উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক রূপান্তরের চাবিকাঠি বালাসী–বাহাদুরাবাদ সেতু

উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বহুদিন ধরেই অব্যবহৃত থেকে গেছে মূলত দুর্বল যোগাযোগ অবকাঠামো, সীমিত শিল্পায়ন এবং বাজারে প্রবেশের প্রতিবন্ধকতার কারণে। এই প্রেক্ষাপটে বালাসী–বাহাদুরাবাদ সেতু কেবল একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়, বরং এটি হতে পারে উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক রূপান্তরের এক কৌশলগত মোড়।
বালাসী (গাইবান্ধা) ও বাহাদুরাবাদ (জামালপুর) অঞ্চলের মধ্যে সরাসরি সড়ক ও রেল সংযোগ স্থাপন করলে উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলো বিশেষ করে রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, নীলফামারীসহ বিস্তৃত এলাকাগুলো জাতীয় অর্থনীতির মূল স্রোতে আরও দ্রুত ও কার্যকরভাবে যুক্ত হতে পারবে।
বর্তমানে এই অঞ্চলের পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয়ের যে অতিরিক্ত চাপ রয়েছে তা সেতুটি নির্মিত হলে হ্রাস পাবে উল্লেখযোগ্যভাবে। ফলে কৃষিপণ্য বিশেষ করে ধান, ভুট্টা, আলু, সবজি ও দুগ্ধজাত পণ্যের বাজারজাতকরণ সহজ হবে এবং ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন কৃষকরা।
শুধু কৃষিই নয়, এই সেতু শিল্পায়নের জন্যও উন্মোচন করবে নতুন দিগন্ত। উত্তরাঞ্চলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে ওঠার অন্যতম বড় বাধা হচ্ছে কাঁচামাল সরবরাহ ও পণ্য পরিবহনের উচ্চ ব্যয়। বালাসী–বাহাদুরাবাদ সেতু চালু হলে ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য অর্থনৈতিক কেন্দ্রের সাথে যোগাযোগ দ্রুততর হবে, যা সহায়ক হবে বিনিয়োগ আকর্ষণে। একইসঙ্গে এই অঞ্চলে নতুন শিল্পাঞ্চল, হিমাগার, প্রসেসিং জোন গড়ে তোলার সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
এছাড়া, এই সেতু ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে উত্তরাঞ্চলের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও। অবকাঠামো উন্নয়নের সাথে সাথে নির্মাণকালীন ও পরবর্তী সময়ে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। দীর্ঘমেয়াদে শিল্প ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের ফলে স্থানীয় জনগণের আয় বৃদ্ধি পাবে, যা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে দারিদ্র্য হ্রাসে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আঞ্চলিক বৈষম্য কমানো। বাংলাদেশের উন্নয়ন দীর্ঘদিন ধরে কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত। সেই তুলনায় পিছিয়ে উত্তরাঞ্চল। এই সেতু কার্যকর হলে রাজধানী ও অন্যান্য উন্নত অঞ্চলের সাথে উত্তরবঙ্গের দূরত্ব শুধু ভৌগোলিকভাবে নয়, কমে আসবে অর্থনৈতিকভাবেও। ফলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
বালাসী–বাহাদুরাবাদ সেতু বাস্তবায়ন হলে নতুন গতি আসবে উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে। এটি শুধু একটি যোগাযোগ প্রকল্প নয় বরং এটি হতে পারে কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের সমন্বিত বিকাশের চালিকাশক্তি। সরকারের উচিত এই প্রকল্পকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা, যাতে উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন বঞ্চনা দূর হয়ে একটি টেকসই ও সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে।
লেখক : শিক্ষক ও গবেষক
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ
masarker@bau.edu.bd

