড় অধ্যায়।
এরপর নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে বিএনপিতে যোগ দেন মির্জা ফখরুল। ধীরে ধীরে দলের বিভিন্ন সাংগঠনিক দায়িত্বে উঠে আসেন তিনি। ২০০৯ সালে বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে নির্বাচিত হন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব। এর মাত্র দুই বছর পর আসে তার রাজনৈতিক জীবনের বড় মোড়।
২০১১ সালের ১৬ মার্চ বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যু হলে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল। এরপর দীর্ঘ পাঁচ বছর ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দল চালানোর পর ২০১৬ সালের সপ্তম জাতীয় কাউন্সিলে তাকে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব করা হয়। তারপর টানা প্রায় এক দশক দলটির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। সবমিলিয়ে ভারপ্রাপ্ত ও পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হিসেবে প্রায় সাড়ে ১৫ বছর বিএনপির সাংগঠনিক নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন মির্জা ফখরুল।
এই দীর্ঘ সময়ের বড় অংশই কেটেছে বিএনপির দুঃসময়ে। আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে মামলা, গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক চাপ ও আন্দোলনের নানা পর্যায়ে দল যখন কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি, তখন খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের অনুপস্থিতিতে মাঠের নেতৃত্বে দৃশ্যমান ছিলেন মির্জা ফখরুল। দলের নেতাকর্মীদের ভাষায়, তিনি কঠিন সময়ে বিএনপির পতাকা ধরে রেখেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছেও তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তৈরি হয়েছে এই দুঃসময়েই।
বিএনপির ইতিহাসে মির্জা ফখরুলের আগে আরও ছয়জন নেতা মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রতিষ্ঠার পর ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত প্রায় সাত বছর দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন মহাসচিব ছিলেন অধ্যাপক ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। এরপর অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল এএসএম মোস্তাফিজুর রহমান ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তার পর কে এম ওবায়দুর রহমান ১৯৮৬ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত মহাসচিব ছিলেন।
১৯৮৮ সালে মহাসচিব হন ব্যারিস্টার আবদুস সালাম তালুকদার। ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত প্রায় আট বছর তিনি এই পদে ছিলেন। এরপর মহাসচিবের দায়িত্ব পান আবদুল মান্নান ভূঁইয়া। ১৯৯৬ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত টানা ১১ বছর তিনি বিএনপির মহাসচিব ছিলেন— মির্জা ফখরুলের পর এ পদে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনকারী নেতা তিনিই।
ওয়ান-ইলেভেনের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় অবশ্য মান্নান ভূঁইয়ার সঙ্গে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের দূরত্ব তৈরি হয়। জরুরি অবস্থার সময় খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হওয়ার আগে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর বিএনপির দুঃসময়ে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন। ২০০৭ থেকে ২০১১ সালের ১৬ মার্চ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রায় চার বছর তিনি দলটির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন। তার মৃত্যুর পর সেই দায়িত্ব আসে মির্জা ফখরুলের কাঁধে।
দলের নেতাদের মতে, বিএনপির মহাসচিবদের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন সময়ে দায়িত্ব পালন করেছেন মির্জা ফখরুল। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেছেন, স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিদের সবাই সমানভাবে গ্রহণযোগ্য ছিলেন না। তবে মির্জা ফখরুল এমন একজন ব্যক্তি, যিনি দীর্ঘ গণতান্ত্রিক সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন এবং রাষ্ট্রকে ‘ফ্যাসিবাদের কবল’ থেকে রক্ষার আন্দোলনে নিরলসভাবে কাজ করেছেন।
প্রিন্সের ভাষায়, সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়া প্রায় নিশ্চিত। তার প্রত্যাশা, রাজপথে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য যে মানুষটি লড়াই করেছেন, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে বসেও তিনি গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে ভূমিকা রাখবেন। একই সঙ্গে সংবিধান, রাষ্ট্র ও জনগণের অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।






