প্রার্থিতা ফিরে পেতে আপিল
আরপিওর সরলীকৃত ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে আমার আইনি লড়াই : মনিরা

মনিরা শারমিন
মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ার পর গণপ্রতিনিধিত্ব আইনের (আরপিও) ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এনসিপি নেত্রী মনিরা শারমিন। তার ভাষ্য, আইনটি যেভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে, সেটি বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
তাই নির্বাচন কমিশনের (ইসি) মনোনয়ন বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন তিনি। রবিবার (২৬ এপ্রিল) বিকেলে ঢাকার আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে তিনি আপিল আবেদন জমা দিয়েছেন।
মনিরা শারমিন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে তাকে মনোনয়ন দিয়েছিল জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য ও এনসিপি। কিন্তু আরপিও অনুযায়ী সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ বা অবসরের তিন বছর পূরণ না হলে কোনো ব্যক্তি নির্বাচিত হতে পারেন না সংসদ সদস্য হিসেবে।
যেহেতু মনিরা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে কৃষি ব্যাংকের অফিসার (জেনারেল) পদ ছেড়েছেন। তাই এই আইন অনুযায়ী তিনি সংসদ সদস্য হতে পারেন না কোনোভাবেই। এ যুক্তিতেই বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের পর বাতিল করে ইসি। এর আগে বুধবার মনিরার মনোনয়নপত্র স্থগিত করেছিল নির্বাচন কমিশন।
তবে এই নেত্রী বলেছেন, আইনটি যেভাবে ‘ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট’ ভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে, সেটি বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা নির্বাচনে অংশ নিতে পারলেও সরকারি বা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করা হচ্ছে। এতে আইনের সমতার নীতি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে
নির্বাচন কমিশনে আপিল করে বেরিয়ে এসে তিনি সাংবাদিকদের বললেন, ‘সরকারি চাকরি বা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের যেকোনো পদে থাকলেই সংরক্ষিত নারী আসনের ক্ষেত্রে অযোগ্য ধরা হচ্ছে, এই সরলীকৃত ব্যাখ্যার বিরুদ্ধেই আমার আইনি লড়াই।’
আইনের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে তিনি বলেছেন, ‘আইনটি যে উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল, এখন তা সেই উদ্দেশ্য থেকে সরে গিয়ে সংরক্ষিত নারী আসনের মূল লক্ষ্যকে বাধাগ্রস্ত করছে। এই আসনের উদ্দেশ্য ছিল নারীদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা এবং নীতিনির্ধারণে তাদের অংশগ্রহণ বাড়ানো।’
আরপিওর ১২(১)-এর ‘চ’ ধারায় কোনো ব্যক্তির সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার অযোগ্যতা হিসেবে বলা হয়েছে, ‘তিনি প্রজাতন্ত্রের বা সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষের বা প্রতিরক্ষা কর্মবিভাগের কোনো চাকরি থেকে পদত্যাগ করেছেন বা অবসরে গিয়েছেন এবং তার পদত্যাগ বা অবসরে যাওয়ার পর তিন বছর অতিবাহিত না হয়।’
কিন্তু মনিরা বলতে চান, তিনি ছিলেন কৃষি ব্যাংকের একজন এন্ট্রি-লেভেলের কর্মকর্তা। যার চাকরির বয়স মাত্র দুই বছর। তাই তার পক্ষে কোনো প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করা বা কাউকে সুবিধা দেওয়া বাস্তবে সম্ভব নয়। তাই এ আইন তার জন্য প্রযোজ্য নয় বলেও দাবি মনিরার।
তার মনোনয়ন বাতিলের মধ্য দিয়ে একটি বৈষম্যও তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে এনসিপির এই নেত্রী বললেন, ‘বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা নির্বাচনে অংশ নিতে পারলেও, সরকারি বা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করা হচ্ছে। এতে আইনের সমতার নীতি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।’
‘আমরা আরও দেখছি, অন্য কিছু ক্ষেত্রে এই আইন সমভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে না। যেমন— সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বান্দরবান জেলা পরিষদের একজন সদস্য, যিনি এখনো দায়িত্বে আছেন, তার মনোনয়ন বাতিল হয়নি। আবার, বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত একটি সংস্থায় উচ্চপদে থাকা একজন প্রার্থীও মনোনয়ন পেয়েছেন। এ বিষয়গুলো থেকে বোঝা যায়, আইনটি সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ হচ্ছে না।’
মনিরার মতে, এই আইনটি শুধু টেক্সট অনুযায়ী নয়, বরং এর মূল উদ্দেশ্য বা স্পিরিট অনুযায়ী প্রয়োগ করা উচিত।
তিনি জানালেন, সোমবার (২৭ এপ্রিল) সকাল ১০টায় নির্বাচন কমিশন শুনানির সময় নির্ধারণ করেছে। সেখানে আইনজীবীসহ উপস্থিত থাকার কথাও জানালেন মনিরা।
এই নেত্রীর আইনজীবী আরমান হোসেনও বলছেন একই কথা। তার ভাষ্য, ‘আমাদের আপিলটি আইনের বিরুদ্ধে নয়, বরং আইনটি যেভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং সেই ব্যাখ্যার ভিত্তিতে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তার বিরুদ্ধে।’
তিনি বলছিলেন, ‘প্রতিটি আইনের পেছনে একটি লেজিসলেটিভ ইনটেন্ট বা রেশিও লেজিস থাকে। আরপিওর বিধানটি করা হয় যেন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, যেমন সচিব বা কোনো প্রতিষ্ঠানের এমডি, যেন ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারকে কোনো অনৈতিক সুবিধা দিতে না পারেন এবং পরে সেই সুবিধার বিনিময়ে নির্বাচনে মনোনয়ন না পান।’
কিন্তু মনিরা শারমিনের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন—মত দেন তিনি।
মনিরা বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একজন দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা ছিলেন, যার পক্ষে কোনো ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া বা পাওয়ার সুযোগ বাস্তবে নেই।
আরমান বললেন, ‘সুতরাং এ ধারার যে লেজিসলেটিভ ইনটেন্ট, সেটিকে যদি সঠিকভাবে বিবেচনা না করে শুধু টেক্সচুয়াল ব্যাখ্যার ভিত্তিতে মনোনয়ন বাতিল করা হয়, তাহলে তা তার জন্য অন্যায় এবং অযৌক্তিক হবে। আমরা এই যুক্তির ভিত্তিতেই আপিল করেছি।’




