শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট ও মানোন্নয়নের পথ

প্রতীকী ছবি
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান সংকট বিচ্ছিন্ন কোনো খাতগত সমস্যা হিসেবে দেখা যায় না; বরং এটি একটি গভীর কাঠামোগত, দৃষ্টিভঙ্গিগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংকট, যার শিকড় রাষ্ট্রের নীতি, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এবং সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। বিখ্যাত শিক্ষাবিদ জন ডিউই একবার বলেছিলেন, ‘Education is not preparation for life; education is life itself.’ কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিক্ষা এখনো জীবনমুখী না হয়ে সার্টিফিকেটমুখী রয়ে গেছে— এটাই এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দু।
প্রথমত, এই সংকটকে বোঝার জন্য ‘দৃষ্টিভঙ্গির সংকট’ ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ। পাওলো ফ্রেইরি তার ‘Pedagogy of the Oppressed’ গ্রন্থে যে ‘banking model of education’-এর সমালোচনা করেছেন, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা তারই একটি প্রতিফলন। এখানে শিক্ষার্থীরা জ্ঞান উৎপাদক নয়, বরং জ্ঞানগ্রহীতা; তারা তথ্য জমা রাখে, কিন্তু সেই তথ্যের সমালোচনামূলক প্রয়োগ বা রূপান্তর ঘটাতে পারে না। ফলে শিক্ষা একটি মুক্তিকামী প্রক্রিয়া না হয়ে নিয়ন্ত্রণমূলক প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়।
এই প্রেক্ষাপটে অমর্ত্য সেনের Capability Approach বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। সেনের মতে, শিক্ষা মানুষের সক্ষমতা বাড়ানোর একটি প্রধান উপায়, যা তাকে নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেয়। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের এই সক্ষমতা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে। তারা ডিগ্রি অর্জন করলেও বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানে অদক্ষ থেকে যাচ্ছে। ফলে শিক্ষা একটি ‘formal achievement’ হলেও ‘real empowerment’ ঘটছে না।
দ্বিতীয়ত, কারিকুলাম ও বাস্তবতার বিচ্ছিন্নতা বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার একটি মৌলিক দুর্বলতা। ইভান ইলিচ তার ‘Deschooling Society’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানভিত্তিক শিক্ষা প্রায়ই বাস্তব জীবনের চাহিদা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়— শিক্ষার্থীরা যে জ্ঞান অর্জন করে তা শ্রমবাজার, প্রযুক্তি বা সামাজিক সমস্যার সঙ্গে সংযুক্ত নয়। এর ফলে শিক্ষিত বেকারত্ব বাড়ে এবং মানবসম্পদের অপচয় ঘটে।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় যা শেখানো হয়, তার বড় অংশই পরীক্ষার পর ভুলে যায় শিক্ষার্থীরা, কারণ তা অভিজ্ঞতা বা প্রয়োগের মাধ্যমে অর্জিত নয়
এই সমস্যা ব্যাখ্যা করতে Human Capital Theory গুরুত্বপূর্ণ। এই তত্ত্ব অনুযায়ী শিক্ষা অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর একটি বিনিয়োগ। কিন্তু যখন শিক্ষা দক্ষতা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই বিনিয়োগের প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায় না। বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের একটি বড় অংশের শিক্ষার্থী মৌলিক দক্ষতা অর্জনে ব্যর্থ, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করছে।
তৃতীয়ত, মূল্যায়ন পদ্ধতির সংকট শিক্ষার গুণগত মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বর্তমান পরীক্ষানির্ভর কাঠামো মুখস্থনির্ভরতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। আলবার্ট আইনস্টাইনের বিখ্যাত উক্তি ‘Education is what remains after one has forgotten what one has learned in school’ —এই প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় যা শেখানো হয়, তার বড় অংশই পরীক্ষার পর ভুলে যায় শিক্ষার্থীরা, কারণ তা অভিজ্ঞতা বা প্রয়োগের মাধ্যমে অর্জিত নয়।
চতুর্থত, শিক্ষক উন্নয়নের অভাব শিক্ষা সংকটের কেন্দ্রীয় কারণগুলোর একটি। লি শুলম্যান ‘pedagogical content knowledge’ ধারণা দিয়ে দেখিয়েছেন যে একজন কার্যকর শিক্ষক শুধু বিষয়জ্ঞান নয়, বরং সেই জ্ঞান কীভাবে শেখাতে হয় তা জানেন। বাংলাদেশে এই দক্ষতার ঘাটতি প্রকট। নিম্ন বেতন, সামাজিক মর্যাদার অভাব এবং প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতা শিক্ষকতাকে একটি অনাকর্ষণীয় পেশায় পরিণত করেছে।
পঞ্চমত, রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষার সংকট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি ক্ষমতা ও মতাদর্শের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। লুই আলথুসার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ‘Ideological State Apparatus’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যেখানে শাসকগোষ্ঠী তাদের মতাদর্শ পুনরুৎপাদন করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিক্ষানীতি ও পাঠ্যক্রমে রাজনৈতিক প্রভাব এবং নীতির অস্থিতিশীলতা এই তত্ত্বকে সমর্থন করে। ফলে শিক্ষা স্বাধীন চিন্তা গড়ে তোলার পরিবর্তে অনেক সময় নিয়ন্ত্রিত চিন্তার মাধ্যম হয়ে ওঠে।
ষষ্ঠত, জবাবদিহির অভাব একটি কাঠামোগত সমস্যা। ম্যাক্স ওয়েবার তার ‘bureaucratic theory’-এ দক্ষতা, নিয়ম এবং জবাবদিহির গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষা প্রশাসনে এই উপাদানগুলোর ঘাটতি স্পষ্ট। নীতি প্রণয়ন হলেও তার কার্যকারিতা মূল্যায়নের কার্যকর ব্যবস্থা নেই, ফলে একই সমস্যার বারবার পুনরাবৃত্তি হয়।
শিক্ষাব্যবস্থা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নীতির অধীনে আনতে হবে, যা সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে পরিবর্তিত হবে না
সপ্তমত, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে দুর্বল সংযোগ শিক্ষিত বেকারত্বের প্রধান কারণ। বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দক্ষতার ঘাটতির কারণে অনেক তরুণ শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। এই সমস্যা ‘skills mismatch’ নামে পরিচিত, যেখানে শিক্ষাব্যবস্থা ও অর্থনীতির চাহিদার মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি হয়।
এই বহুমাত্রিক সংকটের প্রেক্ষাপটে করণীয় নির্ধারণ করতে হলে একটি সমন্বিত ও তাত্ত্বিকভাবে সুসংহত দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন।
প্রথমত, শিক্ষার উদ্দেশ্য পুনঃসংজ্ঞায়ন করতে হবে— শিক্ষাকে মানবসম্পদ উন্নয়ন, নাগরিকত্ব গঠন এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। ইউনেস্কোর ‘Education 2030 Framework’ অনুযায়ী শিক্ষা হতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়সংগত এবং জীবনব্যাপী শেখার সুযোগ প্রদানকারী।
দ্বিতীয়ত, কারিকুলামকে outcome-based এবং competency-based করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা বাস্তব দক্ষতা অর্জন করতে পারে। তত্ত্বের পাশাপাশি প্রয়োগভিত্তিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
তৃতীয়ত, মূল্যায়ন পদ্ধতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে। পরীক্ষার পাশাপাশি প্রকল্পভিত্তিক মূল্যায়ন, সমস্যা সমাধান এবং সমালোচনামূলক চিন্তার ওপর জোর দিতে হবে।
চতুর্থত, শিক্ষক উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। ওইসিডির গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষার মান উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো শিক্ষক মান।
পঞ্চমত, শিক্ষা ব্যবস্থা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নীতির অধীনে আনতে হবে, যা সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে পরিবর্তিত হবে না।
ষষ্ঠত, শিক্ষা ও শ্রমবাজারের মধ্যে সংযোগ জোরদার করতে হবে, বিশেষ করে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসারের মাধ্যমে।
সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সংকট কোনো একক সমস্যার ফল নয়; এটি একটি গভীর কাঠামোগত ও দৃষ্টিভঙ্গিগত ব্যর্থতা। এই সংকট সমাধানে প্রয়োজন তাত্ত্বিকভাবে সুসংহত, গবেষণাভিত্তিক এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সংস্কার। নেলসন ম্যান্ডেলার বিখ্যাত উক্তি— ‘Education is the most powerful weapon which you can use to change the world’ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তখনই সত্য হবে, যখন শিক্ষা সত্যিকার অর্থে মানুষের সক্ষমতা, সৃজনশীলতা এবং স্বাধীন চিন্তাকে বিকশিত করার মাধ্যম হয়ে উঠবে।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
ইমেইল: mal55ju@yahoo.com



